হিসাব-অনিয়মের অভিযোগে তদন্তে সমবায় অধিদপ্তর
নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানীর উত্তরা আজমপুর ৬ নম্বর সেক্টরের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রেতা-বিক্রেতা বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেডে (রেজি. নং-৮০৩) বছরের পর বছর নিয়মিত নির্বাচন না হওয়া, আর্থিক হিসাব প্রকাশ না করা এবং সমিতির সম্পদ ও কার্যালয় ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ ঘিরে সদস্যদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে সমবায় কর্তৃপক্ষ অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করেছে।
২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এ সমিতির সদস্যসংখ্যা ১ হাজার ৩৪৯ জন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। সদস্যদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠার পর থেকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে নির্বাচন না হওয়ায় একটি গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের মতো করে ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করে আসছে। এমনকি সাধারণ সদস্যদের মতামত ও অংশগ্রহণ ছাড়াই কমিটি গঠনের অভিযোগও রয়েছে।
সমিতির সদস্য নুরুন্নবী (সদস্য নং-৬), সুজন মিয়া (সদস্য নং-২৫১), গিয়াসউদ্দিন (সদস্য নং-৮৬), আব্দুল্লাহসহ কয়েকজন সদস্য জানান, তাঁদের প্রধান দাবি হলো—সমিতির সব আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশ এবং দ্রুত নিয়মতান্ত্রিক নির্বাচন আয়োজন।
সদস্যদের প্রশ্ন, তাঁদের সঞ্চয়ী আমানতের বর্তমান স্থিতি কত, প্রতিদিনের কালেকশনের পরিমাণ কত, সেই অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে, শেয়ার বিক্রি থেকে কত টাকা আয় হয়েছে এবং বিদ্যুৎ ও পানির আয়-ব্যয়ের হিসাব কী—এসব বিষয়ে তাঁদের কাছে কোনো স্বচ্ছ ও পূর্ণাঙ্গ হিসাব রয়েছে কি না। তাঁরা লিখিতভাবে এসব তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন।
সমিতির সম্পদ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সদস্যরা। তাঁদের দাবি, অফিসে থাকা দুটি এসি, স্টিলের বড় আলমারি, পারটেক্সের প্রায় ১০০টি চেয়ার, দুটি টেবিল, তিনটি ল্যাপটপ, একটি টেলিভিশন, ২০০ কেভিএর বড় জেনারেটর ও দুটি ছোট জেনারেটরসহ সমিতির অন্যান্য সম্পদের বর্তমান অবস্থান, ব্যবহার ও হিসাব প্রকাশ করতে হবে।
একাধিক সদস্যের ভাষ্য, এসব সম্পদ ও অর্থ কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এগুলো সদস্যদের সঞ্চয় ও সমিতির সম্পদ। তাই প্রতিটি টাকার হিসাব সদস্যদের জানার অধিকার রয়েছে।
সরেজমিনে সমিতির কার্যালয়ে গিয়ে কয়েকজন ভাড়াটিয়ার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সেখানে কিছু কক্ষ ব্যবসা ও গুদাম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সদস্যদের অভিযোগ, সমিতির কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ব্যবহারের কথা থাকা কার্যালয়ের কক্ষ ভাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ছিল না।
ইমরান নামের এক ভাড়াটিয়া জানান, প্রায় চার মাস আগে তিনি এক লাখ টাকা দিয়ে মাসিক ১৬ হাজার টাকা ভাড়ায় একটি কক্ষে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন।
মোজাম্মেল নামের আরেক ভাড়াটিয়া জানান, তিনিও এক লাখ টাকা দিয়ে মাসিক ১৫ হাজার টাকা ভাড়ায় সমিতির একটি কক্ষ গুদাম হিসেবে ব্যবহার করছেন।
এ অবস্থায় সদস্যদের প্রশ্ন, সমিতির কার্যালয়ের কক্ষ ভাড়া দিয়ে থাকলে এর বিপরীতে প্রাপ্ত অর্থ সমিতির ব্যাংক হিসাবে জমা হয়েছে কি না এবং সেই অর্থ কীভাবে ব্যয় হয়েছে—তার হিসাব সদস্যদের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে কি না।
সমিতির কয়েকজন সদস্যের অভিযোগ, আনোয়ার হোসেন প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই সাধারণ সম্পাদক পদে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। তাঁদের অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে তিনি নিজেকে সাধারণ সম্পাদক দাবি করেছেন এবং পরবর্তী সময়ে তাঁর ভাগিনা নুর ইসলামকেও ওই পদে আনার চেষ্টা করা হয়েছে।
