• ঢাকা |

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় তিনটি মিথ্যা ও মিথ্যার নাশকতা


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ৪ আগস্ট, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 

মিথ্যাবাদী মুজিব ও মুজিবের নাশকতার রাজনীতি

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহু বড় বড় মিথ্যার জনক হলো শেখ মুজিব। তার রাজনীতির পুরাটাই মিথ্যা নির্ভর ও নাশকতাপূর্ণ। মিথ্যাই তার নাশকতার মূল হাতিয়ার। গণতন্ত্রের ওয়াদা দিয়ে ভোট নিয়ে গণতন্ত্রকেই কবরে পাঠায় এবং প্রতিষ্ঠা দেয় একদলীয় ফ্যাসিবাদী বাকশাল। ১৯৭০ সালে নির্বাচনে সোনার বাংলা এবং ৮ আনা সের চাউলের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট নিয়ে ক্ষমতায় এসে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ উপহার দেয়। সে দুর্ভিক্ষের মূল কারণ, আওয়ামী লীগ নেতাদের সীমাহীন লুটপাট, সরকারি খাদ্য সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতা এবং সীমান্ত দিয়ে ভারতে অবাধ চাউল পাচার। ১৯৭৩-৭৪’য়ের সে দুর্ভিক্ষে ১৫ লাখের বেশী মানুষের অনাহারে মৃত্যু ঘটে। বস্ত্রের অভাবে নারীরা জাল পড়তে বাধ্য হয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গণে বাংলাদেশের জন্য মুজিব অর্জন করে ভিক্ষার তলাহীন ঝুলির খেতাব। বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশ আর কখনোই এতোটা বেইজ্জতি হয়নি। মুজিবের রাজনীতির সবচেয়ে বড় নাশকতাটি হলো পৌত্তলিক ভারতকে সাথে নিয়ে ১৯৭১’য়ে বিশ্বের সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র পাকিস্তান ভাঙা।    

বাংলাদেশের ইতিহাসে মুজিবই সর্বপ্রথম বিচার বহির্ভুত হত্যা শুরু করে। সেটি রাজনৈতিক শত্রুদের নির্মূলের লক্ষ্যে। সে কাজের জন্য মুজিব গড়ে তোলে বিশাল রক্ষিবাহিনী; এবং ৩০ হাজারের বেশী বিরোধদলীয় নেতাকর্মীদের হত্যা করে। সর্বহারা পার্টির নেতা সিরাজ শিকদারকে হত্যার পর সংসদে দাঁড়িয়ে মুজিব আস্ফালন করেছিল এই বলে, “কোথায় আজ সিরাজ শিকদার?” অপর দিকে জেনারেল জিয়াউর রহমানের অপরাধও কম গুরুতর নয়। জিয়ার অপরাধ, মুজিবের শাসনামলে যারা  সন্ত্রাস, হত্যা, জুলুম ও লুটপাটের ন্যায় গুরুতর অপরাধের সাথে জড়িত ছিল তাদের কাউকে বিচার করেননি। যারা অন্যায় ভাবে বিহারিদের ঘরবাড়ি ও দোকানপাট দখল করেছিল তাদেরও তিনি বিচার করেননি। বরং যারা অবৈধ জবরদখল করেছে জিয়া তাদের হাতে মালিকানা তুলে দিয়েছে। মুজিবামলের অপরাধীদের বিচার করলে অপরাধীদের শাসন আবার ফিরে আসতো না। সেটি হলে জনগণকে হাসিনার নৃশংস ফ্যাসিবাদ এবং তার হাতে গুম, খুন, আয়না ঘর, শাপলা চত্বরের গণহত্যা, পিল খানার হত্যাকাণ্ড এবং ২০২৪’য়ের গণহত্যা দেখতে হতো না।      

তবে শেখ মুজিবের সবচেয়ে বড় অপরাধটি হলো, সে শুধু বড় মাপের মিথ্যাবাদীই ছিল না, বরং সে অধিকাংশ বাংলাদেশীদেরও মিথ্যাবাদী বানাতে পেরেছে। ফলে যে মিথ্যাটি মুজিব এক সময় একা বলতো, এখন সে মিথ্যাটি কোটি কোটি বাংলাদেশী বলে। মহান নবীজী (সা‍:) মিথ্যাকে সকল পাপের মা বলেছেন। এর অর্থ, যে ব্যক্তি মিথ্যা বলে সে নিজে পাপ উৎপাদনের কারখানায় পরিণত হয়। তাই দেশে মিথ্যার জোয়ার এলে পাপের জোয়ারও আসে। তখন দেশে প্লাবন আসে দুর্বৃত্তির। বাংলাদেশ যেভাবে দুর্বৃত্তিতে বিশ্বে ৫ বার প্রথম হলো, তার মূল কারণ, দেশ জুড়ে মিথ্যার বিশাল জোয়ার। এমনটি কখনো হয়না যে, মিথ্যার জোয়ার আসলো অথচ দুর্বৃত্তির জোয়ার এলো না। মিথ্যুকদের মূল বৈশিষ্ট্য হলো, তারা  শুধু নিজেরাই মিথ্যা বলে না; অপরের বলা মিথ্যাকে তারা অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়।

                       

