আলহাজ্ব মোঃ শাহ আলম (দান্নু): সে জন্মের পর থেকেই তার বাবাকে দেখতে পায়নি। শুধু বাবার কথা মনে করে মাকে এটা-ওটা জিজ্ঞেস করেÑ"বাবা কোথায়? কোথায় গিয়েছে? কৈ, এখনো তো আসে নাই!" দু-একটা কথা কেবল বলতে শিখেছে মাত্র। বাবাকে দেখার আকাক্সক্ষা আর অবুঝ হৃদয়ের অনেক অনুভূতি মুখে মুখে তার কণ্ঠে ফুটে উঠেছে। জানার ও শেখার আবেগ বেড়েছে রেখার; তার যেন কী একটা জিনিস হারিয়ে গিয়েছে! মনের গহীনে ও চোখের কোণের নীরব চাহনিতে ফুটে ওঠে সেই হারিয়ে ফেলার ব্যাকুলতা। সবাই রেখার দিকে করুণ চোখে তাকিয়ে থাকে। মা শুধু রেখার নিষ্পাপ অবয়বের দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন; মেয়ের ছোটখাটো কোনো কথারই জবাব তিনি দিতে পারেন না। প্রায় সময়ই বাবার কথা বলতে বলতে রেখা গভীর আগ্রহে মায়ের মুখের দিকে চেয়ে থাকে। তার বয়স একেবারেই কম, এই তিন থেকে চার বছরে পা দিয়েছে মাত্র। বিদেশ থেকে বাবার পাঠানো জামাকাপড়, কসমেটিকস আর খেলনাপত্র বারবার দেখার জন্য সে মাকে বায়না ধরে। সে বলে, "মা, আমার বাবার দেওয়া খেলনাগুলো দাও। বাবার জামাটা অনেক সুন্দর, ওটা দাও আমি পরব।" মা সময়মতো না দিলে সে তার দাদীকে ‘দাদা’ ‘দাদা’ বলে ডাকে। সে বলে, "দাদা, আমার বাবার জামাটা মা দিচ্ছে না। আমার বাবার সুন্দর জামাটা আমাকে দাও, আমি পরব। আমি জামা পরে খেলনা দিয়ে খেলা করব।"
রেখার এসব আচরণে দাদীর মনে অনেক ব্যথা লাগে। প্রথম পুত্রের সন্তান আজ বাবাহারা! দাদী নীরবে এদিক-সেদিক নাতনির মনের অবস্থা দেখেন, আর আলমারিতে রাখা ছেলের পাঠানো বিদেশী জামাকাপড়ের দিকে তাকিয়ে আড়ালে কেঁদে বেড়ান। আর রেখার মা তীব্র জীবন-ব্যথায় স্তব্ধ, নির্বাক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন।
দাদী মনের সব দুঃখ চেপে পুত্রবধূকে বলেন, "মা, দাও, সেগুলো এনে দাও। ও এগুলো পরে মনের সুখে বাড়িতে খেলাধুলা করুক, ওর মনটা ভালো লাগবে।" দাদী বোঝেন, বাবার কথা মনে হলেই রেখা এমন করে। তিনি পুত্রবধূকে বললেন, "সে যখনই যা চায়, তা-ই দিও।" মা তখন আলমারি খুলে সুটকেস থেকে সেই সুন্দর জামা ও দামী খেলনাটি মেয়ের হাতে তুলে দেন। সুন্দর জামাটির দিকে রেখা অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে, আর প্রিয় খেলনাটি সবাইকে দেখিয়ে খুশি মনে খেলতে থাকে। খেলা শেষে মাকে বলে, "মামণি, আমায় কোলে করে বাইরে নিয়ে যাও, আমার বাবা আসবে, আমাকে দেখবে।" মা শুনেও না শোনার মতো করে থাকলেও, রেখা দাদীকে ধরে বলে, "দাদা, আমাকে কোলে করে বাইরে নিয়ে যাও। আমি বাবার কাছে যাব, ফুলগাছ দেখব। আমি আমার বাবার ছবি দেখব, আমাকে দেখাও।" এমন সব অবুঝ প্রলাপ করতেই থাকে রেখা।
