ফিরোজ মাহবুব কামাল
চুক্তিতে যোগ দিলে মারা পড়বে একাত্তরের চেতনা
মক্কা সামরিক চুক্তিতে পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের সাথে বাংলাদেশের যোগদানে বাংলাদেশের কতটুকু লাভ হবে - একাত্তরের চেতনাধারীদের কাছে সেটা কোন বড় কথা নয়, তাদের কাছে সবচেয়ে বড় কথা হলো এর চুক্তিতে যোগ দিলে একাত্তরের চেতনা মাঠে মারা পড়বে। কারণ, পাকিস্তানের নাম শুনলে জাফর ইকবালের মত যেসব একাত্তরের চেতনাধারীদের মুখ ব্রাশ করতে হয়, তাদের দিন রাত মুখ ব্রাশের ব্যস্ততা বেড়ে যাবে। একাত্তরের চেতনার পক্ষ বিপক্ষ নিয়ে বাংলাদেশে বিভাজনের যে রাজনীতি সেটিও বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এতে দাফন হয়ে যাবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ব্যবসা। এজন্যই শুধু ভারত নয়, ভারতসেবী সকল বাঙালি ফ্যাসিস্ট, কম্যুনিস্ট ও সেক্যুলারিস্ট এ চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদানের চরম বিরোধী।
অথচ মক্কা সামরিক চুক্তিতে যোগ দিলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটি এক দারুন পজিটিভ দিক হবে। কারণ, বাংলাদেশের সামরিক কর্তাদের তখন পাকিস্তানী অফিসারদের সাথে ঘন ঘন একসাথে বসতে হবে। বাংলাদেশের মাটিতে তখন পাকিস্তানি সামরিক বিশেষজ্ঞদের আনাগোনা বাড়বে। বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর সদস্যরা তখন উচ্চতর সামরিক প্রশিক্ষণে পাকিস্তানে যাবে। এভাবে সামরিক খ্যাতে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতর হবে। তখন বাংলাদেশে আসবে পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান, মিজাইল, ড্রোন, ট্যাংক ইত্যাদি। এ বিষয়টি ভারতের কাছে যেমন অসহ্য, তেমনি অসহ্য হলো একাত্তরের চেতনাধারীদের কাছে। তাই বাংলাদেশের মক্কা চুক্তিতে যোগ দেয়ার বিরুদ্ধে আওয়ামী বাকশালীদের পক্ষ থেকে ঢাকার রাস্তায় মশাল মিছিল হয়েছে। অনেক ব্লগার এ চুক্তিতে যোগদাদের বিরুদ্ধে ময়দানে নেমেছে। একই সাথে এ চুক্তির বিরুদ্ধে ভারতের মিডিয়া লাগাতর প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে। এমন কি ঢাকাস্থ ভারতীয় দূত বলেছেন, এ চুক্তিতে যোগ দিলে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কে জটিলতা সৃষ্টি হবে। লন্ডনের আওয়ামী লীগের এক নেতা ভারতকে নসিহত করেছে, রাশিয়া যেমন ইউক্রেনের ন্যাটোতে যোগ দেয়া থামাতে আগেই দেশটির উপর হামলা করেছে, ভারতের উচিত বাংলাদেশের উপর সত্বর হামলা করা এবং এ চুক্তি থেকে বাংলাদেশকে দূরে রাখা। বুঝা যায়, এ সামরিক চু্ক্তি হলে তাদের মেরুকরণের রাজনীতি যে বিপদে পড়বে সেটি তারা ঠিকই বুঝতে পেরেছে।
মক্কা চুক্তি বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
