ফিরোজ মাহবুব কামাল
ব্যর্থতা মুত্তাকী হওয়ায়
ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের ব্যর্থতা মুসলিম উম্মাহর নানারূপ ব্যর্থতার মুখোশ খুলে দেয়। তখন ধরা পড়ে ঈমানদার হওয়ার বিশাল ব্যর্থতা। উম্মাহর সে ব্যর্থতা বেশি বেশি মসজিদ মাদ্রাসা নির্মাণ করে ঢাকা যায়না। ঢাকা যায় না নামাজী, রোজাদার, হাজী ও মোল্লা মৌলভীর সংখ্যা বাড়িয়ে। মুসলিমদের ঈমানশূণ্যতা ও বেঈমানী আর কোথাও এতোটা প্রকট ভাবে ধরা পড়ে না যতটা ধরা পড়ে মুসলিম ভূমিতে ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণে ব্যর্থতা দেখে। ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের কাজটি একান্তই মুত্তাকীদের কাজ। অথচ আজকের মুসলিমদের বিশাল ব্যর্থতাটি মুত্তাকী হওয়ায়। ঘুষখোর, সূদখোর, প্রতারক, চাঁদাবাজ সন্ত্রাসী এবং ধর্মব্যবসায়ীও নামাজী, রোজাদার ও হাজী হতে পারে, কিন্তু তারা কখনোই মু্ত্তাকী হতে পারে না। মুত্তাকী তো তারাই যাদের কর্ম, ভাবনা, বুদ্ধিবৃত্তি, রাজনীতি ও যুদ্ধ-বিগ্রহের মাঝে তাকওয়া তথা আল্লাহর ভয় দেখা যায়। তারা কখনোই ইসলামী অঙ্গীকারশূণ্য সেক্যুলারিস্ট, ফ্যাসিস্ট, কম্যুনিস্ট ও জাতীয়তাবাদী হয়না। তারা নিজের, পরিবারের, দলীয় ও জাতীয় এজেন্ডার উর্দ্ধে উঠে মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডাকে বিজয়ী করার জিহাদ নিয়ে বাঁচে এবং সে জিহাদে নিজের অর্থ, শ্রম, মেধা ও প্রাণের কুরবানী পেশ করে। সেরূপ তাকওয়া নিয়ে বেঁচেছেন নবীজী (সা:)’য়ের সাহাবীগণ। তারা ছিলেন উচ্চমার্গীয় মুত্তাকী। ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের জিহাদে অর্ধেকের বেশি সাহাবা শহিদ হয়ে গেছেন। মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে অতি প্রিয় হলো এই মুত্তাকীরা -অর্থাৎ যারা বাঁচে আল্লাহর ভয় নিয়ে। তাই তাগিদ এসেছে নিচের আয়াতে:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَلْتَنظُرْ نَفْسٌ مَّا قَدَّمَتْ لِغَدٍ ۖ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ
অর্থ: “হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহ তা’আলাকে ভয় কর। এবং প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত, আগামী দিনের জন্যে অর্থাৎ আখেরাতের জন্য সে কি প্রেরণ করে, তা নিয়ে চিন্তা করা। এবং আল্লাহ তা’য়ালাকে ভয় করতে থাকো। তোমরা যা কর, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’য়ালা সে সম্পর্কে খবর রাখেন।” –(সুরা হাশর, আয়াত ১৮)।
উপরের আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মুত্তাকী হতে বলেছেন তাদের, যারা ইতিমধ্যেই ঈমানদার। এ থেকে বুঝা যায়, ঈমান আনলেই আল্লাহ তায়ালার পথে যাত্রা থেমে যায়না, তাকে অবশ্যই মুত্তাকী হতে হয়। মুত্তাকী হওয়ার অর্থ হলো, বাঁচতে হয় আল্লাহ তায়ালার ভয় তথা আখেরাতে জবাবদেহীদের ভয় নিয়ে। ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণে জরুরি হলো মুত্তাকী ঈমানদারদের নির্মাণ। সে লক্ষ্যে বিপ্লব আনতে হয় ঈমানদারের চেতনার ভূমিতে। কারণ, সকল বিপ্লবের শুরু চেতনার ভূমি থেকেই। যারা ঘুষখোর, সূদখোর, ব্যাভিচারী, স্বৈরাচারী, চোরডাকাত, ভোটডাকাত ও প্রতারক, তাদের দিয়ে আর যাই হোক ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের কাজটি হয় না। এদের অনেকে নামাজ পালন করে, মসজিদ মাদ্রাসা নির্মাণে অর্থও দেয়, কিন্তু নির্বাচনে ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের পক্ষে ভোট দিতে এরা রাজী নয়। তারা ভোট দেয় জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিস্ট ও সেক্যুলারিস্টদের বিজয়ী করতে। তাদের ভোটদানে নির্মিত এমন এক রাষ্ট্র -যা প্লাবন আনে গুম, খুন, ধর্ষণ, চুরি-ডাকাতিসহ নানারূপ দুর্বৃত্তির। এমন রাষ্ট্রের বিরামহীন যুদ্ধটি ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ রোধে। এমন দুর্বৃত্ত শাসন নির্মূল করা না গেলে সে ভূমিতে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা অসম্ভব।
ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণে অর্থ, শ্রম, মেধা ও রক্তের খরচটি বিশাল। শুধু দোয়া-দরুদে সে কাজ হয়না। তাই নবীজী (সা:)কেও অস্ত্র হাতে জিহাদের ময়দানে নামতে হয়েছে। যারা শুধু নামাজ-রোজা ও হজ্জ-যাকাত নিয়ে বাঁচে এবং জিহাদে নাই -বুঝতে হবে তারা নবীজী (সা:)’য়ের সূন্নতের উপর নাই। আর যারা নবীজী (সা:)’য়ের সূন্নত নিয়ে বাঁচে না -তারা কখনো ঈমানদার হতে পারে না। কারণ, নবীজী (সা:)’য়ের অনুসরণের অর্থ হলো মহান আল্লাহ তায়ালার অনুসরণ -যার ঘোষণা এসেছে সুরা নিসার ৮০ নম্বর আয়াতে। তাই নবীজী (সা:)’য়ের কোন সূন্নতকে অবজ্ঞা করার অর্থ, মহান আল্লাহ তায়ালার বিধানের বিরুদ্ধে অবজ্ঞা।
বিপ্লবের মূল উপাদান: আখেরাতের ভয়
মুসলিম জীবনে বিপ্লবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানটি হলো আখেরাতে ভয়। আখেরাতে ভয় না থাকাতে বহু নামাজী, রোজাদার এবং হাজী ঘুষখোর, সূদখোর, মিথ্যাচারী, স্বৈরাচারী এবং পেশাদার দুর্বৃত্ত হয়। এরা কখনোই মুত্তাকী হতে পারে না। কারণ, মুত্তাকী হওয়ার জন্য জরুরি আখেরাতের ভয়। সে ভয় থেকে জন্ম নেয় মহান রব’য়ের এজেন্ডাকে বিজয়ী করার তাড়না এবং জন্ম দেয় জিহাদের। বস্তুত জিহাদের মধ্যে দৃশ্যমান হয় ব্যক্তির ঈমান, তাকওয়া ও আখেরাতের ভয়। মহান আল্লাহ তায়ালা তাই প্রশ্ন রেখেছেন:
فَكَيْفَ تَتَّقُونَ إِن كَفَرْتُمْ يَوْمًۭا يَجْعَلُ ٱلْوِلْدَٰنَ شِيبًا
অর্থ: “তোমরা কিরূপে মুত্তাকী হবে, যদি সেদিনকে অর্থাৎ আখেরাতকে অস্বীকার করো -যে দিন যুবকেরা ভয়ে বৃদ্ধে পরিণত হবে।” –( সুরা মুজাম্মেল, আয়াত ১৭)।
উপরের আয়াতটিতে এটাই বুঝানো হয়েছে, আখেরাতের ভয় ছাড়া মুত্তাকী হওয়া অসম্ভব। আখেরাতের ভয় ব্যক্তিকে শুধু দুর্বৃত্তি থেকেই দূরে রাখে না, বরং দুর্বৃত্তি নির্মূলের জিহাদে হাজির করে। মুত্তাকী ব্যক্তির তাকওয়া হলো, স্বল্পকালীন পার্থিব জীবনের আনন্দ বাড়াতে গিয়ে নিজেকে অনন্তকালীন জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করতে চায় না। আখেরাতের ভয় এখানে ব্রেকের কাজ করে। যারা কাফের, জালেম, মুনাফিক ও ফাসিক -তাদের মূল রোগটি হলো, তাদের থাকে না আখেরাতের ভয় । অপরাধ কর্ম থেকে থামাতে তাদের জীবনে কোন ব্রেক থাকে না। ফলে আখেরাতের ভয়শূণ্যতাই হলো কাফিরদের জীবনে সবচেয়ে ভয়ানক রোগ। এ রোগ অসম্ভব করে মুত্তাকী হওয়া। আখেরাতের ভয়শূণ্যতা তাদেরকে দুর্বৃত্তে পরিণত করে। তাদের সে রোগের কথা জানিয়ে দিযেছেন সর্বজ্ঞানী মহান আল্লাহ তায়ালা। সে রোগের লক্ষণটি তুলে ধরতে পবিত্র কুর’আন। বার বার বলা হয়েছে:
كَلَّا ۖ بَل لَّا يَخَافُونَ ٱلْـَٔاخِرَةَ
অর্থ: “না, তারা মুত্তাকী হওয়ার যোগ্য নয়; তারা তো আখেরাতকে ভয় করে না।” -( সুরা মুদাচ্ছির, আয়াত ৫৩)।
সেক্যুলারিস্টদের পক্ষে অসম্ভব কেন মুত্তাকী হওয়া?