রেখা যখন মায়ের গর্ভে, তখন তার বাবা সুদূর দুবাই শহরে ছিলেন। ব্যবসার পাশাপাশি অতিরিক্ত মুনাফার আশায় তিনি বেসরকারি গাড়ি চালকের কাজ করতেন। কীভাবে অতিরিক্ত টাকা উপার্জন করা যায় এবং দ্রুত বেশি অর্থ রোজগার করে দেশের বাড়িতে এসে বিল্ডিং ও জমিজমা কিনে প্রতিপত্তি করা যায়Ñসেই চেষ্টাই চালাচ্ছিলেন তিনি। রেখার বাবা দেশের বাড়িতে এসে তার ছোট দুই ভাইকেও দুবাই শহরে নিয়ে যান। রেখার বাবার নাম ছিল রুবেল।
দুই-তিন বছর কঠোর পরিশ্রম করে টাকা রোজগার করার পর রুবেল দেশের বাড়িতে আসেন এবং মা ও পরিবারের ইচ্ছানুযায়ী বিয়ে করতে রাজি হন। আত্মীয়-স্বজনেরা ভালো পরিবার দেখে ঢাকা শহরের এক আত্মীয়ের বাসায় বিয়ের সম্বন্ধ ঠিক করলেন। বিয়েতে চাচা ও মামারা সবাই উপস্থিত ছিলেন। কসবায় এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে অনেক ধুমধামের মধ্য দিয়ে বিয়ের কাজ সম্পন্ন হলো। বিয়ের পর চার-পাঁচ মাস নতুন সংসার নিয়ে রুবেল দেশের বাড়িতে অনেক আনন্দে ও উৎসবে সময় কাটালেন। গ্রামের পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন সবার সাথে রুবেল অত্যন্ত স্নেহ, মমতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ বজায় রেখে চলতেন। অতি অল্প সময়েই রুবেল গ্রামে ও আত্মীয় মহলে বেশ সুনাম অর্জন করলেন। যেকোনো উপকারে নিজের এবং পরিবারের পক্ষ থেকে সে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিত। অতিথিদের আপ্যায়ন করা, মানুষকে সহজে আপন করে নেওয়াÑচাচা-চাচি, মামা-মামী সবার জন্য রুবেলের প্রাণভরা আন্তরিকতা ও স্নেহ-মমতায় সকলেই খুশি ছিলেন।
রুবেল বড় ছেলে হিসেবে অনেক দায়িত্ব নিয়ে সংসার আগলে রেখেছিলেন। তার বাবা মারা যাওয়ার পর একমাত্র রুবেলের কষ্টার্জিত পরিশ্রমেই তার মায়ের সংসারটি প্রতিষ্ঠিত হয়। বিদেশে যাওয়ার পূর্বেও রুবেল বেসরকারি চাকরির পাশাপাশি মামা ও বিশেষ আত্মীয়দের সহায়তায় বহু কষ্টে টাকা উপার্জন করে মায়ের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। বিদেশে যাওয়ার পর অন্য ভাইদের সহায়তায় দেশে জমিজমা কেনেন এবং গ্রামের বাড়িতে আলাদা জায়গা কিনে বিল্ডিং তৈরি করেন। এভাবে ভাইবোনদের আর্থিক উন্নতির জন্য তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করতেন। কীভাবে সমাজে সুনাম অর্জন করে জীবনসংগ্রামে প্রতিষ্ঠিত হওয়া যায়, সেই চেষ্টাই ছিল তার। সে কারণেই নিজে দুবাই গিয়ে পরবর্তীতে অন্য দুই ভাইকেও সেখানে নিয়ে যান।