মিথ্যার নাশকতা এবং মিথ্যার স্রোতে ভাসা বাঙালি মুসলিম

মানব জীবনে বড় বড় বিপর্যয়গুলি ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড়, মহামারি বা হিংস্র জীবজন্তুর কারণে ঘটে না। বরং সেটি ঘটে মিথ্যার নাশকতার কারণে। মিথ্যার বড় নাশকতাটি হলো ব্যক্তির ঈমান, সততার ও বিবেকের বিরুদ্ধে। মিথ্যা যেমন পারিবারিক জীবনে বিপর্যয় আনতে পারে, তেমনি ভয়ানক বিপর্যয় আনতে পারে দেশের রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি, অর্থনীতি ও প্রশাসনে। তখন দূর্নীতির প্লাবন আসে। আসে যুদ্ধ, হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ ও নানারূপ জুলুম। বাংলাদেশে সেটি এসেছে ১৯৭১’য়ে। তাই ঈমান, মানবতা ও স্বাধীনতা সুরক্ষিত করতে হলে সমাজ থেকে মিথ্যার নির্মূল করতে হয়। মিথ্যার নির্মূলই ইসলামের মূল এজেন্ডা। সকল নবী রাসূলদের এটিই ছিল মূল মিশন।  ইসলামের প্রথম জিহাদটি তাই মিথ্যা নির্মূলের জিহাদ। নবীজী (সা:) তাঁর নবুয়তী জীবনের প্রথম ১৩টি বছর সে জিহাদটি লড়েছেন মক্কায়। মিথ্যা নির্মূলের সে জিহাদটি অস্ত্রের নয়, বরং বুদ্ধিবৃত্তির। অস্ত্র এখানে সত্য নির্ভর লেখনি এবং মুখের বয়ান। অধিকাংশ মানুষ জান্নাতে যাবে এ যুদ্ধে অংশ নেয়ার কারণে। এবং অধিকাংশ মানুষ জাহান্নামে যাবে এ যুদ্ধে নীরব, নিষ্ক্রিয় বা মিথ্যার পক্ষে অংশ থাকার কারণে। নবী-রাসূলদের আমৃত্যু যুদ্ধ ছিল এই মিথ্যা নির্মূলে।  বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ যুদ্ধ লড়ছে মিথ্যার পক্ষে এবং সত্যের বিরুদ্ধে। ফলে ১৯৭০ থেকেই  রাজনীতির ময়দানের বার বার বিজয় পেয়েছে ইসলামের শত্রুপক্ষ। অতীতে বিজয় পেয়েছে মুজিব ও হাসিনার দুর্বৃত্ত ফ্যাসিবাদী শক্তি। এখন বিজয় পাচ্ছে বিএনপির ন্যায় দুর্বৃত্তি, চাঁদাবাজী, সন্ত্রাস ও প্রতারণার পক্ষের শক্তি। ফলে রাজপথ থেকে অশান্তি ও অস্থিরতা কমছে না।  

বুঝতে হবে, পৃথিবীতে পৌত্তলিকতা বা নাস্তিকতাই একমাত্র মিথ্যা নয়, ধর্মীয় অঙ্গণের ন্যায় প্রচুর গুরুতর মিথ্যা রয়ে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গণে। বাংলাদেশের এ দুটি অঙ্গণ মিথ্যায় ভরপুর। মিথ্যার প্লাবন যেমন রাজনৈতিক জীবনে সংঘাত ও ভয়ানক যুদ্ধ ডেকে আনতে পারে, তেমনি আখেরাতে জাহান্নামেও নিতে পারে। ১৯১৭ সালে খেলাফত ভেঙে গেছে এবং ১৯৭১’য়ে পাকিস্তান ভেঙে গেছে মিথ্যানির্ভর রাজনীতির কারনে । রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তির অঙ্গণে সবচেয়ে বড় মিথ্যা হলো জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ, আঞ্চলিকতাবাদ, সেক্যুলারিজম, কম্যুনিজমের ন্যায় মতবাদ।  এ মতবাদগুলির চিরন্তন যুদ্ধ ইসলামের বিরুদ্ধে।

মিথ্যা থেকে বাঁচাই এ জীবনে সবচেয়ে বড় বাঁচা। মিথ্যা নিয়ে বাঁচার অর্থ জাহান্নামের দিকে ধাবিত হওয়া। হযরত আদম (আ:) থেকে শুরু করে মানব জীবনে সবেচেয়ে বড় যুদ্ধটি হলো সত্যের সাথে মিথ্যার। এখানেই মানুষের ঈমানের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি হয়। এ যুদ্ধে যারা সত্যের পক্ষ নেয় তারাই বিজয়ী হয় এবং জান্নত পায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিশ্বের অধিকাংশ মানুষই ব্যর্থ হয় মিথ্যার স্রোতে ভেসে যাওয়া থেকে বাঁচতে। পবিত্র কুর’আনেও সে কথাটি বার বার বলা হয়েছে। মিথ্যার প্রতি আসক্তি মাদকাসক্তির চেয়েও প্রবল। মিথ্যার স্রোত থেকে বাঁচা যে কতো কঠিন সেটি বুঝা যায় ভারতের দিকে তাকালে। দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ বিজ্ঞানী, অধ্যাপক, বুদ্ধিজীবী, আদলতের বিচারক ও রাজনীতিবিদ হলো পৌত্তলিক; তারা ভেসে যাচ্ছে মূর্তিপূজা, গরুপূজা ও লিঙ্গপূজার স্রোতে। বাংলাদেশের চিত্রটিও অতি করুণ। দেশটির অধিকাংশ জনগণ মূর্তি পূজা, গরুপূজা ও লিঙ্গ পূজার স্রোতে ভেসে না গেলও ভেসে গেছে বিরাজমান রাজনৈতিক ও মতবাদী মিথ্যার স্রোতে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির অধিকাংশ শিক্ষক, অধিকাংশ পত্রিকার সম্পাদক, আদালতের অধিকাংশ বিচারক, অধিকাংশ পেশাজীবী এবং অধিকাংশ লেখক ও কবি সাহিত্যিক হলো মিথ্যার প্রচারক। তারা পাকিস্তান আমলের ২৪ বছরকে পরাধীন আমল বলে। ১৯৭১’য়ে বাংলাদেশ সৃষ্টিকে পূর্ব বাংলার মানুষের প্রথম স্বাধীনতা বলে। এবং তারা প্রচার করে ১৯৭১’য়ে ৩০ লাখ বাঙালি নিহত হয়েছিল।

