• ঢাকা |

হালাল অর্থনীতির বিশ্ববাজার: বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ২১ জুলাই, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

মো: মুখলেছুর রহমান: বিশ্ব অর্থনীতিতে নীরব কিন্তু দ্রুত প্রসারমান একটি খাত হলো হালাল অর্থনীতি। একসময় হালাল বলতে শুধু খাদ্যপণ্যকে বোঝানো হলেও বর্তমানে এর পরিধি খাদ্য ছাড়িয়ে ওষুধ, প্রসাধনী, পোশাক, পর্যটন, লজিস্টিকস, আর্থিক সেবা, ই-কমার্স এমনকি শিক্ষা ও গবেষণাকেও অন্তর্ভুক্ত করেছে। বিশ্বের প্রায় ২০০ কোটির বেশি মুসলিম ভোক্তার পাশাপাশি অমুসলিমদের মধ্যেও নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও নৈতিক উৎপাদনের কারণে হালাল পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা দ্রুত বাড়ছে। ফলে বৈশ্বিক হালাল অর্থনীতি আজ বহু ট্রিলিয়ন ডলারের এক বিশাল বাজারে পরিণত হয়েছে।

সাম্প্রতিক তথ্যানুসারে, বৈশ্বিক হালাল অর্থনীতির আকার প্রায় ৫.২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এটি ৯ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অথচ এই বিশাল বাজারে বাংলাদেশের বার্ষিক হালাল পণ্য রপ্তানির পরিমাণ মাত্র ৮৫০ মিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ এখনো ১ বিলিয়ন ডলারের সীমাও অতিক্রম করতে পারেনি। এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ কেন এই বাজারে উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করতে পারছে না- এটি একটি বড় প্রশ্ন। যে প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি, শক্তিশালী তৈরি পোশাক শিল্প, ওষুধ শিল্প, চামড়া শিল্প, মৎস্যসম্পদ এবং বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মুসলিম জনগোষ্ঠী। এসব খাত আন্তর্জাতিক মানের হালাল সার্টিফিকেশন ও ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে সহজেই বৈশ্বিক বাজারে অধিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারে। বিশেষ করে হালাল টেক্সটাইল, হালাল কসমেটিকস, হালাল ফার্মাসিউটিক্যালস এবং হালাল পর্যটনের মতো নতুন খাত বাংলাদেশের জন্য খুলে দিতে পারে বিপুল সম্ভাবনার অবারিত দুয়ার।

সে অমিত সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে আমাদের প্রস্তুতি মোটেই সন্তোষজনক নয়।দেশে এখনো আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য, শক্তিশালী ও সমন্বিত হালাল অ্যাক্রেডিটেশন ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে হালাল সনদ দেওয়া হলেও সেগুলোর অনেকগুলোর আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নেই বললেই চলে। ফলে বাংলাদেশের অনেক রপ্তানিকারককে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড বা ভারতের স্বীকৃত সংস্থার কাছ থেকে অতিরিক্ত ব্যয়ে সার্টিফিকেশন নিতে হয়। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, সময় নষ্ট হয় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে হয়।

মালয়েশিয়া এ ক্ষেত্রে বিশ্বের সবচেয়ে সফল উদাহরণ। দেশটি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত JAKIM-এর মাধ্যমে এমন একটি নির্ভরযোগ্য হালাল সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যা বিশ্বের বহু দেশে গ্রহণযোগ্য। একইভাবে ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব এমনকি থাইল্যান্ডও হালাল শিল্পকে জাতীয় অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছে। অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্রাজিল আজ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ হালাল মাংস রপ্তানিকারক। অর্থাৎ হালাল অর্থনীতিতে সফল হতে মুসলিম রাষ্ট্র হওয়াই মুখ্য নয়; প্রয়োজন দক্ষ নীতি, মানসম্মত উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক আস্থা।

বাংলাদেশের জন্যও এখন সময় এসেছে হালাল অর্থনীতিকে কেবল ধর্মীয় বিষয় হিসেবে না দেখে একটি কৌশলগত অর্থনৈতিক খাত হিসেবে বিবেচনা করার। এজন্য প্রথমেই প্রয়োজন আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন একক জাতীয় হালাল কর্তৃপক্ষ বা অ্যাক্রেডিটেশন সংস্থা প্রতিষ্ঠা, যার সনদ বিশ্বের প্রধান আমদানিকারক দেশগুলোতে গ্রহণযোগ্য হবে। পাশাপাশি আধুনিক পরীক্ষাগার, ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি, গবেষণা, দক্ষ মানবসম্পদ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে হালাল বিজ্ঞান ও হালাল সাপ্লাই চেইন বিষয়ে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

সরকার, শিল্পমালিক, রপ্তানিকারক, বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইসলামী বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি জাতীয় হালাল উন্নয়ন রোডম্যাপ প্রণয়ন করা জরুরি। একই সঙ্গে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (BSTI), ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। বিদেশি বাজারের চাহিদা অনুযায়ী সার্টিফিকেশন ও মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা না গেলে সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ  নেয়ার সুযোগ তেমন একটি নেই।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্র্যান্ডিং। বাংলাদেশ এখনো বিশ্ববাজারে “হালাল বাংলাদেশ” হিসেবে পরিচিত নয়। অথচ নিরাপদ খাদ্য, ওষুধ, পোশাক ও কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী জাতীয় ব্র্যান্ড তৈরি করা গেলে মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকার বাজারে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে বাণিজ্য মিশন, আন্তর্জাতিক হালাল এক্সপো এবং বৈদেশিক বিপণন কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে হবে।

হালাল অর্থনীতি কেবল রপ্তানি বৃদ্ধির সুযোগ নয়; এটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বিকাশ, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন উৎসও হতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের ওষুধ, কৃষি, মৎস্য, চামড়া ও তৈরি পোশাক শিল্পে আন্তর্জাতিক মানের হালাল সার্টিফিকেশন যুক্ত হলে রপ্তানির নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।

আজ যখন বিশ্ব দ্রুত হালাল অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের জন্য পিছিয়ে থাকার কোনো কারণ নেই। প্রয়োজন দূরদর্শী নীতি, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন অবকাঠামো, দক্ষ জনবল এবং একটি বিশ্বাসযোগ্য সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা। যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণ করা গেলে আগামী দশকে বাংলাদেশ শুধু ১ বিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রমই করবে না, বরং বহু বিলিয়ন ডলারের হালাল রপ্তানিকারক দেশ হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারবে।

হালাল অর্থনীতির এই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা বাংলাদেশের জন্য আর কোনো বিলাসিতা নয়; এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং টেকসই উন্নয়নের এক অনিবার্য কৌশল। অভূতপূর্ব এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে দেশের অর্থনীতির ভিত মজবুত করতে বৈশ্বিক হালাল অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে হবে বাংলাদেশকে। কাল বিলম্ব না করে সংশ্লিষ্ট সবাইকে এখনই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে মনোযোগী হতে হবে।

মো: মুখলেছুর রহমান।

ইসলামী অর্থনীতিবিদ, শরিয়াহ বিশেষজ্ঞ, সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তক।