বিয়ের পর কয়েক মাস নতুন দাম্পত্য জীবন কাটিয়ে রুবেল পুনরায় দুবাই শহরে ফিরে গেলেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই শহরের আবহাওয়া ও জীবনযাত্রার কারণে রুবেলের শারীরিক গঠন অস্বাভাবিক রকম ভারী ও মোটা হয়ে যায়। সেই ভারী শরীর নিয়েই বাড়তি উপার্জনের তাগিদে তিনি নিজের কেনা গাড়ি চালাতেন। অসুস্থতা ও ক্লান্ত শরীর নিয়েই দিন-রাত শুধু টাকা উপার্জনের ভাবনা মনে রেখে তিনি গাড়ি চালাতেন।
"ভাইবোন আত্মীয়-স্বজন সবার কাছে প্রিয়,
শুধু কি চাই, কখন চাই, কবে পাঠাতে হবে বলোÑ
সেই পণ-প্রতিজ্ঞা নিয়ে আমি শুধু বেঁচে আছি,
সবারই আশা-আকাক্সক্ষা মিটিয়ে দেবো শেষে।"
"অতীত জীবনের দুঃখ-কষ্ট যত,
ভুলে যাইনি তা অবিরত,
শুধু স্বপ্ন মোর সদা আমি প্রতিষ্ঠিত হবো,
সবাইকে নিয়ে বেঁচে থাকবো।"
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই শহরে একদিন সকালবেলা রুবেল তার দুই ভাইকে বলে নিজের গাড়ি নিয়ে ভাড়ার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লেন। গাড়ি চালাতে চালাতে একপর্যায়ে অসুস্থ রুবেল চলন্ত অবস্থায় ঘুমে চোখ বুজে ফেললে গাড়িটি রাস্তার পাশে সজোরে ধাক্কা খায় এবং দুর্ঘটনার মাঝেই রুবেল স্ট্রোক করেন। হাসপাতালে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক রুবেলকে মৃত ঘোষণা করেন। দুবাইয়ের কর্মস্থলে নেমে এলো গভীর শোকের ছায়া। ভাই ও বন্ধুদের সহায়তায় দেশে আনা হলো রুবেলের কফিন। মৃত ছেলের কফিন দেখে শোকাহত মা মাইমুনা বেগমের চোখের পানিতে নয়নের এক অংশ অকেজো হয়ে গেল। মা শুধু ভাবেনÑ"আমার রুবেল কোথায়? কী হয়েছিল তার? কেন রুবেলের এই পরিণতি?" এই ভাবনা আর আহাজারি আজ অব্দি মা মাইমুনা বেগমের দিন-রাত্রির সঙ্গী। নতুন বাড়ির গাছপালা, আঙিনা, বিশাল ইমারত, ফুল-ফলের বাগানÑসবকিছুই রুবেলের হাতের স্মৃতি। আজ তার কথা স্মরণ করে সবাই অবিরত চোখের পানিতে ভাসছে।
"আশা-নিরাশার জীবন-মরণ ভেবে,
নিজেকে গড়তে হবে শুধু পণ শয়নে-স্বপ্নে,
প্রতিজ্ঞা করে সেই মনে চলেছিলেন বিদেশ প্রাণে,
শুধু একটি আশাÑবড় হবো বলে।
তাই জীবন-মরণে কষ্ট ও সাধনে,
প্রতিষ্ঠিত হবে শুধু সেই আশাÑ
সকলের কাছেই প্রিয় ছিল সে,
এত তাড়াতাড়ি জীবন ছেড়ে পরকালে
কেন যাবে সে, তা কে জানে!"
দিন যাচ্ছে, সময় যাচ্ছে, কিন্তু রুবেলের প্রথম জীবনের সব স্মৃতি, তার চালচলন, কথাবার্তা এবং সহজে মানুষের সাথে মিশে যাওয়ার গুণগুলো মায়ের মনে বারবার দোলা দেয়। মা ডাকেন, "বাবা রুবেল, তুমি কোথায় গেলে? আর কি তুমি ফিরে আসবে না?" বাড়ির আঙিনায় গাছপালা দেখে আর এদিক-সেদিক হেঁটে হেঁটে চোখের পানি ফেলতে থাকেনÑ"হায়রে বাবা, তুমি কোথায় চলে গেলে!" ছেলের কথা মনে করে খাওয়া-দাওয়া প্রায় বন্ধ করে একা পাগলের মতো বসে থাকেন মা। বাড়ির গাছের ফল পেড়ে অন্যকে দিয়ে বলেন, "আমার রুবেলের হাতে লাগানো গাছের ফল এগুলো, আমার এই ফুল-ফলের আর কী দাম!"
গ্রামের বাড়িতে রুবেলের মৃত্যুর পর এক দোয়া মাহফিলে বড় খাবারের আয়োজন করা হয়। খাবারের টেবিলের চারপাশের দৃশ্য ও মেহমানদের খাওয়া দেখে রেখা গভীর মনে নীরব হয়ে সবার দিকে তাকিয়ে থাকে। বাবার কথা মনে হলেই সে মায়ের কোল থেকে দাদীর কোলে, আবার কখনো চাচা কিংবা ফুফুদের কোলে গিয়ে আশ্রয় নেয়। বাবার অভাব খুব বেশি অনুভূত হলে কেঁদে কেঁদে বলে, "দাদা, আমার বাবাকে নিয়ে এসো, আমার কিছুই ভালো লাগে না।" কখনো ঘরের খাটে গিয়ে একাকী ঘুমিয়ে পড়ে। রেখার মনের এই নীরব আকুতি তার মা বুঝলেও, শিশুটি আসলে কী বলতে চায়, তা যেন পুরোপুরি প্রকাশ করতে পারে না।
রেখা এখন বড় হয়ে বুঝতে পেরেছে যে, তার বাবার মৃত্যু উপলক্ষেই এই দোয়ার আয়োজন। রেখার চেহারা অবিকল তার বাবার মতো। তাই রেখার দিকেই সবার দৃষ্টি। রেখার মাকে মাঝে মাঝে দেখা যায় নীরব মনে চুপচাপ একই স্থানে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকতে। মায়ের কোল ঘেঁষে ক্লান্ত শিশু রেখা কখনো নিজে নিজেই বিছানায় গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুম ভাঙলে হঠাৎ অন্য এক করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। ঘুমের ঘোরেও রেখা তার বাবার দেওয়া সুন্দর খেলনাটি সাথে রাখে; এই খেলনাটি কেউ নিতে চাইলে সে কাউকে দেয় না, এটা যেন তার জীবনের অমূল্য এক বস্তু।
এদিকে অনেকেই রেখার মাকে এই বাড়িতে পুনরায় পুত্রবধূ হিসেবে রেখে দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু রেখার মা তাতে রাজি হননি। দাদী রেখাকে মনে-প্রাণে ভালোবাসেন, চাচা-ফুফুরাও তাকে চোখে চোখে রাখেন। মাঝে মাঝে রেখার মা তার বাবার বাড়িতে বেড়াতে যান। রেখার নানার বাড়ির লোকজন তার মাকে অন্য জায়গায় বিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। দাদী রেখাকে নিজের কাছেই রাখতে চান, কিন্তু মা যখন বাবার বাড়ি চলে যান, তখন রেখাকে সাথে করেই নিয়ে যান; তাকে ফেলে যেতে চান না। এভাবে কয়েক মাস কেটে গেল। রেখা কিছুদিন দাদীর কাছে এসে থাকে, আবার মায়ের কথা মনে হলে মাকে ফোন করে, দু-একদিন থেকে আবার মায়ের সাথে নানার বাড়ি চলে যায়। রেখার মা তার বাবার বাড়ির পাশে কসবা থানার একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি নেন। রেখার নিয়মিত পড়াশোনার জন্য দাদী গ্রামের বাড়ি থেকে মাসে মাসে টাকা পাঠান। চাচাদের কথাÑভাইয়ের মেয়ের কোনো অভাব তারা রাখবেন না। রেখার দুই চাচা দুবাই থেকে তার জন্য সুন্দর সুন্দর জামাকাপড় ও টাকা-পয়সা পাঠিয়ে তাকে আনন্দে রাখতে কখনো ভুলতেন না। ২০১৩ সালে রেখার দুই চাচা দুবাই থেকে ছুটিতে দেশে আসলে রেখা তার চাচাদের বলে, "চাচা, তোমরা তো এসেছো, আমার পচা বাবাটা কেন আসলো না?" রেখার এই অবুঝ প্রশ্ন শুনে চাচারা স্তব্ধ হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকেন।
