• ঢাকা |

বই:উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

ফিরোজ মাহবুব কামাল

উন্নয়নে বইয়ের বিকল্প নাই

অস্ত্রের জোরে বিশ্ব জুড়ে ডাকাতি করা যায়, কিন্তু তা দিয়ে মানব উন্নয়ন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক উন্নয়নসহ কোন উন্নয়নই করা যায় না। হালাকু খাঁ ও চেঙ্গিজ খাঁ বহু দেশ জয় করেছে, কিন্তু তাতে কোন দেশেই সমৃদ্ধি বা উন্নয়ন আসেনি। এমন কি তাদের নিজ দেশ মঙ্গোলিয়াতেও নয়। তারা কোন সভ্যতা নির্মাণ করতে পারিনি। বরং দিয়েছে নৃশংস গণহত্যা, গণ ধর্ষণ, লুণ্ঠন ও ধ্বংস। কারণ, তাদের হাতে অস্ত্র ছিল, কিন্তু বই ছিল না। অথচ মুসলিমরা শুধু দেশ জয় করেনি, উন্নয়ন এনেছে এবং মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতাও নির্মাণ করেছে। কারণ ইসলামই একমাত্র ধর্ম যার শুরু “ইকরা” তথা “বই পড়ো” মহান রব’যের এই নির্দেশনা দিয়ে। এ থেকে বুঝা যায় বই পড়া সর্বজ্ঞানী মহান আল্লাহর কাছে কত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সর্বপ্রথম নামাজ রোজা বা হজ্জ যাকাত ফরজ না করে জ্ঞানার্জনকে ফরজ করেছেন। এভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন, বই পড়া অতি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। কারণ জ্ঞানার্জনের কাজটি না হলে জাহেলের পক্ষে ঈমানদার হওয়া অসম্ভব। নবীজী (সা:)‌’য়ের হাদীস: সামান্য সময়ের জ্ঞানার্জন সারা রাত নফল ইবাদতের চেয়ে উত্তম।   

বই হলো উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। বই মনের ভূবনে বিপ্লব আনে; বিপ্লব আনে ব্যক্তির চেতনায় ও চরিত্রে। আর সকল বিপ্লবের শুরু তো চেতনার বিপ্লব থেকে। তারা যারা উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিপ্লব চায়, তাদের সামনে বইয়ের বিকল্প নাই। এবং যে দেশে এই হাতিয়ারটির কদর নাই, সে দেশের উন্নয়নের কোন সম্ভাবনা নেই। অর্থনৈতিক ও মানবিক ক্ষেত্রে জ্ঞানহীন জাহেলদের কোন ভবিষ্যৎ নয়। এরা ব্যর্থ জাতিতে পরিণত হয়।

একটা জাতি  কতটা দ্রুত সামনে এগোবে -সেটি বুঝা যায় সে দেশে বইয়ের কদর দেখে। তাই বাংলাদেশের উন্নয়নের সম্ভাবনা বুঝার জন্য কৃষি উৎপাদন, মৎস্য উৎপাদন বা শিল্প উৎপাদন কতটা হচ্ছে -তা নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন নাই। কতটা বই প্রকাশিত হয়, কতটা বই বিক্রি হয় এবং ক’জন পাঠক -সে হিসাবটি নিলেই উন্নয়নের সে মানটি সঠিক ভাবে বুঝা যায়। হাটে বাজারে কি পরিমান মাছ গোশতো, দুধ ও ফল বিক্রি হয় -সেটির হিসাব নিলে দেশবাসীর দৈহিক স্বাস্থ্য বুঝা যায়। তেমনি কতগুলি বই বিক্রি হয় -তা দেখে বুঝা যায় জনগণের মনের স্বাস্থ্য। দেশে বই বিক্রি না হলে বুঝতে হবে দেশবাসী মানসিক দিক দিয়ে পঙ্গু বা অসুস্থ্য। মরণাপন্ন দেহের যেমন খাদ্যের ক্ষুধা থাকে না, তেমনি মরণাপন্ন মনের থাকে না জ্ঞানের ক্ষুধা। এদের দিয়ে কখনো উন্নয়নের কাজ হয়না।   