মক্কা চুক্তিতে যোগ দেয়া বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ -সে বিষয়টি প্রথমে বুঝতে হবে। বাংলাদেশের নিজের ভৌগলিক অবস্থানটি বিপদ জনক। এমন দেশের স্বাধীনতা বাঁচানো কঠিন। এ কথাটি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান বলতেন। কারণ, বাংলাদেশে হলো মুসলিম বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন এবং তিন দিক দিয়ে ভারত দ্বারা ঘেরাও একটি ক্ষুদ্র দেশ। ইংরেজরাও সেটি বুঝতো। তাদের কাছে বাংলাদেশ মনে হতো, হলো দল ছাড়া এক মহিষ। এটিকে ধরলে পালের অন্য মহিষের সিংয়ের গুতা খাওয়ার ভয় নাই। এমন এক নাজুক অবস্থার জন্যই ইংরেজরা টার্গেট রূপে সর্ব প্রথম বেছে নেয় বাংলাদেশকে। ব্রিটিশ হায়েনাদের হাত থেকে ১৭৫৭ সালে বাংলার স্বাধীনতা তাই বাঁচানো যায়নি। ফলে বাংলাদেশ পরিণত হয় ইংরেজদের প্রথম গোলাম রাষ্ট্রে। একই কারণে ১৯৭১’য়ে পাকিস্তান সরকার পারিনি তার পূর্ব পাকিস্তানকে ভারতের আগ্রাসন থেকে বাঁচাতে। অথচ দীর্ঘকাল বিচ্ছিন্নবাদী যুদ্ধ চললেও দেশ ভাঙার সে সমস্যাটি পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের ক্ষেত্রে ঘটছে না। কারণ বেলুচিস্তান ভৌগলিক ভাবে বিচ্ছিন্ন কোন প্রদেশ নয়; এবং পাশে ভারতের ন্যায় শত্রু দেশ নাই।
ভারত চায় বাংলাদেশ চিরকাল এরূপ বিচ্ছিন্নই থাক; তাতে বাংলাদেশকে কাবু রাখতে ভারতের জন্য সহজ হবে। সহজ বলেই ভারতের নেতারা যখন তখন বাংলাদেশ দখলের হুমকি দেয়। ভারতের এক সামরিক বিশেষজ্ঞ ইতিমধ্যেই বলেছেন, নিরাপত্তার স্বার্থে ভারতের উচিত বাংলাদেশে রংপুর অঞ্চল কিনে নেয়া অথব দখল করে নেয়া। বিজিপি’র বাঙালি নেতা শুভেন্দ্র অধিকারী পুরা বাংলাদেশ দখলে নেয়ার হুমকি দেয়। তাদের কাছে ভারতের সামরিক নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা নয়।
এমন কি হাতিও একাকী দল ছাড়া হলে সে বাঘের দলের হামলা থেকে বাঁচে না। তাই হাতিও জঙ্গলে দল বেঁধে চলে। বিচ্ছিন্নতার জন্য বাংলাদেশের নিরাপত্তার যে বিশাল সংকট, সে সংকট পাকিস্তান, তুরস্ক বা সৌদি আরবে নাই। কারণ তাদের পাশে ভারতের ন্যায় আগ্রাসী ইসরাইল নাই। তাই পাকিস্তান, তুরস্ক বা সৌদি আরবের চেয়ে বাংলাদেশের জন্য মক্কা চুক্তির ন্যায় সামরিক চুক্তির প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি।
স্বাধীনতার জন্য সামরিক চুক্তি নতুন কিছু নয়। পাশে বৃহৎ আগ্রাসী প্রতিবেশি থাকলে স্বাধীনতা বাঁচাতে বন্ধু খুঁজতে হয়, এবং জোট গড়তে হয়। ন্যাটো চুক্তি গড়ে উঠেছে সেরূপ একটি সামরিক প্রয়োজনেই। সে প্রয়োজনটি বাংলাদেশের জনও অতি বিশাল। সেরূপ একটি প্রয়োজনের কথা বিবেচনায় এনেই ১৯৪৭’য়ের প্রজ্ঞাবান বাঙালি মুসলিম নেতারা পাকিস্তানে যোগ দেয়। কিন্তু স্বাধীনতার সে ভাবনা ১৯৭১’য়ের নেতাদের ছিল না। তাদের ছিল কেবল গদি দখলে নেয়ার ক্ষুধা। তাই ভারতের আধিপত্যের কাছে স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে তাজুদ্দীন ৭ দফা চুক্তি করে এবং মুজিব ২৫ সালা চুক্তি করে। ভারত খুশি হবে, বাংলাদেশ যদি মক্কা চুক্তিতে যোগ না দিয়ে মুজিবের ন্যায় ভারেতে সাথে ২৫ সালা চুক্তি করে।
মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের আশু যোগদান কেন জরুরি?