বেঈমানদের মূল রোগটি হলো সেক্যুলারিজম তথা ইহজাগতিক জীবনের মোহ। তাদের চেতনায় আখেরাতের ভয় স্থান পায়না। ফলে তাদের পক্ষে অসম্ভব হলো মুত্তাকী হওয়া। তাদের সে আসল রূপটি সর্বজ্ঞানী মহান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে উম্মোচন করা হয়েছে এভাবে:
بَلْ تُؤْثِرُونَ ٱلْحَيَوٰةَ ٱلدُّنْيَا
অর্থ: “কিন্তু তোমরা বেঈমানগণ (আখেরাতের বদলে) দুনিয়ার জীবনকে প্রাধান্য দিয়ে থাকো।” –( সুরা আলা, আয়াত ১৬।
সেক্যুলারিস্টদের সমগ্র সামর্থ্য ব্যয় হয় স্রেফ দুনিয়ার জীবনকে আনন্দময় করতে। পার্থিব জীবনের সাফল্য দেখে তারা আত্মহারা হয় এবং ভাবে, তারা তো ভালই করছে। সে ব্যস্ততার মাঝে আখেরাতের দিকে নজর দেয়ার সময় তাদের থাকেনা। তারা চায়না আখেরাতের ভয় তাদের ভোগের আয়োজনে বাধা বা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করুক। তারা চায় লাগামমুক্ত জীবন। ফলে চায় না ইসলাম রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। কারণ ইসলামী রাষ্ট্রে থাকে শরিয়তি আইনের কড়া নিয়ন্ত্রণ; থাকে হালাম হারামে বাছবিচার।
অথচ মুত্তাকী ব্যক্তির প্রায়োরিটি ভিন্ন। সে তাঁর সর্বসামর্থ্য বিনিয়োগ করে আখেরাতে সফল হতে তথা জান্নাতে পেতে। দারিদ্রতার মাঝেও সে জিহাদে নিজ অর্থ, নিজ মেধা, নিজ শ্রম এমন কি রক্তের বিনিয়োগে কার্পণ্য করে না। এরূপ তাড়নার মাঝে তার তাকওয়া দেখা যায়। সেক্যুলারিস্টদের থেকে এখানেই ঈমানদারদের মূল পার্থক্য। সেক্যুলারিস্টদের পার্থিব বিনিয়োগ নিয়ে মহান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে বয়ান এসেছে:
ٱلَّذِينَ ضَلَّ سَعْيُهُمْ فِى ٱلْحَيَوٰةِ ٱلدُّنْيَا وَهُمْ يَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ يُحْسِنُونَ صُنْعًا
অর্থ: (এরাই হলো তারা) যারা তাদের সকল প্রচেষ্টাকে নিঃশেষ করেছে তাদের পার্থিব জীবনকে সফল করতে; এবং তারা ভাবে, কাজে কর্মে তারা ভালই করছে।” -( সুরা আল কাহাফ, আয়াত ১০৪।
যে কারণে অসম্ভব হয় জিহাদে অংশ নেয়া -সেটি হলো আখেরাতের ভয়শূণ্যতা। আখেরাতের ভয় ঈমানদারকে মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডাকে বিজয়ী করার জিহাদে নির্ভিক ও বেপরোয়া করে। আল্লাহর পথে কুরবানীরতে সে মনের শান্তি ও তৃপ্তি খুঁজে পায়। এরাই ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের জিহাদে মুজাহিদ হয়। অপর দিকে আখেরাতের ভয় না থাকলে নামাজ রোজা পালন করেও মানুষ দুর্বৃত্ত জালেম সরকারের সৈনিক হয়। তারা বুঝতেই পারে না, একাজ কতটা ভয়ানক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। এজন্যই ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের কাজের শুরুটি হতে হয় মুসলিমদের মাঝে আখেরাতের ভয় সৃষ্টির মধ্য দিয়ে। সেটিই নবীজী (সা:)’য়ের পথ। সেটি ঈমানদারের হৃদয়ের গভীরে কুর’আনী জ্ঞান প্রোথিত করে। আখেরাতের ভয় সৃষ্টি হলে ঈমানদার ব্যক্তির সার্বক্ষণিক তাড়নাটি হয়, সর্বপ্রকার পাপ কর্ম থেকে বাঁচা ও সর্বশ্রেষ্ঠ নেক আমলে বেশি বেশি অংশ নেয়া। এমন ব্যক্তিরা নিজে থেকেই জিহাদের রণাঙ্গণ খোঁজে। এবং সে রণাঙ্গণে নিজের অর্থ শ্রম, মেধা, সময় ও রক্তের বিনিয়োগ বাড়ায়। তার দোয়ার মধ্যেও থাকে শাহাদত লাভের তামান্না।
সর্বশ্রেষ্ঠ নেক আমলের ক্ষেত্রটি যেহেতু ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের জিহাদ, ফলে এখানে ঘটে মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডার সাথে মুত্তাকীর পূর্ণ একাত্মতা। এজন্যই মুত্তাকী ব্যক্তির ইবাদত স্রেফ নামাজ রোজা, হজ্জ যাকাত ও কুর’আন তেলাওয়াতে সীমিত থাকে না। নবীজী (সা)’র যুগে প্রতিটি জিহাদে তাদেরকে দেখা গেছে স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে অংশ নিতে। পাহাড়-পর্বত, নদী-নালা, দীর্ঘ মরু পথ, তীব্র তাপ বা শীত -তাদের সে বিনিয়োগে বাধা হতে পারিনি। তারা ছুটেছে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের নানা দুর্গম জনপদে। এ যুগেও এমন মুত্তাকীদের দেখা গেছে ইউরোপীয় দেশের চাকুরি বাকুরি ও আরাম আয়েশ ছেড়ে আফগানিস্তান ও সিরিয়ায় জিহাদে যোগ দিতে ও শহীদ হতে। অপর দিকে অতীতের সেক্যুলারিস্টদের ন্যায় এ যুগের সেক্যুলারিস্টগণও তাদের ন্যায় আল্লাহর পথের মুজাহিদদের বিভ্রান্ত, উগ্রবাদী, সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদী বলে উপহাস করে।
অপরিহার্য কেন “প্যারাডাইম শিফ্ট” তথা ভাবনার মডেলে বিপ্লব?
আরবের কাফিরগণও আল্লাহ তায়ালাকে বিশ্বাস করতো। সন্তানের নাম আব্দুল্লাহ বা আব্দুর রহমান রাখতো। কিন্তু তারা অবিশ্বাস করতো আখেরাতকে। তারা ভাবতো, মৃত্যুর পর তাদের দেহ মাটির সাথে মিশে যাবে, পুনরুত্থানের কোন সম্ভাবনাই নাই। মনে করতো, পার্থিব জীবনই একমাত্র জীবন। তাদের কাছে কেবল গুরুত্ব পেত পার্থিব জীবনের সুখ-শান্তি ও আনন্দ-উল্লাস। সে কথাটি পবিত্র কুর’আনে বার বার ঘোষিত হয়েছে। যেমন বলা হয়েছে:
إِنَّ هَـٰٓؤُلَآءِ يُحِبُّونَ ٱلْعَاجِلَةَ وَيَذَرُونَ وَرَآءَهُمْ يَوْمًۭا ثَقِيلًۭا
অর্থ: “নিশ্চয়ই এরাই হলো তারা, যারা পার্থিব জীবনকে ভালবাসে এবং উপেক্ষা করে আখেরাতের ভারী (অনন্ত) জীবনকে।” -(সুরা ইনসান, আয়াত ২৭)।
বেঈমানদের মনের সে অভিন্ন চিত্রটি আবার তুলে ধরার হয়েছে নিচের আয়াতে:
كَلَّا بَلْ تُحِبُّونَ ٱلْعَاجِلَةَ ٢٠
وَتَذَرُونَ ٱلْـَٔاخِرَةَ ٢١
অর্থ: “না, তোমরা পার্থিব জীবনকে ভালবাস। এবং উপেক্ষা করো আখেরাতকে।” –( সুরা ক্বিয়ামা, আয়াত ২০ ও ২১)।
কাফিরদের ধারনা, এ পার্থিব জীবনই একমাত্র জীবন এবং মৃত্যুর পর সব কিছুই শেষ হয়ে যাবে এবং আর কোনদিনই জীবিত করা হবে না। তাদের সে ভাবনার কথা তুলে ধরা হয়েছে নিচের আয়াতে:
إِنَّ هَـٰؤُلَاءِ لَيَقُولُونََ
إِنْ هِيَ إِلَّا مَوْتَتُنَا الْأُولَىٰ وَمَا نَحْنُ بِمُنشَرِينَ
অর্থ: “নিশ্চয়ই তারা বলবে, প্রথম মৃত্যুর মাধ্যমেই আমাদের সবকিছুর অবসান হবে এবং আমরা আর পুনরুত্থিত হবো না। -(সুরা দুখ্খান, আয়াত ৩৪-৩৫)।
তাই এটি সুষ্পষ্ট, শুধু মহান আল্লাহ তায়ালার উপর বিশ্বাস ব্যক্তির মনে ও চরিত্রে বিপ্লব আনে না। সেটি সম্ভব হলে যারা নিজ সন্তানদের নাম আব্দুল্লাহ ও আব্দুর রহমান রাখে তাদের চরিত্রে বিপ্লব আসতো। যে কারণে মানব মনে বিপ্লব আসে এবং যা ঘুরিয়ে দেয় জীবনের মোড় -তা হলো আখেরাতের ভয়। একেই বলা হয় প্যারাডাইম শিফ্ট (paradigm shift)। যার মধ্যে আখেরাতে জবাবদেহীদার ভয় রয়েছে তার পক্ষে মিথ্যাবাদী ও দুর্বৃত্ত হওয়া