চীনারা বইয়ের কদর বুঝতে পেরেছে, তাই সেখানে বইয়ের প্রচণ্ড কদর। চীনে প্রতিবছর যা বই ছাপা হয়, মুসলিম বিশ্বের সবগুলি দেশ মিলে তার ১০ ভাগের এক ভাগও প্রকাশ করে না। চীনের লোকেরা বইকে কতটা ভালবাসে তার প্রমাণ দেখা গেল সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে। সে ভিডিওতে দেখা গেল, একটি বইয়ের লাইব্রেরিতে ঢোকার জন্য প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ লাইন।। ছাত্র ছাত্রী ও সাধারণ মানুষের সেখানে ভীড়। কয়েক একর জায়গা নিয়ে সে বিশাল লাইব্রেরি। সেটি নিজেই এক বিশাল জগত। লাইব্রেরির সামনে সারিবদ্ধ বিশাল লাইনই বলে দেয়, চীনাদের জ্ঞানে ক্ষুধা কতটা তীব্র। কিন্তু বাঙালি মুসলিমরা বইয়ের গুরুত্ব বুঝে না। বাংলাদেশে যেমন বড় কোন লাইব্রেরি নাই, তেমনি নাই বইয়ের বিশাল সংগ্রহ ও পাঠক।

ব্যর্থতার কারণ: অভাব বই ও পাঠকের

বাঙালি মুসলিমের ব্যর্থতার মূল কারণ খাদ্যের বা সম্পদের অভাব নয়, বরং অভাব বইয়ের এবং বইয়ের পাঠকের। দারিদ্র্যতা এখানে জ্ঞানের। বাঙালির রোগ, তারা বই যেমন লেখে না, বই তেমন কেনে না এবং বই তেমন পড়েও না। দেহ সুস্থ্য ও সবল হলে ,সে দেহ বেশি বেশি খেতে চায়। কিন্তু ক্যান্সার হলে সে ক্ষুধা লোপ পায়, দেহ তখন শুকিয়ে যেতে শুরু করে। তেমনি সুস্থ্য মনে থাকে জ্ঞানের ক্ষুধা। সে সুস্থ্য মনের ব্যক্তিটি তখন জ্ঞানের ক্ষুধা মেটাতে বই খুঁজে। তাই যে দেশের মানুষ বই পড়ে না, বুঝতে হবে তাদের জ্ঞানের ক্ষুধা মারা পড়েছে। সেটি বার্তা দেয় তাদের মনের বা চেতনার মৃত্যুর। এমন মৃত মনের জাতিকে ভাত মাছ খাইয়ে দৈহিক ভাবে বাঁচানো যায়, কিন্তু সভ্য জাতি রূপে গড়ে তোলা যায়না। তাই বাংলাদেশে মানুষ  দৈহিক ভাবে মারা না গেলেও মারা যাচ্ছো নৈতিক ভাবে। এজন্যই দেশে দুর্বৃত্তির জোয়ার।      

বহু বাঙালি মুসলিম মনে করে বিদেশের বাজারে শ্রম বিক্রি করে, দেশে সেলাইয়ের কাজ করে ও গার্মেন্টস রপ্তানি করে দেশকে উন্নয়নের শিখরে পৌঁছে দিবে। সেটি স্রেফ বেঁচে থাকার পথ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ভাগ্য পরিবর্তনের পথ নয়। সভ্য মানব রূপে বেড়ে উঠার পথও নয়। ভাগ্য পাল্টাতে হলে বেশি বেশি বই পড়তে হবে, মনের পুষ্টি বাড়াতে হবে -একমাত্র তখনই চেতনার উন্নয়নের সাথে দেশের উন্নয়নও আসবে। বাংলাদেশীরা যতদিন ‌বই  পড়তে না শিখবে ততদিন তাদের কোন ভবিষ্যৎ নেই। উন্নয়নের স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই থেকে যাবে। পরিতাপের বিষয় হলো বাংলাদেশীরা তা থেকে শিক্ষা নেয়নি। বিশ্বের মধ্যে যে জাতিগুলো সবচেয়ে কম বই পড়ে তার মধ্যে একটি জাতি হলো বাংলাদেশীরা।

শিশুর জীবনে উন্নয়নের শুরু বেশি বেশি বই পড়ার মধ্য দিয়ে। যে শিশু যত বই পড়ে, সে শিশু ততই সামনে এগোয়। সেটি অবিকল সত্য জাতির বেলায়ও। তাই ঘরে শুধু চাল ডাল ও মিষ্টি রাখলে চলে না, ভাল বই রাখতে হয়। যে গৃহে বেশি বেশি ভাল বই থাকে, সে গৃহে কেউ না কেউ জ্ঞানী হিসাবে বেড়ে উঠে। তাই মুসলিমদের গৌরব যুগে ঘরের অলংকার ছিল বৃহৎ লাইব্রেরি। পতনের শুরু তখন থেকেই, যখন মুসলিমদের গৃহ থেকে বিলুপ্ত হয়েছে লাইব্রেরি।  