 

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ৩টি মিথ্যা

বাংলাদেশের রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ৩টি মিথ্যা হলো:

এক). বাংলাদেশের মানুষ প্রথম স্বাধীনতা পায় ১৯৭১’য়ে

দুই). বাংলাদেশের স্বাধীনতা এনেছে মুক্তিাবাহিনী

তিন). ১৯৭১’য়ের ৯ মাসের যুদ্ধে নিহত হয় ৩০ লাখ বাঙালি

বাংলাদেশের রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি, আলোচনা সভা ও টিভি টক শো’গুলিতে এসব মিথ্যার বিপুল ছড়াছড়ি দেখে প্রশ্ন জাগে আলোচকদের বিবেকের সুস্থতা ও সত্যবাদিতা নিয়ে। প্রতিটি মিথ্যার পিছনে থাকে অপরাধী মন, থাকে নাশকতার মতলব। এবং থাকে রাজনৈতিক লক্ষ্য।  প্রতিটি মিথ্যাই হলো বেঈমানীর দৃশ্যমান রূপ। মইবথ্যাই হলো সকল যুগের এবং সকল দেশের বেঈমানদের নগ্ন হাতিয়ার। তাই এটি শুধু ইবলিস শয়তানের হাতিয়ার নয়, এটি হলো বাঙালি ফ্যাসিস্ট, বাঙালি সেক্যুলারিস্ট, বাঙালি কম্যুনিস্ট শয়তানদের হাতিয়ারও। ঈমানদারকে তাই শুধু সত্য গুলিকে জানলে চলে না, তাকে জানতে হয় প্রচলিত মিথ্যাগুলিকেও। কারণ, ঈমানদারের জীবনের পবিত্রতম জিহাদটি হলো মিথ্যার নির্মূলের জিহাদ -যেমন ছিল নবী-রাসূলদের। আলোচনা করা যাক বাংলাদেশের রাজনীতি সবচেয়ে বড় ৩টি মিথ্যা নিয়ে:  

 

প্রথম মিথ্যা: বাংলাদেশের মানুষ প্রথম স্বাধীনতা পায় ১৯৭১’য়ে  

১৯৭১’য়ের যুদ্ধে পাকিস্তান ভাঙা হয়েছে -সেটি ইতিহাসের শতভাগ সত্য কথা। এ নিয়ে কারো কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু  পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশের সৃষ্টিকে যদি স্বাধীনতা বলা হয়, তবে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ অবধি ২৪ বছরের পাকিস্তানী আমলকে পূর্ব পাকিস্তানের পরাধীনতা বলতে হয়। সেটি ডাহা মিথ্যা কথা। সে মিথ্যাটি মেনে নিলে পাকিস্তানকে বলতে হয় দখলদার ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র; এবং পূর্ব পাকিস্তানকে বলতে হয় পশ্চিম পাকিস্তানের কলোনী -যেমন ১৯০ বছর যাবত বাংলা কলোনী ছিল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশের। কোন বিবেকবান মানুষ কি এরূপ ডাহা মিথ্যাকে মেনে নিতে পারে? কলোনী কাকে বলে -সেটি বাঙালির অজানা ছিল না। সেখানে ছিল ছিয়াত্তরের মনন্তর যাতে বাংলার তিন ভাগ জনগণের একভাগ অনাহারে মারা গিয়েছিল। ছিল মসলিন শিল্পীদের আঙ্গুল কাটার ইতিহাস। ছিল নীল চাষ। ছিল হিন্দু জমিদার ও মহাজনদের নিষ্ঠুরতা। অথচ পাকিস্তানী আমলে কোন দুর্ভিক্ষ আসেনি। জমিদারি শোষন ছিল না। অথচ এতো বড় মিথ্যাচার নিয়েই বাংলাদেশের রাজনীতি। সেটি যেমন আওয়ামী লীগ ও বাম শিবিরের রাজনীতি, তেমনি সেটি বিএনপির রাজনীতি।

অথচ ইতিহাসের পরম সত্য ঘটনা হলো, বাঙালি মুসলিমগণ দীর্ঘ ১৯০ বছরের ব্রিটিশ শাসনের নির্মম পরাধীনতা থেকে স্বাধীনতা পায় ১৯৪৭’য়ের ১৪ আগস্ট, ১৯৭১’য়ে নয়। কোন বিবেকবান সত্যবাদী মানুষ কি সেটি অস্বীকার করতে পারে? এটি তো বাঙালি মুসলিম ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। অথচ যারা বলে বাংলাদেশীদের স্বাধীনতার শুরু ১৯৭১’য়ের ২৬শে মার্চ থেকে, তারা বাঙালি মুসলিম ইতিহাসের সে বিশাল অর্জন নিয়ে কথা বলে না। এটি তাদের সত্যগোপন ও বিশাল মিথ্যাচারিতা। অথচ সোহরাওয়ার্দী, মুজিবসহ সকল আওয়ামী লীগ নেতারাও ১৪ আগস্টকে স্বাধীনতা দিবস রূপে উদযাপন করেছে। প্রাণভরে উদযাপন করেছে পূর্ব পাকিস্তানে সাধারণ মানুষ।  ষাটের দশকে আমি যখন স্কুল ছাত্র, তখন সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে ১৪ আগস্ট স্বাধীনতা দিবস রূপে উদযাপন করা হতো। স্কুল কলেজ, অফিস আদালতে, বাজারের দোকানে দোকানে এবং অনেকের গৃহে ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের পতাকা উড়তে দেখেছি। আমাদের বাড়িতে ও আমাদের গ্রামের মসজিদেও ১৪ আগস্টে পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন করা হতো। ঐদিন স্কুলে স্বাধীনতার উৎসব হতো।  ১৪ আগস্টের সকালে আমাদের কাজ হতো লম্বা বাঁশের মাথায় পাকিস্তানের পতাকা টানিয়ে উত্তোলন করা। সন্ধা পর্যন্ত সেটি পত পত করে উড়তো। ঐদিন সুযোগ মিলতো সারা দিন বিনা টিকিটে দীর্ঘ রেল ভ্রমণের।

অথচ বাংলাদেশে স্বাধীনতা দিবস রূপে ২৬ মার্চ কখনোই ১৪ আগস্টের ন্যায় উদযাপিত হতে দেখেনি। ২৬ মার্চ পরিণত হয়েছে শুধু আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের স্বাধীনতায়। এ দিনটি হৃদয় বিদারক স্মৃতি বহন করে চরম জুলুম নির্যাতন ও দুঃখের -বিশেষ করে ইসলামপন্থী, পাকিস্তানপন্থী ও অবাঙালিদের জন্য। অথচ  সে তুলনায় ১৪ আগস্টের অর্জন ছিল বিশাল ও তুলনাহীন। সেটি ছিল সকল বাঙলি মুসলিমের গোলামী মুক্তির স্বাধীনতা। জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে দেশের ভূমিহীন গরীব জনগণ পেয়েছিল জমির মালিকানা। সেদিন শুধু বিদেশী ব্রিটিশ শাসন থেকেই মুক্তি মিলেনি, মুক্তি মিলেছিল দেশী হিন্দু জমিদার ও মহাজনদের শাসন থেকেও। শিক্ষিত মুসলিমরা পেয়েছিল চাকুরি বাকুরির সুযোগ সুবিধা -যা আগে কখনো জুটেনি। বাঙালি মুসলিমদের জন্য এগুলি ছিল বিশাল অর্জন -যা ১৯৭১’য়ের অর্জিত হয়নি। অথচ ১৯৭১’য়ের অর্জন হলো ভারতীয় আধিপত্য ও লুণ্ঠন, বাকশালী ফ্যাসিবাদ, আওয়ামী নেতাকর্মীদের দুর্বৃত্তি এবং ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ।    

প্রশ্ন হলো, পৃথিবীর অন্য কোন দেশের কোন পত্রিকায় বা কোন পুস্তকে পাকিস্তানকে কি কখনো ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র এবং পূর্ব পাকিস্তানকে কি কখনো পাকিস্তানের কলোনী বলা হয়েছে? পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মাঝে বৈষম্যের কথা অনেকেই বলেছে। কিন্তু কোন বাঙালি নেতা কি পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চিম পাকিস্তানের কলোনি বলেছে? এমন কি আওয়ামী লীগও তার ১৯৭০ সালে নির্বাচনি মেনিফেস্টোতে সেরূপ কথা উল্লেখ করেনি। এরূপ অবান্তর মিথ্যা কথাটি হলো ১৯৭১’য়ের আবিষ্কার;বাংলাদেশের রাজনীতিত সে ধারণাটি ঢুকিয়েছে ভারত।  ভারতসেবী আওয়ামী ফাসিস্ট ও বামধারার নেতাকর্মীদের মুখে এমন মিথ্যা বলা শুরু হয় ১৯৭১’য়ের ১৬ ডিসেম্বর ভারতীয় সেনাবাহিনী দ্বারা পূর্ব পাকিস্তান অধিকৃত হওয়ার পর। এরূপ অপপ্রচারের মূল উদ্দেশ্য হলো, পাকিস্তানকে একটি অপরাধী ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র রূপে চিত্রিত করা। এরূপ মিথ্যার রাজনৈতিক মতলব হলো: নতুন প্রজন্মের মনে পাকিস্তানের প্রতি ঘৃণা বাঁচিয়ে রাখা -যাতে পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের আর কোন দিনই বন্ধুত্ব না হয়।    

যাদের ইতিহাসের জ্ঞান আছে এবং পাকিস্তান আমলকে যারা স্বচোখে দেখেছে তারা কখনোই ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ অবধি এ ২৪ বছরকে বাঙালি মুসলিমের পরাধীন আমল বলতে পারে না। সেরূপ বললে তা হবে নিরেটি মিথ্যাচার। কারণ এই ২৪ বছরে পূর্ব পাকিস্তানের বুকে যা উন্নয়ন হয়েছে ১৯০ বছরের ব্রিটিশ শাসনে তার ১০ ভাগের এক ভাগও হয়নি।  সে ২৪ বছরে নির্মিত হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাদে দেশের সবগুলি বিশাল আকারের বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ বাদে সবগুলি মেডিক্যাল কলেজ, সবগুলি ইঞ্জিনীয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়, প্রায় সবগুলি ক্যাডেট কলেজ এবং সবগুলি জেলা স্কুল ও মডেল স্কুল।

১৯৪৭’য়ের পূর্বে বাংলাদেশে কোন পাট কল ছিল না। কোন কাগজের কল, স্টিল মিল ও ঔষধের কারখানা  ছিল না। পাকিস্তান আমলের ২৪ বছরে নির্মিত হয়েছে ৬০টির বেশি পাটকল, ৬০টির বেশি বস্ত্রকল, ২টি কাগজের কল। নির্মিত হয়েছে তেল রিফাইনারি, স্টিল মিল, অস্ত্র কারখানা এবং ঔষধ কারখানা। সে তুলনায় পাশ্ববর্তী পশ্চিম বাংলা এমন উন্নয়ন হয়নি। পশ্চিম বাংলা যা কিছু হয়েছে তা ব্রিটিশ আমলে। এরপরও কি পাকিস্তান আমলকে পরাধীন আমল বলা যায়? বলা যায় কি স্বাধীনতার শুরু ১৯৭১ থেকে? মিথ্যা কথা কোন সভ্য মানুষের সংস্কৃতি নয়, তাই এ মিথ্যা বন্ধ হওয়া উচিন। নইলে এ মিথ্যা বাঙালি মুসলিমের পাপের অঙ্ক বাড়াবে। আর পাপ বাড়লে আযাবও বাড়ে।

বরং ইতিহাসের অতি নিরে সত্য কথা হলো, ১৯৭১‌’য়ে বাঙালি মুসলিমের স্বাধীনতা অর্জিত হয়নি, বরং সংঘটিত হয়েছে পাকিস্তান ভাঙার হারাম অপরাধটি। এ ঐতিহাসিক চরম সত্যটি ভারতীয় পৌত্তলিকদের ন্যায় বাংলাদেশের সেক্যুলার রাজনীতির বেঈমানগণও অস্বীকার করতে পারে। কিন্তু যারা প্রকৃত ঈমানদার তাদের হৃদয়ে পাকিস্তান ভাঙার এ অপরাধ হাজার হাজার বছর বেঁচে থাকবে। সেক্যুলারিস্ট বেঈমানদের এ বিশাল অপরাধ নিয়ে বিচারও বসবে।  তাদের ১৯৭১’য়ের এ অপরাধ রক্ষিত থাকবে মহান রব’য়ের কাছে বাঙালি সেক্যুলারিস্টদের আমলনামায়।         

প্রশ্ন হলো, পাকিস্তানের প্রথম ২৪ বছরে যে ৪ জন বাঙালি অখণ্ড পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তারা কি পাকিস্তানের কোন কলোনী থেকে উঠে এসেছিলেন? যেসব বাঙালি প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন তারা হলেন: খাজা নাযিমুদ্দীন, মহম্মদ আলী বোগরা, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং নুরুল আমীন। উল্লেখ্য যে, নুরুল আমীন সাহেব ১৯৭১’য়ের ৭ ডিসেম্বর থেকে ২০ ডিসেম্বর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা। প্রশ্ন হলো, পরাধীন কলোনীর দাস কি কখনো দখলদার ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদা পায়? ১৯০ বছর ব্রিটিশ কলোনীতে বাস করে কোন বাঙালি কি ব্রিটিনের প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রী হওয়ার সুযোগ পেয়েছে? ১৯৫৪’য়ের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক মন্ত্রী হয়েছিলেন। সে সময় মন্ত্রী রূপে তিনি শপথ নিয়েছিলেন পাকিস্তানের স্বাধীনতার সুরক্ষার অঙ্গীকার দিয়ে? প্রশ্ন হলো, ১৯৭০’য়ের নির্বাচনটি মুজিবকে কোন পরাধীন  দেশের সংসদের জন্য লড়েছিলেন? পাকিস্তানের প্রতি গভীর ঘৃণা এবং ভারত প্রেম বাঙালি সেক্যুলারিস্ট বেঈমানদের যে কতটা উম্মাদ করেছে -তার প্রমাণ  হলো তাদের মুখের এসব মিথ্যা প্রলাপ।

পাকিস্তান সরকার পার্লামেন্ট ভবন রূপে দেশটির সবচেয়ে দামী স্থাপত্যের ও সবচেয়ে সুন্দরতম বিল্ডিংটি বানিয়েছিল ঢাকা শহরে। পাকিস্তানে এমন সুন্দর স্থাপনা একটিও নাই। সে ভবনটিই এখন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ। পাকিস্তান চাচ্ছিল ঢাকাকে পাকিস্তানের দ্বিতীয় রাজধানীর মর্যাদা দিতে। অথচ কত মিথ্যাচার? প্রশ্ন হলো, পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তানের কলোনী রূপে গণ্য করলে পাকিস্তান সরকার কি কখনো পার্লামেন্ট ভবন ঢাকায় নির্মাণ করতো? বাংলা ১৯০ বছরে ব্রিটিশের কলোনী ছিল। ব্রিটিশ সরকার কি কোন পার্লামেন্ট বিল্ডিং ঢাকা নির্মাণ করেছে? আসলে যারা ১৯৭১কে স্বাধীনতা অর্জনের বছর বলে তারা সে মিথ্যা কথাটি বলে ১৯৪৭ সালে অর্জিত স্বাধীনতাকে ভূলিয়ে দেয়ার জন্য।

 

