জনি সিদ্দিক: সকাল বেলার নরম আলোয় এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চায়ের সঙ্গে খবরের কাগজে চোখ বুলানো অথবা টিভির সংবাদ শোনা বাঙালি জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমরা পত্রিকা হাতে নিই বা টিভির সংবাদ শুনি ও দেখি দেশ-দশের খবর জানতে, রাজনীতি থেকে অর্থনীতি, আর খেলার মাঠ থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের হাওয়া বুঝতে। কিন্তু এই ভালো মন্দের খবরগুলোর ভিড়ে পত্রিকার শেষের দিকের পাতাগুলোতে বা রঙিন ক্রোড়পত্রে মাঝেমধ্যেই চোখ আটকে যায়। সেখানে আমরা কী দেখি? ‘বিনোদন’ বা ‘গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ড’ বা ‘বিজ্ঞাপন’ -এর নাম করে সেখানে প্রায়শই এমন সব ছবি ছাপা হয়, যেখানে নারীর উপস্থাপন রীতিমতো কুরুচিপূর্ণ, অর্ধনগ্ন এবং যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ। শুধুমাত্র বিনোদন পাতাতেই নয় বরং টিভি বিজ্ঞাপন ও খেলাধুলার পাতাতেও এটি মাঝেমধ্যে দৃষ্টিগোচর হয়। দৃশ্যত মনে হতে পারে, এটি তো নিছক বিনোদন মাত্র! কিন্তু একটু গভীরভাবে ভাবলে দেখা যায়, সংবাদপত্রের মতো একটি দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানে নারীর এই পণ্যরুপে উপস্থাপন কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। এটি একটি সামাজিক অসুখ, যা আমাদের রুচি, নীতিবোধ এবং আইনি কাঠামোর মূলে কুঠারাঘাত করছে। যখন পত্রিকার সম্পাদকীয় এবং উপ সম্পাদকীয় পাতায় নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী সম্পাদকীয় ছাপা হয়, আর আনন্দ বিনোদনের পাতায় নারীকে কেবল প্রদর্শনীয় বস্তু হিসেবে দেখানো হয়। তখন এই দ্বিমুখী আচরণ বা ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ নিয়ে প্রশ্ন তোলাই সময়ের দাবি।
নারী সম্মান ও শ্রদ্ধার পাত্রী
নারী মানে আমাদের মা, বোন, স্ত্রী, দাদি, ফুফু, চাচি ও কন্যা। আমাদের নিকট মায়ের সম্মান একরকম, তেমনি বোনের সম্মান আরেকরকম, স্ত্রী, কন্যা ও অন্যান্যদের স্থান, সম্মানও ভিন্ন ভিন্ন। নারী মানেই সম্মান ও শ্রদ্ধার জায়গা। আমার নিকট যেমন আমার মায়ের, বোনের, স্ত্রী বা কন্যার অপরিসীম সম্মান ও মর্যাদা রয়েছে তেমনি অপরজনের মা, স্ত্রী বা কন্যারও একই মর্যাদা এবং সম্মান রয়েছে। তাই অপর কোন নারীর প্রতি অসম্মান করার পূর্বে নিজের ক্ষেত্র নিয়ে ভাবতে হবে। প্রতিটা নারীই চায় তার মান সম্মান অপরজনের কাছ থেকে নিরাপদ থাকুক। তার অঙ্গ যেন পর পুরুষের দৃষ্টিতে না পড়ে। কেউ যেন তার মান-সম্মান নিয়ে প্রশ্ন না তুলতে পারে। কিন্তু যে নারী এই চিরাচরিত প্রথার বিপরীত, যে নারী চায় তার দেহ, অঙ্গ-শোভা পর পুরুষ বা গায়রে মাহরাম দেখুক, তাকে ভোগ করুক অবৈধ উপায়ে সে নারী নয়; সে পতিতার মতো। মুসলিম নারীদের নিকট পর পুরুষের কাছ থেকে আপাদমস্তক ঢেকে রাখা ফরজ। সামান্য চুলও গায়রে মাহরামের সামনে খুলে রাখা জায়েজ নেই। এর মাধ্যমে বোঝা যায় নারীর সম্মান কতটুকু দামি!
