রুহুল আমিন, বগুড়া: বগুড়ার সারিয়াকান্দির সীমানা ঘেঁষে ১১০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সোলার প্যানেল প্রকল্পের কাজ এগিয়ে যাচ্ছে যা এখন দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ সোলার প্যানেল। ইতিমধ্যেই প্রকল্পের ৬০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে অচিরেই উৎপাদনে গিয়ে দেশের বিদ্যুৎ সংকট থেকে উত্তোরণে ঘটাবে এই সোলার প্যানেল।
গত বছরের ডিসেম্বরে উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এখনো উৎপাদন শুরু না হওয়ায় হতাশ স্থানীয়রা। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বহুমুখীকরণের পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ কমবে। এছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে। ‘মাদারগঞ্জ ১০০ মেগাওয়াট সোলার পাওয়ার প্লান্ট’ নামে গত ২০২৩ সালে প্রকল্পটির কাজ শুরু করা হয় বগুড়া সারিয়াকান্দি উপজেলার সীমানা ঘেঁষে জামালপুরের মাদারগঞ্জের কাইজার চর নামক গ্রামে। ইতিমধ্যেই প্রকল্পটির ৩২৫.৬৫৩৬ একর জমিতে মাটি ভরাট কাজ সম্পন্ন হয়েছে, পুরো প্রকল্পকে নদী ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করতে এর চারপাশে আরসিসি ব্লক বাঁধাই করা হয়েছে।
বিশালাকার এলাকাজুড়ে সৌর প্যানেল বসানোর জন্য খুঁটি স্থাপন করা হয়েছে, জাতীয় গ্রীডের আঙ্গিকে বৈদ্যুতিক লাইন নির্মাণ করা হয়েছে এবং কোথাও প্যানেলের ফ্রেম তৈরি করা হয়েছে। পাশের স্টোর রুমে স্তুপ করে রাখা হয়েছে বিশালাকৃতির বড়বড় সোলার প্যানেল। প্রকল্পটির প্রায় ৬০ শতাংশ কাজ সমাপ্ত করা হয়েছে। এখন শুধু বাকি ফ্রেমে প্যানেল বসিয়ে উৎপাদন কাজ শুরু করা।
এছাড়া প্রকল্পের সীমানায় প্রায় ১০০টি পরিবার ছিল, যাদের প্রজেক্ট শুরু সময়ই পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানে তারা পাকা বাড়িতে অনেক মানসম্মত পরিবেশে বসবাস করছেন। যার ভিতরে বাজার, মসজিদ, ফার্মেসি সবকিছুর ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং অন্যান্য আবাসন উন্নয়নমূলক কাজ চলমান রয়েছে। বগুড়া এবং জামালপুরের একাধিক এলাকাবাসী জোড় দাবি জানিয়েছেন, গত কয়েকদিন ধরেই তারা লোডশেডিংয়ের কারণে নানা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন, তাই অতিদ্রুত এই সোলার প্লান্টের উৎপাদন চান।
সারিয়াকান্দি উপজেলার বোহাইল ইউনিয়নের উত্তর শংকরপুর গ্রামের সীমানার সাথে জামালপুর মাদারগঞ্জ কাইজার চরে নির্মিত এ প্রকল্পের নামকরণ করা হয়েছে ‘মাদারগঞ্জ ১০০ মেগাওয়াট সোলার পাওয়ার প্লান্ট’, যা পরবর্তীতে ১১০ মেগাওয়াটে উন্নীত করা হয়। এই প্রকল্প এলাকাটি একটি দর্শনীয় স্থান হিসেবে বিবেচিত হবে এবং একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে।
জানা গেছে, গত ২০২৩ সালের ১৩ জুন জামালপুরের মাদারগঞ্জে ১শ’ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনের ইন্টারন্যাশনাল রিনিউয়েবল এনার্জি কোম্পানি সিআরইসি এবং বাংলাদেশ সরকারের বিআর পাওয়ারজেন লিমিটেডের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। রাজধানীর বিদ্যুৎ ভবনে এই যৌথ প্রকল্পের চুক্তি সই হয়। সিআইআরই, চায়না এবং বি-আর পাওয়ারজেন লিমিটেডের মধ্যে জয়েন্ট ভেঞ্চার কোম্পানির শেয়ার সিআইআরইয়ের ৭০ শতাংশ ও বি-আর পাওয়ারজেনের ৩০ শতাংশ। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩১.৫৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
প্রকল্পের প্রধান কার্যক্রম হচ্ছে-১০০ মেগাওয়াট যা উন্নীত ১১০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রকিউরমেন্ট এবং কনস্ট্রাকশন (ইপিসি) কাজ সম্পাদন, সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য ৩২৫.৬৫৩৬ একর ভূমি উন্নয়ন, ১৩২ কেভি ৪৭ কিমি. পাওয়ার ইভাক্যুয়েশন লাইন এবং ইভাক্যুয়েশন অবকাঠামো নির্মাণ, সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অফিস বিল্ডিং, ওয়ার্কশপ, ওয়্যারহাউজ এবং আনসার ব্যারাক নির্মাণ, ভূমিহীন পরিবারকে পুনর্বাসনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ এবং ৩২৫.৬৫৩৬ একর ভূমি দীর্ঘমেয়াদী বন্দোবস্ত গ্রহণ।
পার্কগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে, যার মোট উৎপাদনক্ষমতা ২০০ মেগাওয়াট। কিন্তু জামালপুর পাওয়ার প্লান্টের উৎপাদনক্ষমতা হবে ১১০ মেগাওয়াট। তাই এটি দেশের দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ সৌরশক্তিচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র হতে চলেছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বহুমুখীকরণের পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ কমবে। এছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে।
প্রকল্পের ম্যানেজার দিদারুল ইসলাম দিদার বলেন, কোম্পানি বিলজনিত কারণে জটিলতায় রয়েছে। তাদের বিশাল অঙ্কের বিল বাকি রয়েছে। তাই ইচ্ছা থাকলেও অর্থনৈতিক সংকটে দ্রুত উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না।
কাজলা ইউপি চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম বলেন, গত কয়েকদিন ধরেই আমরা লোডশেডিং ভোগান্তিতে রয়েছি। তাই বগুড়া এবং জামালপুরবাসীর পক্ষে অতি দ্রুত আমরা সোলার প্যানেল প্রকল্পের উৎপাদন চাই। এটির উৎপাদন শুরু হলে আমাদের বগুড়া এবং জামালপুর জেলার প্রায় অর্ধেকের বেশি বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ হবে বলে আমরা আশাবাদী।
প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক হুমায়ুন আকতার বলেন, প্রকল্পের মেয়াদ আগামী ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছে। তবে এলাকাবাসী সহযোগিতা করলে দ্রুত সময়ের মধ্যে এ প্রকল্পের উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে। ২০১৭ সাল থেকে দেশে এ পর্যন্ত সাতটি সোলার পার্ক নির্মাণ করা হয়েছে। যার মোট উৎপাদন ক্ষমতা ২৬০ মেগাওয়াট।