দ্বিতীয় মিথ্যা: স্বাধীনতা এনেছে মুক্তিবাহিনী

বাংলাদেশের ইতিহাসে আরেক বিশাল মিথ্যা হলো, বাংলাদেশের স্বাধীনতা নাকি এনেছে মুক্তিবাহিনী। সে মিথ্যাটি ব্যাপক ভাবে জোর গলায় বলা হয় মুক্তিবাহিনীর ব্যর্থ ভূমিককে বড় করে দেখানোর জন্য। অথচ  প্রকৃত সত্য হলো, মুক্তিবাহিনী সমগ্র দেশ দূরে থাক, একটি থানাও পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর হাত থেকে মুক্ত করতে পারিনি। সে সামরিক সামর্থ্য মুক্তিবাহিনীর ছিল না। মুক্তিবাহিনীর কাজ ছিল ভারতের দেয়া বোমা মেরে রেল সড়কের ব্রিজ, বিদ্যুতের ট্রান্সফর্মার ও সরকারি অফিস ধ্বংস করা এবং পিস কমিটির নিরস্ত্র সদস্যদের গৃহে গিয়ে তাদের হত্যা করা। পাকিস্তান ভাঙার কাজটি করেছে ভারতীয় সেনাবাহিনী ১০ ডিভিশন সৈন্য। এজন্যই ভারতীয় সেনাবাহিনী সোহরাওয়ার্দী উদ্দানের পাক বাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে মুক্তিবাহিনী কোন অংশদারিত্বের সুযোগ দেয়নি। পাকিস্তান ভাঙার মূল কারিগর যে ভারতীয় সেনাবাহিনী -সেটি ভারত সরকার ঐদিন গর্বভরে বিশ্ববাসী জানিয়ে দিতে চেয়েছে।             

 

তৃতীয় মিথ্যা‍: তিরিশ লাখ নিহতের বয়ান

তিরিশ লাখের অর্থ তিন মিলিয়ন। একাত্তরে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি অর্থাৎ ৭৫ মিলিয়ন। যে কোন স্কুল ছাত্রও হিসাব করে বের করতে পারে, সাড়ে ৭ কোটির (৭৫ মিলিয়ন) মাঝে তিরিশ লাখ (তিন মিলিয়ন) মানুষের মৃত্যু হলে প্রতি ২৫ জনে একজনকে মারা যেতে হয়। যে গ্রামে ১ হাজার মানুষের বাস সে গ্রামে মারা যেতে হয় ৪০ জনকে। ঘটনাক্রমে সে গ্রামে কেউ মারা না গেলে পরবর্তী গ্রামটি যদি হয় ১ হাজার মানুষের বসবাস তবে সেখান থেকে মারা যেতে হবে কমপক্ষে ৮০ জনকে। যে থানায় ১ লাখ মানুষের বাস সেখানে মারা যেতে হবে ৪ হাজার মানুষকে। প্রতি থানায় ও প্রতি গ্রামে মৃত্যুর সংখ্যা এ হারে না হলে ৩০ লাখের সংখ্যা পূরণ হবে না। তাছাড়া ৯ মাসে তিরিশ লাখ মানুষকে হত্যা করতে হলে প্রতিদিন গড়ে ১১, ১১১ জনকে হত্যা করতে হয়।

১৯৭১’য়ে বাংলাদেশ ছিল একটি গ্রামীন জনসংখ্যা অধ্যুষিত একটি দেশ যার প্রায় শতকরা ৮০ ভাগ জনগণই বাস করতো গ্রামে। সেনাবাহিনীর পক্ষে যেহেতু প্রায় ৭০ হাজার গ্রামের মাঝে ১০% গ্রামে পৌঁছাতে হলে নদীনালা, দ্বীপ, বিল, হাওর ও চরে পরিপূর্ণ ৭ হাজার গ্রামে পৌঁছতে হয়। সেটি কি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষে ৯ মাসে পৌঁছা সম্ভব ছিল? ফলে সহজেই ধারণা করা যায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী শতকরা ৯৫ ভাগ গ্রামেও পৌঁছতে পারিনি। ফলে তিরিশ লাখের বিপুল হত্যাকান্ডটি ঘটাতে হতো জেলা, মহকুমা বা উপজেলা শহরে। তখন পাড়ায় পাড়ায় অসংখ্য নারীকে ধর্ষিতা হতে হতো। এটি কি তাই বিশ্বাসযোগ্য? সে সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পাক-বাহিনীর প্রকৃত সৈন্য সংখ্যা ছিল প্রায় ৪৫ হাজার। -(জেনারেল নিয়াজী, Betrayal of East Pakistan, ২০০১)। যুদ্ধবন্ধি রূপে যেসব পাকিস্তানীদের ভারতে নিয়ে যাওয়া হয় তাদের মধ্যে অনেকে ছিল বেসামরিক ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্য। ৪৫ হাজার পাকিস্তানী সৈন্যের পক্ষে কি সম্ভব ছিল বিল-হাওর,নদী-নালা,দ্বীপ ও চরাভূমিতে পরিপূর্ণ একটি দেশের প্রায় ৭০ হাজার গ্রামে পৌছানো? প্রতিটি গ্রাম দূরে থাক প্রতিটি ইউনিয়নেও কি তারা যেতে পেরেছিল? প্রকৃত সত্য হল, যুদ্ধকালীন ৯ মাসে অধিকাংশ গ্রাম দূরে থাক, অধিকাংশ ইউনিয়নেও পাক বাহিনী পৌঁছতে পারিনি। প্রতিটি গ্রামে ও ইউনিয়নে গেলে সীমান্তে যুদ্ধ করলো কারা? কারা পাহারা দিল দেশের বিমান বন্দর, নদীবন্দর, সবগুলো জেলা-শহর ও রাজধানী? ৩০ লাখ মানুষের নিহত হওয়ার এ তথ্য বিশ্বের দরবারে গ্রহণযোগ্য হওয়া দূরে থাক, বিশ্বাসযোগ্য হতে পারেনি বহু ভারতীয় সামিরিক অফিসারের কাছেও। ভারতীয় রাজনীতিবিদগণ তিরিশ লাখের পক্ষে যতই বলুক, যুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কোন কোন ভারতীয় জেনারেলদের কাছে এটি হাস্যকর মিথ্যা। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তাদের সে অভিমত একবার নয়, বহুবার প্রকাশ পেয়েছে।