যেমন অসম্ভব, তেমনি অসম্ভব হলো মহান রাব্বুল আলামীনের সার্বভৌমত্ব, তাঁর শরিয়া ও এজেন্ডার পরাজয়ের মুখে নীরব ও নিষ্ক্রিয় থাকা। জুলুম ও অবিচারের সামনে নীরব ও নিষ্ক্রিয় থাকা শুধু ভীরুতা নয়, বেঈমানিও। প্রতিটি কর্ম ও আচরণের মধ্য দিয়ে ঈমানের পরীক্ষা হয়। এ জীবনটাই পরীক্ষাময়। তাই কর্মজীবনে নিষ্ক্রিয় থাকার অর্থ পরীক্ষা থেকে দূরে থাকা।
পরীক্ষা হলে বসে কেউ কি নিষ্ক্রিয় থাকে? তাঁর তো প্রতিক্ষণের তাড়না, কি করে পরীক্ষার খাতায় নাম্বার বাড়ানো যায়। ঈমানদার ব্যক্তিও তেমনি তাঁর প্রতিটি মুহুর্ত এবং তাঁর প্রতিটি সামর্থ্যকে ব্যয় করে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার চেষ্টায়। সেরূপ ভাবনার কারণে খলিফা উমর (রা:) রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমুতে পারতেন না; মাঝ রাতে উঠে আটার বস্তা কাঁধে নিয়ে মহল্লার ক্ষুদার্ত পরিবার খুঁজেছেন। মদিনা থেকে জেরুজালেমের ৫৫০ মাইল যাত্রাপথ অতিক্রম করেছেন একটি মাত্র উঠ এবং একজন মাত্র সহচর নিয়ে। সে দুর্গম পথের অর্ধেকটা পায়ে হেঁটেছেন তাঁর সহচরকে উঠের পিঠে চড়িয়ে। অথচ বাংলাদেশের একজন ইউনিয়ন চেয়ারম্যানও রাস্তায় একাকী হাটে না, আশে পাশে এক পাল সঙ্গী থাকে। অথচ সে সময় তাঁর রাষ্ট্রের আয়োতন ছিল বাংলাদেশের চেয়ে ৭০ গুণের অধিক। একমাত্র আখেরাতের ভয়ই মানুষকে নেক আমলে এতোটা বেপরোয়া ও বিরামহীন করতে পারে। এমন ব্যক্তির প্রতিটি দিন ও প্রতিটি মুহুর্তের সাধনা হয়, মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডার সাথে একাত্ম হওয়ায় এবং সে এজেন্ডাকে বিজয়ী করায়। তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি হয় মহান রবকে খুশি করা এবং তাঁর থেকে মাগফিরাত লাভ করা। এমন ব্যক্তি যখন দেখে তাঁর নিজ দেশে মহান আল্লাহ তায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়া আইন বিলুপ্ত এবং শাসন ক্ষমতায় ইসলাম বিরোধী শক্তি, সে কি তখন নীরব ও নিষ্ক্রিয় দর্শক হয়?