"এক নিষ্পাপ সেই অবুঝ মনে,
তাকিয়ে থাকে তার চাচাদের মুখপানে,
কী জানি বলবে রেখা নিমিষে তাকিয়েÑ
বলে ওঠে হঠাৎ ঘরের আঙিনায় গিয়ে,
ফিরিয়ে নিয়ে এসো গিয়ে মোর পিতাকে।"
শত কথা আর আলোচনার মাঝেও রেখার দৃষ্টি স্থির থাকে না। একাকী মনের ভেতর সে যেন সবসময় কিছু একটা খুঁজে বেড়ায়। এভাবে দিন, মাস, বছর পার হতে লাগলো। রেখা এখন প্রাথমিক বিদ্যালয় শেষ করে উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। মামার বাড়ি থেকে মাঝে মাঝে সে দাদীকে দেখতে আসে। দাদীও চাচাদের পাঠানো টাকা-পয়সা রেখাকে বুঝিয়ে দেন। রুবেল দুবাই থাকা অবস্থায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নিজের নামে একটি আবাসিক জমি ক্রয় করেছিলেন। রেখা সেই বাবার রেখে যাওয়া জমি ভোগ করবে, এতে তার চাচাদেরও কোনো আপত্তি নেই। যেহেতু তার বাবা এই জমি রেখে গেছেন, তাই সেখানে বসবাস করা এবং তা ভোগ করা রেখার আইনগত ও ন্যায়সঙ্গত অধিকার।
কয়েক মাস পর রেখার মাকে অন্যত্র বিয়ে দেওয়ার সব কথাবার্তা সম্পন্ন হলো। রেখার মা নতুন স্বামীর বাড়ি চলে গেলেন। মা অন্য ঘরে চলে যাওয়ায় রেখা এখন নানী ও খালাদের সাথে থাকে। কোনো কোনো সময় নানার বাড়ি ছেড়ে তার দাদার বাড়ি আসতে মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। দাদী মনে-প্রাণে রেখাকে ভালোবাসেন এবং সব সময়ের জন্য তাকে কাছে পেতে চান। তবে দাদী রেখার মনের গভীরের ইচ্ছাকেই প্রাধান্য দেন; সে যেখানে থাকতে চায়, সেখানেই থাকবে। রেখা যেখানেই থাকুক না কেন, তার কোনো অভাব বা অবহেলা নেই। মা অন্যত্র চলে গেলেও বাবার কেনা সেই বাসস্থানটি রেখারই হবে, সেখানেই রেখার স্থায়ী পরিচয়। চাচাদেরও এতে কোনো দ্বিমত নেইÑরেখা তার বাবার ভিটাতেই মাথা গোঁজার ঠাঁই পাবে।
রেখার সবচেয়ে বড় দুঃখÑজীবনে সে কোনোদিন বাবার মুখ দেখেনি, ‘বাবা’ বলে একটি দিনও ডাকতে পারেনি। ‘বাবা’ ডাকার সেই মধুর অনুভূতি আর আদরের ছোঁয়া রেখার জীবনে সারাজীবনের জন্য শূন্য রয়ে গেল। মা থেকেও আজ অন্য ঘরের স্ত্রী, তাই মাকে সে সার্বক্ষণিক কাছে পায় না। রেখা মনে মনে ভাবেÑএই দুনিয়াতে মায়ার জালে, হাসি-কান্নায় বেঁচে থাকার একমাত্র পরম ছায়া হলো জন্মদাতা পিতা। রেখার কাছে আজ মনে হয় পৃথিবীতে বাবাই শ্রেষ্ঠ। পিতা নেই তো ছায়া নেই; বাস্তবতার কঠিন আলো-ছায়ায় জন্মদাতার ভালোবাসার কোনো তুলনা হয় নাÑএটাই রেখার জীবনে এক চরম সত্য হয়ে প্রমাণিত হচ্ছে।
