কল্লোল আহমেদ, প্রতিবেদক, দৈনিক গণজাগরণ, লালমনিরহাট: লালমনিরহাট সিভিল সার্জন অফিসকে ঘিরে নতুন করে দুর্নীতির নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। অফিসের প্রধান সহকারী বা ‘বড়বাবু’ নারায়ণ চন্দ্রের বিরুদ্ধে ঘুষ আদায়, প্রশাসনিক প্রভাব খাটানো এবং বিভিন্ন সনদ প্রদানের নামে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এসব অভিযোগের পেছনে সিভিল সার্জন ডাঃ আঃ হাকিমের নীরবতা ও ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, সিভিল সার্জন অফিসে ফিটনেস সার্টিফিকেট, লাইসেন্স সংক্রান্ত কাগজপত্র, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিভিন্ন অনুমোদনসহ নানা কাজে সাধারণ মানুষকে অতিরিক্ত অর্থ দিতে বাধ্য করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে কোনো রশিদ ছাড়াই এই অর্থ নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
ফিটনেস সনদে প্রকাশ্য অর্থ আদায়ের অভিযোগ
সর্বশেষ সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ পাওয়া প্রার্থীদের কাছ থেকে মেডিকেল ফিটনেস সনদ দেওয়ার নামে ২০০ টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। সরেজমিনে দেখা যায়, সেদিন সকাল থেকেই সিভিল সার্জন অফিসে ভিড় করেন নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকরা।
ভুক্তভোগীদের দাবি, ‘চা-মিষ্টি’ খাওয়ার অজুহাতে প্রত্যেকের কাছ থেকে ২০০ টাকা করে নেওয়া হয়। মোট ২৩৫ জন প্রার্থীর কাছ থেকে এই অর্থ আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
কালীগঞ্জ থেকে আসা নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক ফরিদুল ইসলাম বলেন,
“ফিটনেস সনদ নিতে গেলে আমাদের কাছ থেকে ২০০ টাকা করে নেওয়া হয়। বলা হয় রমজান মাসে চা-মিষ্টি খাওয়ার খরচ। আমরা প্রতিবাদ করেও কোনো লাভ পাইনি।”
বড়বাবুর নির্দেশে টাকা তোলার স্বীকারোক্তিঅফিস সহায়ক সাহেদ বলেন,“বড়বাবু নারায়ণ চন্দ্র আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন সবার কাছ থেকে ২০০ টাকা করে নিতে। কেউ কেউ ১০০ টাকাও দিয়েছেন। আমি সেই টাকা তুলে বড়বাবুর কাছে জমা দিই।
এ বিষয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমে নারায়ণ চন্দ্র টাকা নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন। পরে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেন,
“আপনারা আসছেন দেখে টাকা নেওয়া বন্ধ করেছি। আপনারা ডিস্টার্ব না করলে পুরো টাকাটা তুলে আপনাদের দিকটাও দেখতাম।”
তার এই বক্তব্যে পুরো বিষয়টি আরও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
একাধিক দপ্তরের দায়িত্বে নারায়ণ চন্দ্র
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, একজন স্টেনো বা টেলিফোন অপারেটর হওয়া সত্ত্বেও নারায়ণ চন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে সিভিল সার্জন অফিসের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের দায়িত্ব পালন করছেন। বদলি বা দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রেও তার প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগে নিয়ম অনুযায়ী কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট সময় পরপর বদলি হওয়ার কথা থাকলেও এখানে দীর্ঘদিন ধরে তা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
বাজেট ও প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন
এদিকে লালমনিরহাট জেলায় পরিচালিত টাইফয়েড টিকাদান ক্যাম্পেইনের বরাদ্দ, ইউনিসেফের প্রশিক্ষণ বাজেট, ক্লিনিক ট্রেনিং প্রোগ্রাম এবং স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ের বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এসব বিষয়ে স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশ করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সাংবাদিকের প্রশ্নে ক্ষুব্ধ সিভিল সার্জন
এ বিষয়ে দৈনিক গণজাগরণ পত্রিকার প্রতিবেদক কল্লোল আহমেদ সিভিল সার্জন ডাঃ আঃ হাকিমের কাছে একাধিক প্রশ্ন তোলেন। তবে তিনি এসব প্রশ্নের জবাব দিতে অনীহা প্রকাশ করেন।
ফোনে তিনি বলেন,
“আপনাদের কোনো প্রশ্নের উত্তর আমি দেব না। সাংবাদিকরা একটি বলেন আর প্রকাশ করেন আরেকটি। আমি অফিসে থাকব কি না সেটাও ঠিক নেই। আপনারা যা ইচ্ছে তাই নিউজ করেন, আমার কিছু যায় আসে না।”
তদন্তের দাবি সচেতন মহলের
এদিকে সিভিল সার্জন অফিসে ঘুষ বাণিজ্য ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে স্থানীয় সচেতন মহল থেকে। তাদের মতে, স্বাস্থ্য বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অভিযোগ জনমনে আস্থাহীনতা তৈরি করছে।
তাই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।