সদস্যদের অভিযোগ, নিয়মিত নির্বাচন না দিয়ে কথিত ‘পকেট কমিটি’র মাধ্যমে দীর্ঘদিন সমিতির কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগও করেছেন কয়েকজন সদস্য। তাঁরা তাঁর সম্পদের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে আনোয়ার হোসেনের বক্তব্য জানতে তাঁর মোবাইল ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। কোনো লিখিত বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া সমবায় অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে আনোয়ার হোসেনের কথিত যোগসাজশের অভিযোগও তুলেছেন কয়েকজন সদস্য। তবে এ অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা যায়নি। সংশ্লিষ্ট সদস্যরা বলছেন, প্রশাসনিক তদন্তের মাধ্যমেই এ বিষয়ে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
সদস্যদের অভিযোগ ও সমিতির ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিরোধের মধ্যে গত ২ জুলাই ২০২৬ হাইকোর্টে একটি রিট করা হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। রিটের নম্বর ৮৪৩৩।
পরবর্তী সময়ে আদালতের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে সমবায় কর্তৃপক্ষ পদক্ষেপ নেয় বলে জানা গেছে। এর ধারাবাহিকতায় গত ১ সেপ্টেম্বর জেলা সমবায় কার্যালয়, আগারগাঁও থেকে ২২৯১ নম্বর আদেশ জারি করা হয়।
ওই আদেশে মো. ফিরোজুল আলমকে সভাপতি করে তিন সদস্যের একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। আদেশ অনুযায়ী, নিয়োগের তারিখ থেকে ১২০ দিন পর্যন্ত এ কমিটির মেয়াদ থাকার কথা।
একই সঙ্গে সমবায় অধিদপ্তরের ১ আগস্ট ২০০৭ সালের ৪২৮ নম্বর সার্কুলারের নির্দেশনা অনুসরণ করে সদস্য ভর্তি ছাড়া স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন এবং নির্বাচিত কমিটির কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মো. ফিরোজুল আলম দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার জন্য গত ২৩ সেপ্টেম্বর বুধবার সকাল ১১টায় সমিতির কার্যালয়ে উপস্থিত থাকার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের চিঠি দেন।
চিঠিতে সমিতির জমা-খরচের বই হালনাগাদ, ব্যাংক লেনদেনের সর্বশেষ তথ্য, চেকবই এবং যাবতীয় রেকর্ডপত্র সংরক্ষণ করে নির্ধারিত সময় ও স্থানে উপস্থিত হয়ে দায়িত্ব হস্তান্তরের অনুরোধ জানানো হয়।
নির্ধারিত সময়ে ২৩ সেপ্টেম্বর সমবায় অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা সমিতির কার্যালয়ে উপস্থিত হলেও বিলুপ্ত ব্যবস্থাপনা কমিটির কাউকে সেখানে পাওয়া যায়নি বলে জানান মেট্রোপলিটন থানা সমবায় কর্মকর্তা মো. ফিরোজুল আলম।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, পরবর্তীতে নতুন করে চিঠি দিয়ে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব হস্তান্তরের জন্য ডাকা হবে। একই সঙ্গে বিষয়টি অনুসন্ধানে গণমাধ্যমের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন তিনি।
সমিতির সদস্যদের অভিযোগ, বছরের পর বছর নির্বাচন না হওয়ায় সাধারণ সদস্যদের অংশগ্রহণ ও জবাবদিহির সুযোগ সীমিত হয়েছে। ফলে সমিতির আর্থিক লেনদেন, সম্পদের ব্যবহার, কার্যালয়ের কক্ষ ভাড়া এবং ব্যবস্থাপনা নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন উঠছে।
তাঁদের দাবি, অন্তর্বর্তী কমিটির মাধ্যমে সমিতির সব নথিপত্র, ব্যাংক হিসাব, আয়-ব্যয়, সম্পদ, ভাড়া ও সদস্যদের আমানতের পূর্ণাঙ্গ হিসাব যাচাই করা হোক। পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অবাধ ও নিয়মতান্ত্রিক নির্বাচন আয়োজন করে নির্বাচিত কমিটির কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করা হোক।
সদস্যদের মতে, দীর্ঘদিনের অনাস্থা ও অভিযোগের অবসান ঘটাতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন আর্থিক স্বচ্ছতা, নথিপত্রের নিরপেক্ষ যাচাই এবং সদস্যদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন।