ফিরোজ মাহবুব কামাল
ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ: সিরাতাল মুস্তাকীমের অবিচ্ছেদ্য অংশ
বিচিত্র ভৌগলিক প্রকৃতি এবং বিবিধ জলবায়ু ও আবহাওয়া অতিক্রম করে এগোয় হাজার হাজার মাইলের যাত্রাপথ। সে যাত্রাপথে কোথাও বা নয়নাভিরাম সমতল ভূমি, কোথাও বা দুর্গম পাহাড় পর্বত, কোথাও বা নদী নালা ও মরুভূমি। কোথাও বা উত্তপ্ত লু হাওয়া, আবার কোথাও বা শত শত মাইল রাস্তা বরফে ঢাকা। কাঙ্খিত গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে হলে যাত্রা পথের সবটুকু পাড়ি দিতে হয়। যারা সমতল ভূমির বাইরে যেতে রাজী নয়, এবং যাদের ভয় বরফে ঢাকা পাহাড় পর্বত পাড়ি দেয়া নিয়ে, তাদের পক্ষে গন্তব্যে পৌঁছা স্বপ্নেই থেকে যায়। হাজার মাইলের যাত্রা পথের আধা মাইল পথও যদি বাকি থাকে, তবে গন্তব্যে পৌছা যায় না।
একই রূপ অবস্থা সিরাতাল মুস্তাকীমের। জান্নাতের এ যাত্রা পথটির সবটুকু একই রূপ নয়; আছে বিচিত্র রূপ। এ পথে আছে যেমন কুর’আন পাঠ, নামাজ রোজা, হজ্জ যাকাত ও তাসবিহ তাহলিল আছে, তেমনি আছে দেশ বিদেশের জনপদে দ্বীনের তাবলিগ। আছে বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক যুদ্ধ। আছে দুর্বৃত্তির নির্মূল এবং সুবিচার প্রতিষ্ঠার জিহাদ। আছে জালেম শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই। আছে গৃহ ছেড়ে দূর দেশে হিজরত, আছে সশস্ত্র যুদ্ধ। সে যুদ্ধে আছে অর্থ, শ্রম, মেধা ও রক্তের কুর’বানী। প্রতিষ্ঠা দিতে ইসলামী রাষ্ট্র; সে রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা দিতে হয় মহান রব’য়ের সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়া আইন। বিজয়ী করতে হয় তার ভূ-রাজনৈতিক, বৈচারিক, শিক্ষা সাংস্কৃতিক ও সামাজিক নিরাপত্তার এজেন্ডা।
এরূপ একটি ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ ও তার সংরক্ষণের জিহাদ হলো সিরাতাল মুস্তাকীমের অবিচ্ছেদ্য এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ অংশটুকু অতিক্রম না করলে সিরাতাল মুস্তাকীমে চলার কাজটি হয়না। জান্নাতের গন্তব্যে পৌঁছতে হলে সিরাতাল মুস্তাকীমের প্রতিটি স্তর পাড়ি দেওয়ার জন্য শুধু নিয়ত ও প্রস্তুতি থাকলে চলে না, সে পথে চলার প্রতিটি স্তরে লড়াইয়ে অংশ নিতে হয়। কারণ লড়াই শুরু হয় সিরাতাল মুস্তাকীমে যাত্রা শুরুর সাথে সাথে। এ পথ অর্থ, শ্রম, সময়, মেধা ও রক্তের কুরবানী চায়। নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাগণ সিরাতাল মুস্তাকীমের সবগুলি স্তর সফল ভাবে অতিক্রম করেছিলেন। এ পথে চলতে অর্ধেকের বেশি সাহাবা পথেই শহীদ হয়ে গেছেন।
ব্যর্থতা সিরাতাল মুস্তাকীমের সবটুকু চলায়
সিরাতাল মুস্তাকীমে চলার সার্বক্ষণিক প্রস্তুতিটাই হলো মুমিনের তাকওয়া। যাদের ধর্মকর্ম শুধু কুর’আন তেলাওয়াত, নামাজ রোজা, হজ্জ যাকাতে ও তাসবিহ পাঠে সীমিত, বুঝতে হবে তারা ব্যর্থ হয়েছে সিরাতাল মুস্তাকীমের সবটুকু পাড়ি দিতে। অথচ জান্নাতে পৌছার জন্য অপরিহার্য হলো সবটুকু পথ পাড়ি দেয়া। তবে যদি সিরাতাল মুস্তাকীমে চলার মাঝে কাউকে মহান আল্লাহ তুলে নিলে সেটি ভিন্ন কথা। সে ব্যক্তি জান্নাত পাবে সিরাতাল মুস্তাকীমে চলার ঐকান্তিক নিয়ত, মেহনত ও কুরবানীর কারণে। সাফল্য আসে একমাত্র আল্লাহ তায়ালা থেকে, ফলে সাফল্যের জন্য পুরষ্কার নাই। কিন্তু নিয়েত, মেহনত ও কুরবানী থাকতে হয় বান্দার। সে জন্যই সে পুরষ্কার পায়।
বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশের অধিকাংশ মানুষ সিরাতাল মুস্তাকীমের সবটুকু পাড়ি দিতে রাজী নয়। বিশেষ করে জিহাদের যে অংশটুকুতে রয়েছে জেল-জুলুম ও জান মালের কুরবানী -সে অংশে তারা পা রাখতে রাজী নয়। তাদের আগ্রহ কেবল কুর’আন পাঠ, তাসবিহ পাঠ, নামাজ রোজা ও হজ্জ যাকাত পালন নিয়ে। তাদের উদ্দেশ্যে মহান রব’য়ের বাণী:
أَمْ حَسِبْتُمْ أَن تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَأْتِكُم مَّثَلُ الَّذِينَ خَلَوْا مِن قَبْلِكُم ۖ مَّسَّتْهُمُ الْبَأْسَاءُ وَالضَّرَّاءُ وَزُلْزِلُوا حَتَّىٰ يَقُولَ الرَّسُولُ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ مَتَىٰ نَصْرُ اللَّهِ ۗ أَلَا إِنَّ نَصْرَ اللَّهِ قَرِيبٌ
অর্থ: “তোমাদের কি এই ধারণা, তোমরা জান্নাতে এমনিতেই প্রবেশ করবে, অথচ সে লোকদের অবস্থা অতিক্রম করনি যারা তোমাদের পূর্বে অতীত হয়েছে। তাদের উপর এসেছে বিপদ ও কষ্ট। এবং (প্রাণ ভয়ে) তারা এমন ভাবে শিহরিত হয়েছে যে, এমন কি রাসূল ও তাঁর প্রতি যারা ঈমান এনেছিল তারাও একথা বলেছে যে, কখন আসবে আল্লাহর সাহায্যে! তোমরা শোনে নাও, আল্লাহর সাহায্য একান্তই নিকটবর্তী।”-(সুরা বাকারা, আয়াত ২১৪)।
অনেকেরই ধারণা, নামাজ হলো জান্নাতের চাবী। তারা মনে করে, নিয়মিত নামাজ পালন করলে অবশ্যই জান্নাত মিলবে। ফলে দ্বীন পালনে তারা নামাজের বাইরে যেতে খুব একটা রাজী নয়। বড় জোর মাহে রমজানের রোজা পালন এবং কুর’আন পাঠ ও তাসবিহ পাঠ পর্যন্ত অগ্রসর হয়। সামর্থ্য থাকলে হজ্জ যাকাতও পালন করে। তাদের কাছে ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের জিহাদ, শরিয়ার প্রতিষ্ঠা, অন্যদের কাছে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দেয়া এবং কুর’আনের ভাষা শিক্ষার ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি মনে হয়। এগুলি তাদের কাছে চিত্রিত হয় extremism রূপে। অথচ মহান রব শুধু নামাজ রোজা ও হজ্জ যাকাত ফরজ করেননি; ফরজ করেছেন শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ। যেমন নিচের আয়াতে নির্দেশ এসেছে:
كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِتَالُ وَهُوَ كُرْهٌ لَّكُمْ ۖ وَعَسَىٰ أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ ۖ وَعَسَىٰ أَن تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَّكُمْ ۗ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
অর্থ: “তোমাদের উপর যুদ্ধ ফরজ করা হয়েছে, অথচ তোমাদের কাছে তা অপছন্দনীয়। অথচ তোমাদের কাছে যা অপছন্দের, হয়তো সেটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর। হয়তো তোদের কাছে যা পছন্দের, সেটাই তোমাদের জন্যে অকল্যাণকর। বস্তুত আল্লাহই সব কিছু জানেন, তোমরা জান না।”-(সুরা বাকারা, আয়াত ২১৬)।