বাণিজ্যের যাঁতাকলে নারীর সম্মান
কেন একটি পত্রিকা নারীর শরীরী আবেদনকে পুঁজি করে? উত্তরটি খুব কঠিন হলেও সত্য। এটি হলো সার্কুলেশন বাড়ানোর কৌশল। সাংবাদিকতার ভাষায় একে অনেক সময় ‘ইয়েলো জার্নালিজম’ বা ‘হলুদ সাংবাদিকতা’র অংশ বলা হয়, যদিও এখন মূলধারার অনেক গণমাধ্যমও এই স্রোতে গা ভাসাচ্ছে।
মুক্ত বাজার অর্থনীতির দোহাই দিয়ে সংবাদপত্রের সার্কুলেশন বাড়ানোর উদ্দেশ্যে মানুষের সহজাত প্রবৃত্তিকে পুঁজি করার এই ব্যবসায়িক কৌশল সাংবাদিকতার নৈতিকতাকে আজ চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। কিছু পত্রিকার মালিক বা বিপণন বিভাগ মনে করে, পাঠকের চোখ আটকাতে হলে এবং বিজ্ঞাপনের বাজার ধরতে হলে নারীর আকর্ষণীয় ছবি অপরিহার্য। এখানে একজন অভিনেত্রী, গায়িকা বা মডেলের পরিচয় তার প্রতিভায় নয়, বরং তার শারীরিক গঠনে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘নারীর বস্তুকরণ’। অর্থাৎ, নারীকে রক্ত-মাংসের আবেগপূর্ণ মানুষ হিসেবে না দেখে, তাকে একটি জড় বস্তু বা ‘শো-পিস’ হিসেবে দেখা। এটি সাংবাদিকতার পবিত্রতার সঙ্গে এক ধরণের বিশ্বাসঘাতকতা। গণমাধ্যমের কাজ যেখানে জনরুচি তৈরি করা, সেখানে তারা যদি জনরুচির দোহাই দিয়ে সস্তা চটকদারিতার আশ্রয় নেয়, তবে সেই সমাজ পথ হারাবে সেটাই স্বাভাবিক। অনেকেই বিনোদন পাতার আকর্ষণীয়, উত্তাপ ছড়ানো ছবিগুলো দেখে মনে মনে তার বিষয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তোলে।
মনস্তাত্ত্বি¡ক বিপর্যয়: কাল্টিভেশন থিওরি ও বিকৃত বাসনা
এই ধরনের ছবি ও সংবাদ প্রকাশ কেবল কাগজের পাতার বিষয় নয়, এটি সরাসরি পাঠকের মনস্তত্বে আঘাত হানে। বিশেষ করে উঠতি বয়সের তরুণ-তরুণীদের ওপর এর প্রভাব ভয়াবহ।
মিডিয়া গবেষক জর্জ গারবনারের বিখ্যাত ‘কাল্টিভেশন থিওরি’ (ঈঁষঃরাধঃরড়হ ঞযবড়ৎু) অনুযায়ী, মানুষ গণমাধ্যমে যা বারবার দেখে, অবচেতন মনে সেটাকেই বাস্তব বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে। যখন একজন কিশোর দিনের পর দিন দেখবে যে, পত্রিকার পাতায় নারীর গুরুত্ব কেবল তার যৌন আবেদনে, তখন বাস্তব জীবনেও সে সহপাঠী বা সহকর্মীকে শ্রদ্ধার চোখে দেখতে ব্যর্থ হবে। তার মগজে এই বার্তা স্থায়ী হয়ে যায় যে, “নারীর প্রধান কাজ হলো পুরুষের দৃষ্টিকে সন্তুষ্ট করা। নারী হল পুরুষকে দেখানোর জিনিস।”
অন্যদিকে, আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (অচঅ) তাদের বিভিন্ন গবেষণাপত্রে (যেমন: জবঢ়ড়ৎঃ ড়ভ ঃযব অচঅ ঞধংশ ঋড়ৎপব ড়হ ঃযব ঝবীঁধষরুধঃরড়হ ড়ভ এরৎষং) স্পষ্ট উল্লেখ করেছে যে, মিডিয়ায় নারীর অতি-যৌনায়িত উপস্থাপন কিশোরী ও নারীদের আত্মবিশ্বাস ধ্বংস করে দেয়। তারা নিজেদের মেধা বা ব্যক্তিত্বের চেয়ে বাহ্যিক সৌন্দর্য নিয়ে অতিমাত্রায় চিন্তিত হয়ে পড়ে, যা থেকে বিষন্নতার মতো মানসিক ব্যাধি জন্ম নেয়। এতে করে শুধুমাত্র তারা রূপচর্চার ব্যাপারে বেশি ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। এবং সারাক্ষণ মেকাপের ক্রিম ব্যবহারের প্রতি গুরুত্ব বেশি দেয়।
ধর্ষণ সংস্কৃতি ও গণমাধ্যমের দায়
আমরা প্রায়ই সমাজে ধর্ষণ ও যৌন হয়রানি বাড়লে বিচারহীনতাকে দোষ দিই। কিন্তু আমরা কি ভেবে দেখেছি, এই অপরাধপ্রবণ মানসিকতা তৈরির রসদ কোথা থেকে আসে? সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, মিডিয়ায় নারীকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করা এবং সমাজে নারীর প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধির মধ্যে একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক যোগসূত্র রয়েছে।
নারীবাদী চলচ্চিত্র বিশ্লেষক লরা মালভে একে ব্যাখ্যা করেছেন ‘মেইল গেজ’ (গধষব এধুব) বা পুরুষালি দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে। বিনোদন পাতার ছবিগুলো এমনভাবে তোলা ও বাছাই করা হয় যেন এর দর্শক কেবল একজন কামাতুর পুরুষ। যখন সমাজ নারীকে ‘ব্যক্তি’র বদলে ‘বস্তু’ ভাবতে শেখে, তখন সেই বস্তুর প্রতি সহিংস হতে তার বিবেক বাধা দেয় না। কারণ, বস্তুর কোনো অনুভূতি থাকে না আর বস্তুর প্রতি কে সহানুভূতিও দেখায় না। পত্রিকার ওই আপত্তিকর ছবিগুলো পরোক্ষভাবে অপরাধীদের মনে নারীর প্রতি অসম্মান ও লালসাকে বৈধতা দেয়। এটি ধর্ষণ সংস্কৃতি -কে উস্কে দেওয়ার শামিল।
বাংলাদেশের আইন কী বলে? (তথ্য ও বাস্তবতা)
অনেকের ধারণা, সংবাদমাধ্যমে বা বিনোদন পাতায় যা ইচ্ছা তাই ছাপানো যায়। কিন্তু বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ও সংবিধান এই বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর। তবে আইনগুলো যেন কেবল বইয়ের পাতাতেই সীমাবদ্ধ।
১. দণ্ডবিধি, ১৮৬০
আমাদের দণ্ডবিধির ২৯২ ধারায় অশ্লীল পুস্তক, ছবি বা বস্তু বিক্রি, বিতরণ বা জনসমক্ষে প্রদর্শন নিষিদ্ধ। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো ২৯৩ ধারা, যেখানে বলা হয়েছে অনূর্ধ্ব ২০ বছর বয়সী কোনো ব্যক্তির কাছে অশ্লীল বস্তু বিক্রি বা বিতরণ করা কঠোর দণ্ডনীয় অপরাধ। খবরের কাগজ তো সব বয়সের মানুষের হাতে যায়, গেস্ট রুমে রাখা থাকে, লাইব্রেরীতে রাখা থাকে। শিশুরা বা কিশোররা যখন এই ছবিগুলো দেখে, তখন পত্রিকার সম্পাদক কি ২৯৩ ধারা ভঙ্গের দায়ে অভিযুক্ত হন না? পুরুষ যখন একজন নারীর অর্ধনগ্ন ছবি দেখবে তখন কি সে তার মনে তাকে নিয়ে ভাববে না?
২. পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২:
এই আইনে পর্নোগ্রাফির সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, “যৌন উত্তেজনা সৃষ্টিকারী কোনো দৃশ্য, ছবি বা ভিডিও প্রকাশ করা অপরাধ।” যদিও সংবাদপত্রের ছবি হার্ডকোর পর্নোগ্রাফি নয়, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তা ‘সফট পর্নোগ্রাফি’র পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যা এই আইনের চেতনার পরিপন্থী।
৩. সংবিধান ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা: বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু তা অবাধ নয়। সেখানে স্পষ্ট বলা আছে, এই স্বাধীনতা ‘জনশৃঙ্খলা, শালীনতা ও নৈতিকতা’র সাপেক্ষে প্রযুক্ত হবে। অর্থাৎ, অমলীন বিনোদনের নামে অশালীনতা প্রচার সংবিধান স্বীকৃত অধিকার নয়। যাচ্ছেতাই করা উচিত নয়।
৪. প্রেস কাউন্সিল আচরণবিধি:
বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের প্রণীত আচরণবিধিতে সুস্পষ্ট নির্দেশনা আছে যে, নারীর মর্যাদা ক্ষুন্ন হয় এবং যা জনস্বার্থ ও নৈতিকতার পরিপন্থী এমন কিছু প্রকাশ করা যাবে না।
তাহলে আমরা যদি নারীকে সম্মানের চোখে দেখি, নারীর অধিকারের জন্য গলা ফাটাই আবার বিনোদনের পাতায় অর্ধনগ্ন, আবেদনময়ী, উত্তাপ ছড়ানো ছবি প্রচার করি! তাহলে নারীর সম্মান কোথায় যায়? এর মাধ্যমে কি আসলে ওই নারীর মর্যাদা বাড়ে নাকি কমে বৈকি?
সম্পাদকীয় ভণ্ডামি ও বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট
সবচেয়ে পীড়াদায়ক বিষয় হলো সংবাদপত্রের ‘দ্বৈত চরিত্র’। একই পত্রিকার সম্পাদকীয় পাতায় যখন নারী দিবসে নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে বড় বড় বুলি আওড়ানো হয়, আর কয়েক পাতা উল্টালেই দেখা যায় নারীর দেহসর্বস্ব উপস্থাপন, তখন সচেতন পাঠকের মনে কি বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়না? একে বলা যায় নীতিগত ভণ্ডামি।
সম্পাদকরা যুক্তি দিতে পারেন, “পাঠক এটাই চায়।” কিন্তু আমি বলবÑ এটি একটি খোঁড়া যুক্তি। পাঠক যদি মাদক চায়, তবে কি মুদি দোকানদার মাদক বিক্রি করবেন? সংবাদপত্রের দায়বদ্ধতা মুদি দোকানের চেয়ে অনেক বেশি। তাদের কাজ পাঠকের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি পাঠকের রুচি উন্নত করা। সমাজের সমস্যাগ্রস্ত চিত্র দেশের জনগণের কাছে তুলে ধরা। ইউনেস্কো তাদের ‘জেন্ডার-সেনসিটিভ ইন্ডিকেটর ফর মিডিয়া’ নীতিমালায় বারবার বলেছে, মিডিয়াকে অবশ্যই জেন্ডার বা লিঙ্গ সংবেদনশীল হতে হবে এবং স্টেরিওটাইপ ভাঙতে হবে। কিন্তু আমাদের বিনোদন সাংবাদিকতা সেই স্টেরিওটাইপ বা গৎবাঁধা প্রথা সর্বস্ব ধারণাটিকেই আরও শক্তিশালী করছে।
সমাধানের পথরেখা:
সমস্যাটি গভীর, কিন্তু সমাধান করা যে অসম্ভব, তা কিন্তু নয়। এর জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত সদিচ্ছা ও কাঠামোগত পরিবর্তন। নিচে কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ আলোচনা করলাম:
১. সম্পাদকীয় নীতিমালায় আমূল পরিবর্তন:
গণযোগাযোগ তত্ত্বে¡ কার্ট লুইনের ‘গেটকিপিং’ ধারণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পত্রিকার বার্তা সম্পাদক ও বিনোদন সম্পাদক হলেন সেই দারোয়ান বা গেটকিপার। তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে কোন ছবিটি যাবে, আর কোনটি যাবে না। প্রতিটি মিডিয়া হাউসের একটি লিখিত জেন্ডার পলিসি বা নীতিমালা থাকতে হবে। সেখানে স্পষ্ট উল্লেখ থাকতে হবে যে, খবরের জন্য যথোপযুক্ত ক্ষেত্র বা কারন ছাড়া মহিলাদের বিনোদনের নামে নারীর শরীর প্রদর্শন করা যাবে না। নারীর শরীরের চিত্র ছাড়াও অনেক সংবাদ করা যায়।
২. ভাষা ও উপস্থাপনে সংবেদনশীলতা:
ছবিই শুধু নয়, ছবির ক্যাপশন বা সংবাদের ভাষাও অনেক সময় কুরুচিপূর্ণ হয়। ‘আবেদনময়ী’, ‘উষ্ণতা ছড়ালেন’, ‘আলো ছড়ালেন’, ‘নজর কাড়লেন’ এই জাতীয় শব্দচয়ন পরিহার করতে হবে। বিনোদন পাতায় একজন অভিনেত্রীর অভিনয়ের দক্ষতা, তার সমাজসেবা, তার সিনেমার খবর, কৃতিত্বের খবর বা তার সংগ্রামের গল্প উঠে আসতে পারে। তা না করে তার পোশাকের মাপজোক, শরীরের প্রদর্শনী কেন খবরের বিষয় হবে?
