এম এ মান্নান, ভোলা: ভোলা জেলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার উত্তর পাঠামারী গ্রামের শান্ত পরিবেশে বসবাস করেন ৪৩ বছর বয়সী বিউটি বেগম। বাইর থেকে সাধারণ গ্রামীণ জীবনের মতো মনে হলেও, এই জীবনের আড়ালে লুকিয়ে ছিল তার দীর্ঘ ১৫ বছরের অসহনীয় কষ্ট, লজ্জা ও নীরব বেদনার গল্প। অবশেষে চিকিৎসা সহায়তা পেয়ে তিনি ফিরে পেয়েছেন স্বাভাবিক জীবন, যা এখন এলাকাবাসীর কাছে এক অনুপ্রেরণার উদাহরণ।
বুধবার (১২ মার্চ) এক সাক্ষাৎকারে উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম জানান, প্রসবজনিত ফিস্টুলায় দীর্ঘদিন ভোগার পর সুস্থ হয়ে ওঠা বিউটি বেগমের ঘটনা সমাজে সচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি বলেন, প্রায় ১৫ বছর ধরে প্রসূতি ফিস্টুলার কষ্ট নিয়ে জীবন কাটাচ্ছিলেন বিউটি বেগম। তবে ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে বোরহানউদ্দিন উপজেলায় এক মাসব্যাপী প্রসূতি ফিস্টুলা শনাক্তকরণ ক্যাম্পেইন শুরু হলে তার জীবনে পরিবর্তনের সূচনা ঘটে।
২২ নভেম্বর এক স্বাস্থ্য সহকারী তার সমস্যার কথা জানতে পেরে তাকে সম্ভাব্য ফিস্টুলা রোগী হিসেবে শনাক্ত করেন।
পরবর্তীতে CIPRB এবং UNFPA (United Nations Population Fund)-এর সহযোগিতায় তাকে ভোলা জেলা হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে গাইনি বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিশ্চিত করেন যে তিনি প্রসবজনিত ফিস্টুলায় আক্রান্ত। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকার ন্যাশনাল ফিস্টুলা সেন্টার-এ পাঠানো হয়, যেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে সফল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। দীর্ঘদিনের কষ্টের অবসান ঘটে এবং ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে তিনি বাড়িতে ফিরে আসেন।
বিউটি বেগম জানান, প্রায় ১৫ বছর আগে চতুর্থ সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে তার জীবনে এই দুর্ভাগ্য নেমে আসে। দীর্ঘ সময় ধরে বাধাগ্রস্ত প্রসব, অদক্ষ ধাত্রীর ভুল ব্যবস্থাপনা এবং সময়মতো হাসপাতালে না নেওয়ার কারণে তিনি একটি মৃত সন্তান প্রসব করেন। এরপর থেকেই ধীরে ধীরে তার শারীরিক সমস্যা শুরু হয়।
বিউটি বেগম আরো বলেন, লজ্জা, দারিদ্র্য ও অজ্ঞতার কারণে দীর্ঘদিন কাউকে কিছু বলতে পারেননি। কাপড় ভিজে যাওয়া, মানুষের সামনে যেতে সংকোচ, আত্মীয়-স্বজনের অনুষ্ঠান এড়িয়ে চলা—সব মিলিয়ে জীবন হয়ে ওঠে অসহনীয়। অনেক সময় তিনি ঘরের এক কোণে বসে নীরবে কান্না করতেন।
আবেগঘন কণ্ঠে বিউটি বেগম বলেন, “আমি ভাবতেও পারিনি আবার স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে পারবো। যারা আমাকে খুঁজে বের করেছেন, চিকিৎসা করিয়েছেন—সবার প্রতি আমি চিরকৃতজ্ঞ।”
বর্তমানে তিনি স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করছেন। পরিবারের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলা, মানুষের সঙ্গে মিশে চলা—সবকিছুই তার কাছে নতুন করে পাওয়া জীবনের আনন্দ।
পুনর্বাসনের অংশ হিসেবে উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা বিউটি বেগমের হাতে একটি ছাগল তুলে দেন। এই সহায়তা পেয়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।