নিহতদের মিথ্যা সংখ্যা ও গণকবর নিয়ে কঠাক্ষ করেছেন লন্ডনের দৈনিক গার্ডিয়ানি পত্রিকার William Drummond। তিনি ১৯৭২ য়ের জুনে এক নিবন্ধে লিখেছিলেন, “Of course, there are ‘mass graves’ all over Bangladesh. But nobody, not even the most rabid Pakistani-hater, has yet asserted that all these mass graves account for more than about 1,000 victims. Furthermore, because a body is found in a mass grave does not necessarily mean that the victim was killed by the Pakistani Army”. অনুবাদ: “অবশ্যই বাংলাদেশ জুড়ে গণ-কবর রয়েছে। কিন্তু কেউই –এমনকি যারা চরম ভাবে পাকিস্তান বিদ্বেষী তারাও এতোটা প্রত্যয়ের সাথে বলতে পারিনি যে, সে সব গণকবরে সব মিলিয়ে এক হাজারের বেশী লাশ আছে। উপরুন্ত, গণকবরে লাশ পাওয়া গেলেই সেটি প্রমাণিত হয় না যে,সে ব্যক্তি পাকিস্তানে আর্মির হাতে নিহত হয়েছিল।”

তিনি আরো লিখেন, “Killing fields and mass graves were claimed to be everywhere, but none was forensically exhumed and examined in a transparent manner, not even the one in Dhaka University. Moreover, the finding of someone’s remain cannot clarify, unless scientifically demonstrated, whether the person was Bengali and non-Bengali, combatant or non-combatant, whether death took palce in the 1971 war, or whether it was caused by the Pakistan Army”. অনুবাদ: “বলা হয়, বধ্যভূমি ও গণকবর ছড়িয়ে আছে সর্বত্র। কিন্তু কোথাও এ অবধি লাশকে কবর থেকে বের করে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ময়নাতদন্তের আয়োজন করা হয়নি। এমন কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও নয়। তাছাড়া কারো মরদেহের পেলেই সে কি বাঙালী না অবাঙালী ছিল, যোদ্ধা না অযোদ্ধা ছিল বা উনিশ শ’ একাত্তরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে নিহত হয়েছিল -সেটি প্রমাণিত হয় না। এর জন্য প্রয়োজন বিজ্ঞানসম্মত পরীক্ষা-নিরীক্ষার।” অথচ বাংলাদেশে সেরূপ কোন পরীক্ষা-নিরীক্ষার আয়োজন হয়নি। কারা মারা গেল, কতজন মারা গেল এবং কাদের হাতে মারা গেল, সেটি নির্ধারিত হয়েছে নিছক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। এবং গুজবের ভিত্তিতে। সে গুজবের পিছনে কাজ করেছিল রাজনৈতিক মতলব। তাই ইতিহাস থেকে ইচ্ছাকৃত ভাবেই বাদ দেয়া হয়েছে নিহত হাজার হাজার অবাঙালী ও পাকিস্তানপন্থীদের সংখ্যা।

William Drummond লেখেন, “The field investigation by the Home Ministry of Bangladesh in 1972 had turned up about 2,000 complaints of deaths at the hands of the Pakistan Army”. অনুবাদ: “১৯৭২ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় মাঠ পর্যায়ে তদন্ত করে, সে তদন্তে পাকিস্তান আর্মির হাতে প্রায় দুই হাজার নিহত হওয়ার অভিযোগ আসে।” তিনি আরো লেখেন “The Pakistan Army did kill, but the Bangladeshi claims were blown out of proportion undermining their credibility”. অনুবাদ: “পাকিস্তান আর্মি মানুষ হত্যা করেছে, কিন্তু বাংলাদেশীরা নিহতদের সংখ্যা এতোটাই ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে পেশে করেছে যে তাতে সে দাবীর বিশ্বাস-যোগ্যতাই বিনষ্ট হয়েছে।”