 
জ্ঞানার্জন ফরজ মৃত্যু অবধি

ছাত্র জীবনের শেষ নাই। দেহ বাঁচাতে হলে সারা জীবন যেমন পানাহারের কাজ চালিয়ে যেতে হয়, তেমনি মনের স্বাস্থ্য বাঁচাতে সারা জীবন জ্ঞানার্জনের কাজ চালিয়ে যেতে হয়। বিরতির সুযোগ নাই।  তাই নবীজী (সা:) বলেছেন, “দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞানার্জন করো”। এবং তিনি আরো বলেছেন, “ধ্বংস তার জন্য যার জীবনে পর পর দুটি দিন অতিবাহিত হলো, অথচ জ্ঞানের ক্ষেত্রে কোন বৃদ্ধি ঘটলো না”।  অথচ বাঙালি মুসলিমের জীবনে বছরের পর বছর চলে যায়, কিন্তু জ্ঞানের রাজ্যে কোন বৃদ্ধি ঘটে না। জ্ঞানার্জনের পর্ব শেষ হয় কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগের সাথে সাথে। বুঝতে হবে, জ্ঞানার্জন কোন মামুলি কাজ নয়, এটি উত্তম ইবাদত। নামাজ রোজার ন্যায় ইবাদত যেমন মৃত্যু অবধি ফরজ, তেমনি জ্ঞানার্জনও মৃত্যু অবধি ফরজ।

তাছাড়া প্রতিটি ব্যক্তিকে প্রতি মুহুর্ত নানা মতবাদ, নানা দর্শন, নানা কুমন্ত্রণা ও নানা রূপ অজ্ঞতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ নিয়ে বাঁচতে হয়। সশস্ত্র যুদ্ধ না থাকলেও প্রতিটি ঈমানদারকে প্রতি মুহুর্ত বাঁচতে হয় একটি বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধের মাঝে। সুরা ফুরকানে সে বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধকে জিহাদান কবিরা বা বড় জিহাদ বলা হয়েছে। সে জিহাদের অস্ত্র হলো কুর’আন। এবং অস্ত্র হতে পারে কুর’আনী জ্ঞান সমৃদ্ধ বই। যাদের সে অস্ত্র নাই তাদের বাঁচতে হয় সে বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদে পরাজয় নিয়ে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে যারা জাতীয়তাবাদ, ফ্যাসিজম, সেক্যুলারিজম ও কম্যুনিজমের স্রোতে ভেসে যায় তারা তো সে বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধে পরাজিতদের দল।          

সভ্য মানুষকে শুধু বাজারে ভাল খাবারের সন্ধান করলে চলে না, তাকে ভাল বইয়েরও সন্ধান করতে হয়। অথচ বাঙালি মুসলিম ভাল খাবারের সন্ধানে যতটা ব্যাকুল, ততটা ব্যাকুল নয় ভাল বইয়ের সন্ধানে। এটি এক ভয়ংকর বার্তা দেয়। সেটি হলো চেতনার দ্রুত স্বাস্থ্যহানী ঘটিয়ে দ্রুত এক অসভ্য জাতিতে পরিণত হওয়ার। তবে বাংলাদেশীরা যে সে পর্যায়ে অনেক আগেই পৌঁছে গেছে -সে আলামত তো সুস্পষ্ট। যারা দুর্বৃত্তিতে ৫ বার বিশ্বে প্রথম হয়, যাদের দেশে প্লাবন ভোট ডাকাতি, গুম খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজী, সন্ত্রাস, ঘুশ ও প্রতারণার -সে জাতি কি নিজেকে আদৌ সভ্য ও সুশীল রূপে দাবী করতে পারে? এমন অসভ্যতা তো আফ্রিকার জঙ্গলেও নেই। কারণ সেখানে নানা জাতের পশু বাস করলেও এমন চাঁদাবাজ, ঘুষখোর ও প্রতারক মানুষ বাস করে না। ৬/৯/২০২৬