যার সত্যিকার ঈমান আছে সে জানে, জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচা এবং জান্নাত পাওয়ার চেয়ে এ জীবনে অধিক গুরুত্বপূর্ণ কোন এজেন্ডা নাই; কোন গুরুত্বপূর্ণ কর্মও নাই। এমন ঈমানদার ব্যক্তিটি যখন তাঁর জীবনের প্রতিটি মুহুর্ত এরূপ ভয়, এরূপ তাড়না ও এরূপ আল্লাহ সচেতনতা নিয়ে বাঁচে -তাকেই মুত্তাকীন বলা হয়। এমন তাকওয়া সম্পন্ন ঈমানদারদেরকে মহান আল্লাহ তায়ালা শহীদ ও সিদ্দিক রূপে ভূষিত করেছেন। করুণাময় রব’য়ের পক্ষ থেকে এটি এক বিশাল মর্যাদা। এমন মর্যাদাবানদের জন্য রয়েছে জান্নাতের পুরস্কার। তাদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে:
وَٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ بِٱللَّهِ وَرُسُلِهِۦٓ أُو۟لَـٰٓئِكَ هُمُ ٱلصِّدِّيقُونَ ۖ وَٱلشُّهَدَآءُ عِندَ رَبِّهِمْ لَهُمْ أَجْرُهُمْ وَنُورُهُمْ ۖ وَٱلَّذِينَ كَفَرُوا۟ وَكَذَّبُوا۟ بِـَٔايَـٰتِنَآ أُو۟لَـٰٓئِكَ أَصْحَـٰبُ ٱلْجَحِيمِ
অর্থ: “এবং যারা ঈমান এনেছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর, তারাই হলো সিদ্দিক (সদা সত্যবাদী) এবং শহীদ (আল্লাহ ও তাঁর দ্বীনের পক্ষে সাক্ষ্যদাতা); তাদের জন্য তাদের রব’য়ের কাছে রয়েছে পুরস্কার (জান্নাত) ও নূর। এবং যারা অবিশ্বাস করলো এবং মিথ্যা বললো আমার আয়াতকে (নিদর্শনকে), তারাই হলো জাহান্নামে বাসিন্দা।”- (সুরা হাদীদ, আয়াত ১৯)।
পৃথিবী পৃষ্ঠে মোটা দাগে দুই প্রকার মানুষের বসবাস; একটি দল ঈমানদারদের, অপর দলটি কাফিরদের। দুটি পক্ষের মাঝে কাজ করে দুটি ভিন্ন চিন্তার মডেল। একটি মডেল সেক্যুলার চেতনার, অপরটি আখেরাতে জবাবদেহীতা ভয় নিয়ে বাঁচার। বিভাজনটি থাকবে আখেরাতেও। ঈমানদারদের দলটি যাবে জান্নাতে; কাফিরদের দলটি যাবে জাহান্নামে। উপরিউক্ত আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা দুটি পক্ষের ভিন্ন পরিণতির কথা তুলে ধরেছেন। এখানে মহান রব স্পষ্ট ভাবে পথ দেখিয়ে দিয়েছেন। এখানেই ঈমানের পরীক্ষা: কে কোন পথ বেছে নেয় তা নিয়ে। ২৮/০৮/২০২৬