১৯৭২ সালের ৬ জুন William Drummond লন্ডনের “The Guardian” পত্রিকায় “The Missing Millions” শিরোনামায় লিখেছিলেন, “This figure of three million deaths, which the Sheikh has repeated several times since he returned to Bangladesh in early January, has been carried uncritically in sections of world press. Through repeatation such a claim gains a validity of its own and gradually evolves from assertion to fact needing no attribution. My judgment, based on numerous trips around Bangladesh and extensive discussions with many people at the village level as well as in the government, is that the three million death figure is an exaggeration so gross as to be absurd.” অনুবাদঃ “নিহত তিরিশ লাখের তথ্যটি যা শেখ মুজিব বাংলাদেশের ফেরার পর জানুয়ারির প্রথম দিকে কয়েকবার বলেছেন তা বিশ্বের কোন কোন পত্র-পত্রিকা কোনরূপ বিচার-বিবেচনা না করেই প্রচার করেছে। বার বার প্রচারের ফলে এ দাবীটি গ্রহণযোগ্যতা পায়, এবং ধীরে ধীরে সেটি নিছক অনুমান থেকে সত্য ঘটনায় পরিণত হয়। অন্যরা এর নিয়ে অভিমত ব্যক্ত করার প্রয়োজনও বোধ করেনি। কিন্তু বাংলাদেশে অসংখ্যবার ভ্রমন এবং সেখানে গ্রাম পর্যায়ে ও সরকারি মহলে বহু লোকের সাথে বিষদ আলোপ আলোচনার প্রেক্ষিতে আমার ধারণা জন্মেছে, তিরিশ লাখ নিহত হওয়ার তথ্যটি অবিশ্বাস্য রকমের অতিরঞ্জিত।”

 

১৯৪৭’য়ে ও ২০২৪’য়ে অর্জিত স্বাধীনতা এবং ১৯৭১’য়ে অর্জিত পরাধীনতা 

 

১৯৪৭’য়ে বাংলা মুসলিম লীগ নেতাদের লক্ষ্য ছিল প্রকৃত স্বাধীন হওয়া; সিকিম,ভুটান বা মেরুদণ্ডহীন বাংলাদেশ হওয়া নয়। সে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল ১৯৪৭’য়ের ১৪ আগস্ট। অপরদিকে ভারতের সাথে তাজুদ্দীনের ৭ দফা, মুজিবের ২৫ বছরের দ্বিপাক্ষিক চুক্তির এবং বাংলাদেশের মাটিতে ভারতের দেড় লাখ সৈন্যের উপস্থিতিতে যা অর্জিত হয়েছিল তা হলো পরাধীনতা।   তাজুদ্দীনের স্বাক্ষরিত ৭ দফাতে বাংলাদেশের স্বাধীন সেনাবাহিনী রাখার অধিকার ছিল না। অপর দিকে ২৫ সালা চুক্তির মধ্য দিয়ে শেখ মুজিব ভারতকে যে কোন সময় বাংলাদেশে সৈন্য অনুপ্রবেশসহ সামরিক হস্তক্ষেপের পূর্ণ অধিকার দিয়েছিলেন।

অথচ ১৯৪৭’য়ে অর্জিত স্বাধীনতায় কোন বিদেশী শক্তির প্রভুত্ব ছিলনা। ভারতীয় হামলার বিরুদ্ধে পাকিস্তান দুই-দুইটি যুদ্ধ লড়েছে, ব্যয় করেছে হাজার হাজার কোটি টাকা। পারমানবিক বোমার অধিকারি এ দেশটি তেমন একটি লড়াইয়ের জন্য এখনও প্রস্তুত। কিন্তু সে সামর্থ্য কি বাংলাদেশের আছে? আর না থাকলে স্বাধীনতাই বা কতটুকু থাকে? স্বাধীনতার বিষয়টি আগ্রাসী শক্তির কাছে দয়াভিক্ষার বিষয় নয়। তবে বাংলাদেশীদের জন্য আশার বিষয় হলো, সে স্বাধীনতা তারা ১৯৭১’য়ে হারিয়েছিল তা তারা আবার ২০২৪’য়ের ৫ আগস্ট ফিরে পেয়েছে। এখন দায়িত্ব হলো সেটিকে সযত্নে ধরে রাখা ও সুরক্ষিত করা। একাজে ব্যর্থ হলে ১৯৭১’য়ের  ন্যায় আবারো স্বাধীনতা হারাতে হবে। কারণ স্বাধীনতার শত্রু ভারত বসে নাই। তারা সুযোগের অপেক্ষায় আছে মাত্র। মনে রাখতে হবে, হাসিনা পলায়ন করলে তার সৈনিকেরা পলায়ন করেনি।

 

ফরজ হলো প্রতি মুহুর্তের যুদ্ধের প্রস্তুতি

মনে রাখতে হবে মুসলিমদের উপর নামাজ রোজা ও হজ্জ যাকাতই শুধু ফরজ নয়, ফরজ হলো প্রতি মুহুর্তের জন্য যুদ্ধের প্রস্তুতি। মহান রব’য়ের পক্ষ থেকে সে সামরিক প্রস্তুতির হুকুম এসেছে সুরা আনফালের ৬০ নম্বর আয়াতে। কিন্তু সে প্রস্তুতি ক’জন বাঙালি মুসলিমের? মনে রাখতে হবে, ভারত হলো দক্ষিণ এশিয়ার বুকে ইসরাইলের চেয়ে বহু গুণ বড় ইসরাইল। ইসরাইলের পাশে বসবাসের বিপদ আছে; ফলে ঈমানী দায়ও আছে। কিন্তু ক’জন সে ঈমানী দায় নিয়ে বাঁচছে? যুদ্ধের সে ফরজ প্রস্তুতি না থাকাতে ১৯৭১’য়ে এই আগ্রাসী ভারতের  হাতে শোচনীয় ভাবে পরাজিত হতে হয়েছে। মনে রাখতে হবে, যারা সেক্যুলারিস্ট, জাতীয়তাবাদী ফাসিস্ট ও  বাম ধারার, তাদের আগ্রহ নাই ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে -যেমন ছিল না ১৯৭১’য়ে। এযুদ্ধ ইসলামপন্থীদেরই একাকী লড়তে হবে। ০৩/০৮/২০২৬