• ঢাকা |

মোদির ইমেজ সংকট ও বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বে চ্যালেঞ্জ


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ১৮ ডিসেম্বর, ২০২৫ ইং
ছবির ক্যাপশন:

ড. সৈয়দ জাভেদ মোহাম্মদ সালেহউদ্দিন

১. দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক এক নতুন ও জটিল পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। ভারতের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী, বিশেষত মোদি সরকার, একাধিক অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সংকটে নিপতিত। অর্থনৈতিক মন্দা, সামাজিক মেরুকরণ, ধর্মীয় বিভাজন, মানবাধিকার প্রশ্ন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কূটনৈতিক চাপ—সব মিলিয়ে ভারতের একটি সুস্পষ্ট ইমেজ সংকট তৈরি হয়েছে। ইতিহাস বলছে, এমন পরিস্থিতিতে কর্তৃত্ববাদী প্রবণতাসম্পন্ন সরকার প্রায়ই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা বা সংঘাতকে অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা আড়াল করার কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, বাংলাদেশের সঙ্গে সংঘাতমুখী আচরণ মোদি সরকারের জন্য প্রায় অনিবার্য রাজনৈতিক পথ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

২. বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সীমান্ত উত্তেজনা, কূটনৈতিক চাপ অথবা সামরিক হুমকি তৈরি করে ভারত একদিকে নিজেদের শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইতে পারে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ জাতীয়তাবাদী আবেগ যাকে সবাই মোদীর হিন্দুত্ববাদ হিসাবে জানে সেটি উসকে দিতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে তথাকথিত মৌলবাদী শক্তির উত্থান ঘটেছে—এমন একটি মিথ্যা ও অতিরঞ্জিত ভারতীয় বয়ান আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। এই প্রচারণার উদ্দেশ্য বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শক্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং দেশটিকে একটি অস্থিতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করা।

৩. এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের সাবেক স্বৈরাচারী সরকারকে গণতান্ত্রিক হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা, ভারতে অবস্থানরত সাবেক পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের রাজনৈতিক উদ্যোগ এবং বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর মনোবল দুর্বল করার অপচেষ্টা—সবই একটি বৃহত্তর কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ বলে প্রতীয়মান হয়। সংঘাতের আবরণে পার্বত্য চট্টগ্রাম, চিকেন নেক করিডোর ও ফেনী অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্বকে সামনে এনে ভারতের পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের মতো বিতর্কিত বিষয় চাপিয়ে দেওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

৪. বাংলাদেশের জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো—ভারতের কোনো ধরনের উস্কানিতে পা না দেওয়া এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সুদূরপ্রসারী কৌশল গ্রহণ করা। এক্ষত্রে, বহুমুখী কূটনীতির মাধ্যমে চীন, তুরস্ক, পাকিস্তান, সৌদি আরব, কুয়েত, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ব্রুনাইসহ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, তা বাণিজ্য ও কৌশলগত আলোচনার মাধ্যমে নিরসন করা প্রয়োজন।

৫. একই সঙ্গে ভারতে মোদি-বিরোধী রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ এবং বিশেষ করে বাংলা ভাষাভাষী জনগণের কাছে বাংলাদেশের শান্তিপূর্ণ অবস্থান তুলে ধরা জরুরি। ভারতীয় গণমাধ্যমে চলমান বাংলাদেশ বিরোধী অপপ্রচারের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠস্বর গড়ে তুলতে হবে। আওয়ামী লীগের দলকানা অন্ধ সমর্থকদের কাছেও অতীতের দেশবিরোধী চুক্তি ও সিদ্ধান্তগুলোর বাস্তবতা তুলে ধরা এবং সেগুলো বাতিলের জন্য জাতীয় ঐকমত্য সৃষ্টি করা অপরিহার্য।

৬. সবচেয়ে বড় কথা, দক্ষিণ এশিয়ার এই অস্থির সময়ে বাংলাদেশের কোনো পক্ষের উস্কানিতে পা দেওয়া উচিত নয়। শান্তি, সংযম ও কৌশলী কূটনীতির মাধ্যমেই কেবল বাংলাদেশ তার অস্তিত্ব, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে পারে।

রেফারেন্স

1. Stephen P. Cohen, India: Emerging Power, Brookings Institution Press.


2. C. Raja Mohan, Crossing the Rubicon: The Shaping of India’s New Foreign Policy, Penguin India.


3. Sreeradha Datta (ed.), Bangladesh–India Relations: Problems and Prospects, IDSA.


4. International Crisis Group, South Asia Briefings.

 

ড. সৈয়দ জাভেদ মোহাম্মদ সালেহউদ্দিন

এডভোকেট, সুপ্রিম কোর্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক