• ঢাকা |

সার্বভৌমত্ব ও আপসহীন রাজনীতির আলোকবর্তিকা: শফিউল আলম প্রধান


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ২৪ মে, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

লায়ন উমার রাযী: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যে কজন ব্যক্তিত্ব নিজেদের আদর্শ, ত্যাগ এবং আপসহীন সংগ্রামের মাধ্যমে ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন, শফিউল আলম প্রধান তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি কেবল একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাতা বা জোটের রূপকার ছিলেন না; বরং বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বাংলাদেশের ভূ-রাজনীতি, আধিপত্যবাদবিরোধী আন্দোলন এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াইয়ে এক অবিকল্প কণ্ঠস্বর ছিলেন। ২১শে মে এই অগ্নিপুরুষের ৯ম মৃত্যুবার্ষিকী। এই বিশেষ দিনে তাঁর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন, আদর্শিক সংগ্রাম এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর অবদান নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন জরুরি।

ছাত্ররাজনীতি ও গণঅভ্যুত্থানের অগ্রনায়কঃ
শফিউল আলম প্রধানের রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ঘটেছিল ছাত্ররাজনীতির সোনালী অধ্যায়ে। তিনি ছিলেন তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম (এসএম) হলের নির্বাচিত ভিপি এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক। ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে তিনি রাজপথে সম্মুখসারির যোদ্ধা হিসেবে নেতৃত্ব দেন। তাঁর বজ্রকণ্ঠ এবং সাংগঠনিক দক্ষতা তৎকালীন ছাত্রসমাজকে আইয়ুব-বিরোধী আন্দোলনে ব্যাপকভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

১৯৭১-এর স্বাধীনতা সংগ্রাম ও প্রথম পতাকা উত্তোলনঃ
মহান মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি নির্মাণ এবং সরাসরি স্বাধিকার আন্দোলনে শফিউল আলম প্রধানের অবদান চিরস্মরণীয়। ১৯৭১ সালের ২৩শে মার্চ, যখন পুরো দেশ পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে উত্তাল, তখন তিনি তৎকালীন পরাধীন বাংলায় দিনাজপুরে প্রথম স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করে এক ঐতিহাসিক সাহসী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। পরবর্তীতে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।

দুর্নীতি ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে আপসহীন কণ্ঠস্বরঃ
স্বাধীনতার পর শফিউল আলম প্রধানের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। ১৯৭৪ সালের ৩০শে মার্চ তৎকালীন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক থাকাকালীন তিনি নিজ দলের ভেতরে থাকা দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন এবং এক ঐতিহাসিক শ্বেতপত্র প্রকাশ করেন। এটি ছিল ক্ষমতার মোহ কাটিয়ে দেশপ্রেমের এক বিরল দৃষ্টান্ত। ফলশ্রুতিতে তাঁকে তীব্র রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হতে হয়। তৎকালীন বাকশালী কায়দায় তাঁকে দীর্ঘ সময় বন্দি রাখা হয়। রাজনৈতিক জীবনে প্রায় ২৭ বছর কারাবরণের এক দীর্ঘ ও পরাধীন অধ্যায় পার করতে হয়েছে এই জননেতাকে। তবে কোনো কারাগারের প্রকোষ্ঠ বা নির্যাতন তাঁর আদর্শকে দমাতে পারেনি। ১৯৭৮ সালে কারামুক্তির পর তিনি নতুন উদ্যমে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

‘জাগপা’ প্রতিষ্ঠা এবং জোটের রাজনীতিঃ
১৯৮০ সালের ৬ই এপ্রিল ঢাকার রমনা গ্রিন চত্বরে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা)’। জাগপা প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্যই ছিল- বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ, ইসলামি মূল্যবোধ, এবং বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলা। নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য। পরবর্তীতে বাংলাদেশের বহুদলীয় গণতন্ত্র রক্ষা এবং জনগণের ভোটাধিকার আদায়ের আন্দোলনে তিনি জাতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভে পরিণত হন। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত ‘২০ দলীয় জোট’ গঠনে এবং এর রূপকার হিসেবে তাঁর দূরদর্শী রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আজও প্রশংসিত।

‘জীবন অথবা মৃত্যু’: এক আপসহীন স্লোগানের দর্শনঃ
শফিউল আলম প্রধানের রাজনৈতিক জীবনের মূল চালিকাশক্তি ও সংগ্রামী দর্শনের প্রতিফলন ঘটেছিল তাঁর একটি কালজয়ী স্লোগানে- "বিজয়ের পথে যাত্রা শুরু, জীবন অথবা মৃত্যু"। এটি কেবল কোনো রাজনৈতিক দেওয়াল লিখন বা জনসভার চটকদার স্লোগান ছিল না; এটি ছিল দেশের মানচিত্র ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তাঁর আমৃত্যু লড়াইয়ের শপথ। তিনি বিশ্বাস করতেন, দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে মৃত্যুর ভয়কে জয় করতে হবে। ক্ষমতার লোভ, প্রলোভন, কিংবা বুলেটের ভয়- কোনো কিছুই তাঁকে এই আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। রাজপথে শোষণের বিরুদ্ধে আপসহীন হুঙ্কার দেওয়ার যে সাহস তিনি দেখিয়েছেন, এই স্লোগানটি তারই এক জীবন্ত দলিল।

জাতীয় রাজনীতিতে শফিউল আলম প্রধানের প্রাসঙ্গিকতাঃ
শফিউল আলম প্রধান জীবদ্দশায় যে কয়েকটি বিষয়ে কখনো আপস করেননি, তার মধ্যে অন্যতম হলো বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত সুরক্ষা। দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ও বেরুবাড়ী লংমার্চ, ফারাক্কা ও টিপাইমুখ বাঁধবিরোধী আন্দোলন, ফেলানী হত্যার প্রতিবাদ এবং ভারতীয় অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে তাঁর সোচ্চার অবস্থান তাঁকে "আধিপত্যবাদবিরোধী আন্দোলনের অগ্নিপুরুষ" হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের মূল কথাই ছিল- দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করা যাবে না, দেশের মানুষের অধিকার আদায়ে অবিচল সৈনিক হয়ে লড়ে যেতে হবে।

উপসংহারঃ
আজকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায়, যেখানে দেশপ্রেম, নৈতিকতা ও আপসহীন নেতৃত্বের তীব্র সংকট দৃশ্যমান, সেখানে শফিউল আলম প্রধানের মতো দূরদর্শী নেতার আদর্শ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। তিনি রাজপথের যে মশাল জ্বালিয়ে গেছেন, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পথ চলার প্রেরণা। ইতিহাসের পাতায়, দেশের সীমানার প্রহরায় এবং প্রতিবাদী মানুষের স্লোগানে শফিউল আলম প্রধান এক অমর নাম। তাঁর ৯ম মৃত্যুবার্ষিকীতে এই মহান দেশপ্রেমিক ও রাজপথের সিংহপুরুষের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।