‘ভাববো নতুন, গড়বো নতুন—বিজ্ঞানময় হোক জীবন’
নিজস্ব প্রতিবেদক: ‘ভাববো নতুন, গড়বো নতুন—বিজ্ঞানময় হোক জীবন’—এই প্রত্যয়কে সামনে রেখে রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী মিসবাহুল উলূম কামিল মাদরাসা, মতিঝিলে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘১ম বিজ্ঞান মেলা-২০২৬’। ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানমনস্কতা, উদ্ভাবনী চিন্তা, গবেষণার আগ্রহ এবং প্রযুক্তিনির্ভর জ্ঞানচর্চায় উৎসাহিত করতে প্রথমবারের মতো এ মেলার আয়োজন করা হয়।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সকাল ১০টায় মাদরাসা প্রাঙ্গণে বিজ্ঞান ক্লাবের উদ্যোগে আয়োজিত মেলার উদ্বোধন করা হয়। দিনব্যাপী আয়োজনে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বিজ্ঞানভিত্তিক প্রকল্প, মডেল, উদ্ভাবনী ধারণা ও প্রদর্শনীর মাধ্যমে নিজেদের সৃজনশীলতা ও মেধার পরিচয় তুলে ধরে।
মাদরাসার মতো একটি ঐতিহ্যবাহী ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞান মেলার আয়োজনকে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টরা তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের পাশাপাশি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গবেষণাভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের জন্য আরও প্রস্তুত করে তুলবে।
মেলার প্রধান অতিথি ছিলেন এহ্ইয়াউস সুন্নাহ ইসলামিক রিসার্চ ফাউন্ডেশন, গুলশান, ঢাকার চেয়ারম্যান ও মাদরাসার উপাধ্যক্ষ মাওলানা হাবিবুল্লাহ মুহাম্মদ কুতুবুদ্দীন।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাতারকুল নুরমোহাম্মাদ ফাজিল মাদরাসা, বাড্ডা, ঢাকার অধ্যক্ষ এবং মিসবাহুল উলূম কামিল মাদরাসার গভর্নিং বডির সদস্য মাওলানা মোশাররফ হোসাইন; বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন-বিএফইউজের নির্বাহী সদস্য ও মাদরাসার গভর্নিং বডির সদস্য মোহাম্মদ আবু হানিফ; মাদরাসার ভাইস প্রিন্সিপাল আ ন ম হেলাল উদ্দিন এবং মাদরাসার মুহাদ্দিস ও গভর্নিং বডির সদস্য শায়খ ডক্টর মাহমুদুল হাসান।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মিসবাহুল উলূম কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ ডক্টর মাওলানা মহিউদ্দিন আহমদ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মাওলানা হাবিবুল্লাহ মুহাম্মদ কুতুবুদ্দীন শিক্ষার্থীদের নতুন কিছু শেখা, প্রশ্ন করা, গবেষণা করা এবং নিজেদের মেধাকে মানবকল্যাণে কাজে লাগানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বিজ্ঞান শুধু পরীক্ষাগারের বিষয় নয়; মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ, সুন্দর ও কল্যাণমুখী করার অন্যতম মাধ্যম। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ ধারণ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতের পৃথিবী জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর। তাই শিক্ষার্থীদের এখন থেকেই বিজ্ঞানমনস্ক, সৃজনশীল ও অনুসন্ধিৎসু হিসেবে গড়ে উঠতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যক্ষ ডক্টর মাওলানা মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করলেই হবে না; তাদের সৃজনশীল, অনুসন্ধিৎসু ও উদ্ভাবনী চিন্তার অধিকারী হতে হবে। বিজ্ঞান মেলার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেদের চিন্তা ও ধারণাকে বাস্তব প্রকল্পে রূপ দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
তিনি বলেন, শ্রেণিকক্ষের পাঠের পাশাপাশি সহশিক্ষামূলক কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের মেধা ও প্রতিভা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিজ্ঞান মেলা তাদের আত্মবিশ্বাস, নেতৃত্বের গুণাবলি এবং সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করবে।
মেলায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন প্রকল্প ও মডেল উপস্থাপনের মাধ্যমে বিজ্ঞানকে শুধু বইয়ের বিষয় হিসেবে নয়, বাস্তব জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে দেখার সুযোগ পায়। কোনো সমস্যা কীভাবে চিহ্নিত করতে হয়, তার সম্ভাব্য সমাধান কীভাবে বের করতে হয় এবং নিজেদের ধারণা কীভাবে অন্যের সামনে উপস্থাপন করতে হয়—এ ধরনের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগও তৈরি হয় মেলার মাধ্যমে।
শিক্ষাবিদদের মতে, এ ধরনের আয়োজন শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ বাড়ানোর পাশাপাশি উদ্ভাবনী ও গবেষণামুখী মানসিকতা গড়ে তুলতে সহায়ক। একই সঙ্গে দলগত কাজ, নেতৃত্ব, যোগাযোগ ও উপস্থাপনা দক্ষতা এবং সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা বিকাশেও এর ভূমিকা রয়েছে।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, জীবপ্রযুক্তি ও তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের সময়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করে তোলা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এ বাস্তবতায় ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার সুযোগ তৈরি হলে মাদরাসা শিক্ষার্থীরাও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি ও প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
মিসবাহুল উলূম কামিল মাদরাসার প্রথম বিজ্ঞান মেলা হিসেবে ‘১ম বিজ্ঞান মেলা-২০২৬’ তাই শুধু একটি প্রদর্শনী নয়, বরং শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানচর্চা ও উদ্ভাবনী চিন্তার নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা করেছে। নিয়মিতভাবে এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত থাকলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিনির্ভর জ্ঞানচর্চার সংস্কৃতি আরও বিস্তৃত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
তাদের মতে, নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন, বিজ্ঞানমনস্ক, দক্ষ ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরির ক্ষেত্রে এমন শিক্ষামূলক উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে আয়োজন করা প্রয়োজন।