শেরে বাংলা ফজলুল হক একটি কথা বলতেন, কলকাতার হিন্দু বাবুরা যখন বাঙালি মুসলিমদের ব্যাপারে কোন কিছুর বিরোধিতা করে, তখন বুঝতে হবে তাতে বাঙালি মুসলিমের কল্যাণ আছে। তাঁর সে কথাটি আজও একই রূপ সত্য। ১৯৭১’য়ে ভারত পাকিস্তানের বিভক্তি চেয়েছিল। পাকিস্তান ভেঙে যাওয়াতে শুধু পাকিস্তানের ক্ষতি হয়নি, ক্ষতি হয়েছে বাঙালি মুসলিম এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর। অখণ্ড পাকিস্তান বেঁচে থাকলে দেশটি হতো ৪৪ কোটি জনসংখ্যা নিয়ে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম পারমানবিক শক্তি। দেশটি তখন ফিলিস্তিন, কাশ্মীর ও আরাকানের মুসলিমদের পাশে দাঁড়াতে পারতো। দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক রূপে বাঙালি মুসলিমগণ তখন বসতো চালকের আসনে। উল্লেখ্য যে, সে সাথে বাঙালি ফ্যাসিস্ট, সেক্যুলারিস্ট, কম্যুনিস্ট খলিফাদের। পাকিস্তান ভাঙাতে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর কোন কল্যাণ হয়নি। পরিতাপের বিষয় হলো, বহু বাঙালি মুসলিম সে হারাম কর্মটি নিয়ে আজও উৎসব করে। এমন কি অনেক ইসলামপন্থী্রো। এটি তো সে অসভ্য বর্বর বাঙালি চেতনা যা বাংলাদেশের আদালতে শরীয়া আইনকে বিলুপ্ত রেখেছে, শত শত পতিতা পল্লীতে জ্বিনার বাণিজ্য বাঁচিয়ে রেখেছে এবং দেশটিকে দুর্বৃত্তিতে ৫ বার বিশ্বে প্রথম করেছে।
ভারত যার বিরোধীতা করে, বুঝতে হবে তাতে বাঙালি মুসলিমের কল্যাণ আছে। এটা বুঝার জন্য গবেষণার প্রয়োজন নেই। ভারত এবং ভারতসেবী আওয়ামী ফ্যাসিস্টরা যেহেতু মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদানের বিরোধী, তখন বুঝতে হবে এ চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদানে প্রভূত কল্যান রয়েছে। তাই বাংলাদেশের উচিত এ চুক্তিতে শামিল হওয়ার জন্য জোর প্রচেষ্টা চালানো।
তাছাড়া ইসলামে অতি গুরুত্বপূর্ণ হলো মুসলিম উম্মাহর একতা। যেখানে একতা, সেখানেই থাকে মহান আল্লাহর রহমত। কারণ, তিনি বিভক্তিকে হারাম করেছেন এবং একতাকে ফরজ করেছেন। তাই মুসলিমদের মাঝে একতা দেখলে তিনি খুশি হন। এবং তাতে অখুশি হয় শয়তান। কারণ, শয়তান চায় মুসলিমদের মাঝে বিভক্তি। তাই মক্কা চুক্তি থেকে বাংলাদেশ দূরে থাকলে শয়তানের পৌত্তলিক খলিফা ভারত প্রচণ্ড খুশি হবে। খুশি হবে শয়তানের বাংলাদেশী খলিফারাও। এ নিয়ে বিতর্ক নই যে পাকিস্তান, তুরস্ক এবং সৌদি আরবের রাজনীতিতে অনেক সমস্যা আছে। বুঝতে হবে, দুনিয়াতে কোন দেশই ফিরেশতাদের দেশ নয়; তারপরও নানা দেশের মাঝে চুক্তি হয়। ফিরেশতা খুঁজতে গেলে কোন দেশের সাথেই চুক্তি হবে না। তখন বাংলাদেশকে ভারতের ন্যায় আগ্রাসী শত্রু দেশের পেটে যেতে হবে।
বুঝতে হবে, জোট যত খারাপই হোক, তা একাকী বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকার চেয়ে শত গুণ ভাল। এখনো তিন দেশীয় মক্কা জোটের পক্ষ থেকে অফিসিয়াল দাওয়াত মিলেনি। শুধু বাজারে আলাপ চলছে মাত্র। তবে বাংলাদেশের উচিত নিজ গরজে এ জোটে শামিল হওয়ার জন্য জোর তদবির চালানো। বুঝতে হবে, এ জোটের যতটা প্রয়োজন পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি প্রয়োজন বাংলাদেশের। বরং বাংলাদেশেরই উচিত ছিল এমন একটি সামরিক জোট প্রতিষ্ঠার জন্য বহু আগে থেকেই উদ্যোগ নেয়া। এখন অন্যরা যখন এমন একটি জোট প্রতিষ্ঠা দিয়েছে, বাংলাদেশের উচিত, দেরি না করে তা থেকে ফায়দা নেয়া। ০১/০৯/২০২৬