নবীজী (সা:)’য়ের ইসলামকে বলা হচেছ চরমপন্থী ইসলাম
ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের যুদ্ধ নিয়ে বাঁচাটি কোন রূপ extremism তথা দ্বীন পালনের চরমপন্থা নয়, বরং এটিই হলো মহান রব’য়ের নির্দেশিত পথে অতি স্বাভাবিক ইসলাম পালন। নবীজী (সা:) নিজে ও তাঁর সাহাবাগণ তো সে ভাবেই দ্বীন পালন করেছেন। যারা সিরাতাল মুস্তাকীমে চলতে চায় তাদের জীবনের যুদ্ধ আসবেই। যে পথে যুদ্ধ নাই -সে পথ অন্য কিছু হতে পারে, কিন্তু কখনোই সেটি সিরাতাল মুস্তাকীম হতে পারে না। সিরাতাল মুস্তাকীমে থাকার কারণে নবীজী (সা:)কে ২৮ যুদ্ধে সশরীরে অংশ নিতে হয়েছে এবং সর্বমোট ৮৩টি যুদ্ধকে পরিচালনা করতে হয়েছে। অথচ আজ যারা আশেকে রাসূল (সা:) এবং বেশি বেশি সূন্নত পালনের কথা বলে -তারা ইসলামপন্থীদের পক্ষে ভোট দিতে রাজী নয়। ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ও শরিয়ার দাবী নিয়ে রাস্তায় নামতে রাজী নয়। বুঝতে হবে, নবীজী (সা:) ও সাহাবায়ে কেরামের আমলে যা নিয়ে ছিল সিরাতাল মুস্তাকীম, আজও তা নিয়েই সিরাতাল মুস্তাকীম। কোন হের ফের নাই। তাই যারা সিরাতাল মুস্তাকীমে তথা জান্নাতের পথে চলতে চায়, তারা কি যুদ্ধের তথা জিহাদের পথ পরিহার করতে পারে? জিহাদ পরিহার করলে সিরাতাল মুস্তাকীমে চলার কাজটি যে হয়না -সে বোধ কি তাদের আছে?
পরিতাপের বিষয় হলো, আজকের মুসলিমগণ সিরাতাল মুস্তাকীম থেকে এতোটাই ছিটকে পড়েছে যে, ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের জিহাদে জান ও মালের কুরবানী পেশ দূরে থাক, নির্বাচনে ইসলামপন্থীদের ভোট দিতেও তারা রাজী নয়। তারা ভোট দেয় এমন ফ্যাসিস্ট ও সেক্যুলারিস্টদের, যাদের রাজনীতির মূল এজেন্ডা হলো মহান রব’য়ের সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়ার প্রতিষ্ঠাকে প্রতিরোধ করা। এমন নামাজীদের ধর্ম পালনে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কোন জিহাদ নাই। অথচ এরাই নামাজের প্রতি রাকাতে “ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকীম” বলে। নামাজে দাঁড়িয়ে সিরাতাল মুস্তাকীমের দোয়া করলেই কি সিরাতাল মুস্তাকীম চলা যায়? সে পথে চলার নিয়ত, তাড়না এবং কুরবানীও থাকতে হয়। নইলে “ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকীম” বলার সাথে ভণ্ডামী ও বেঈমানী হয়। সিরাতাল মুস্তাকীমে চলার সে নিয়ত, সে তাড়না ও সে কুরবানী না থাকাতে নবীজী (সা:) যে জান্নাতের পথে ছিলেন, সে পথে আজকের মুসলিমগণ নাই। নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাদের পথটি ছিল বিশুদ্ধ সিরাতাল মুস্তাকীমের। আজকের মুসলিমদের চলার পথটিও সেরূপ হলে আজও নির্মিত হতো ইসলামী রাষ্ট্র। প্রতিষ্ঠা পেত মহান রব’য়ের সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়া। এবং প্রতিষ্ঠা পেত মুসলিম ঐক্য। আর তাতে মুসলিম উম্মাহর উত্থান হতো বিশ্বশক্তি রূপে।