রেখা এখন বড়ই এতিম। উচ্চ বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে সে এখন কলেজে অধ্যয়ন করছে। জীবনের বাস্তব ইতিহাস সে এখন মনে-প্রাণে উপলব্ধি করতে পারছে। তার মা বেঁচে থাকলেও অন্যের অধীনে চলে গেছেন; তাই ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও রেখার জন্য কিছুই করতে পারছেন না। শিক্ষা শেষে পরবর্তী জীবন কীভাবে সাজাবেÑএটাই এখন রেখার প্রতিদিনের দুঃশ্চিন্তা। কে তার জীবনের দায়িত্ব নিয়ে দিনগুলোকে সঠিকভাবে পরিচালিত করবে, এই ভাবনায় সে প্রতিনিয়ত ব্যাকুল থাকে।
নাড়ির টানে মায়ের খোঁজে হয়তো নানাবাড়ি, কিংবা খালা-মামাদের আশ্রয়ে তার দিন কেটে যাচ্ছে ঠিকই; কিন্তু তার আসল স্থায়ী ঠিকানা কোথায়? বিয়ের পর তার পরবর্তী জীবন কোথা থেকে পরিচালিত হবেÑসেটাই রেখার মনের সবচেয়ে বড় জিজ্ঞাসা। নিয়তির একি নিষ্ঠুর খেলা! রেখা মা-বাবা থেকেও আজ এতিমের মতো নিজের স্থায়ী ঠিকানা খুঁজে বেড়াচ্ছে।
মোদ্দা কথা, নিজের ইচ্ছানুযায়ী ভবিষ্যৎ জীবনে সুখ ও শান্তি পাওয়ার জন্য রেখাকে নিজস্ব মতামতের ভিত্তিতেই পথ বেছে নিতে হবে। যেখানে তার জীবনের প্রকৃত শান্তি আসবে, তাকে সেখানেই থিতু হতে হবে। আমরা আশা করি, রেখা যেন তার সঠিক বুদ্ধি ও বিবেক খাটিয়ে নিজেকে পরিচালিত করতে পারে। সৃষ্টির্কতা এই অভিভাবকহীন মেয়েটিকে সঠিক পথ দেখান এবং তার পরবর্তী জীবনকে শান্তিময় করে তুলুনÑএটাই সবার প্রার্থনা। তার আসল শিকড়ের মূল তো তার দাদার বাড়ি, যেখানে তার বাবার জন্ম হয়েছিল। সেখান থেকেই একদিন গড়ে উঠবে তার পরবর্তী জীবনের নতুন পরিচয়। হয়তো একদিন রেখার জীবনেও অধরা সুখ নেমে আসবে এবং তার এই অভিভাবকহীন, ছায়াহীন পথচলার গল্পের সমাপ্তি ঘটবে।
"একাকী বসে নীরব মনে ভাবে রেখা,
জীবন মোর প্রবাহিত এঁকেবেঁকে একা।
জন্ম থেকে মাতার কোলে দেখিনি পিতাকে,
এই কি ছিল মোর আশীর্বাদ নিয়তির লেখা?
এমনি করে চলে অবিরত প্রতিদিন বেলা,
কে করবে আদর আর? মা-ও তো একেলা।
যার কেহ নেই অভাব সেই বোঝে মনে,
সবাই বলে তুমি আমারÑক্ষণিকের ক্ষণে।
বাস্তবে দেখি সবাই যার যার একা,
শুধু জীবন আমার ছায়াহীন পথ চলা।"
সাবেক- দ্বিতীয় সচিব (প্রশাসন)
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, ঢাকা।