৩. প্রেস কাউন্সিলের সক্রিয় ও দৃশ্যমান ভূমিকা:
বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলকে ‘কাগুজে বাঘ’ হয়ে থাকলে চলবে না। তাদের স্বপ্রণোদিত হয়ে মনিটরিং করতে হবে। যারা নিয়মিত অশ্লীলতা ছড়াচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি নোটিশ বা ভর্ৎসনার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে জরিমানা বা লাইসেন্স বাতিলের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তাদের প্রয়োগ করতে হবে।
৪. মিডিয়া লিটারেসি ও পাঠক আন্দোলন:
পরিবর্তনের চাবিকাঠি আসলে পাঠকের হাতে। আমরা পাঠকরা যদি সচেতন হই, তবে এই অনাচার বন্ধ হতে বাধ্য। সোশ্যাল মিডিয়ার এই যুগে পাঠকরা যদি সংগঠিত হয়ে এমন কুরুচিপূর্ণ কনটেন্টের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়, বয়কটের ডাক দেয়, তবে সংবাদ মাধ্যম গুলো এবং তাদের সাথে বিজ্ঞাপনদাতারাও সতর্ক হবেন। কারণ, কোনো ব্র্যান্ডই বিতর্কিত বা নোংরা ইমেজের সঙ্গে নিজেকে জড়াতে চায় না।
৫. গবেষণা ও প্রশিক্ষণ:
সাংবাদিকদের জন্য জেন্ডার সংবেদনশীলতার ওপর নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।এনজিওগুলোর সহায়তায় এ ব্যাপারে গবেষণা করতে হবে। কীভাবে সুস্থ বিনোদন দিয়েও পত্রিকার জনপ্রিয়তা ধরে রাখা যায় তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা করতে হবে। আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলো কীভাবে শালীনতা বজায় রেখে বিনোদন সাংবাদিকতা করছে, সে পদ্ধতি অনুসরণ করে তা থেকে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে।
পরিশেষে, একটি কথা আমাদের মনে রাখতে হবেÑ “স্বাধীনতা মানে স্বেচ্ছাচারিতা নয়।” বিনোদন মানুষের মনের খোরাক যোগায়, কিন্তু সেই বিনোদন যদি সমাজের নৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়, নারীর সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দেয়, তবে তা বর্জনীয়। নারী কোনো পণ্য নয়, নারী মা, বোন, জায়া, কন্যা এবং সর্বোপরি একজন সম্মানী মানুষ।
আজকের সংবাদপত্রে নারীর যে ছবিটি ছাপা হচ্ছে, তা কেবল কালির আঁচড় নয়; তা আগামী প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করছে। আমরা কি চাই আমাদের সন্তানরা নারীকে কেবল ভোগের বস্তু হিসেবে দেখুক? নিশ্চয়ই না। তাই সময় এসেছে জেগে ওঠার। সম্পাদক, সাংবাদিক, নীতি-নির্ধারক এবং পাঠক সবাইকে এক কাতারে দাঁড়িয়ে বলতে হবে: “বিনোদনের নামে আর কোনো নোংরামি নয়, নারীকে তার প্রাপ্য সম্মান ও মেধার আলোয় উদ্ভাসিত করুন।” যেদিন পত্রিকার বিনোদন পাতাটি নারীর শরীরসর্বস্বতা থেকে বেরিয়ে শিল্প ও সংস্কৃতির প্রকৃত দর্পণ হয়ে উঠবে, নির্ধারিত কোন রাজনৈতিক দলের তোষামদি বন্ধ করে নিরপেক্ষভাবে সংবাদ পরিবেশন করবে, সেদিনই আমরা দাবি করতে পারব যে, আমাদের গণমাধ্যম আসলেই সমাজের বিবেক। আমরা আগামীতে সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়তে প্রত্যেকটা গণমাধ্যমের নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি প্রত্যাশা করছি এবং নারীদের প্রাপ্য সম্মান রক্ষার্থে বিনোদন, বিজ্ঞাপনের নামে নারীর শরীর প্রদর্শনের মত নিম্ন রুচির কাজ থেকে বিরত থাকার আহ্বান করছি।
তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট