শামীম রহমান, রাজশাহী ব্যুরো: ব্যস্ত শহর। সড়কে ছুটছে যানবাহন, মানুষ ছুটছে যার যার গন্তব্যে। চারপাশে কর্মব্যস্ততার চেনা দৃশ্য। এর মধ্যেই শরৎ এসে বদলে দিয়েছে রাজশাহীর কিছু প্রান্ত। নীল আকাশের নিচে বাতাসে দুলছে সাদা কাশফুল। সবুজের ভেতর সাদা ফুলের সারি দেখে মনে হয়, ব্যস্ত নগরের পাশে প্রকৃতি নিজেই সাজিয়েছে এক টুকরো শান্তির উঠান।
মঙ্গলবার (২২সেপ্টেম্বর) রাজশাহীর বাইপাস সড়ক, পদ্মার চরাঞ্চল, বারনই আবাসিক এলাকা, বড়বনগ্রাম, জামালপুর ও বিনোদপুরের বেতার মাঠ ঘুরে দেখা গেছে এমন দৃশ্য। কোথাও সড়কের পাশে, কোথাও মাঠের কিনারায়, আবার কোথাও উন্মুক্ত জমির প্রান্তজুড়ে মাথা উঁচু করে ফুটে আছে কাশফুল।
পিচঢালা সড়কের এক পাশে নগরের ব্যস্ততা, অন্য পাশে কাশের দোলা। বাতাস উঠলেই একসঙ্গে দুলে ওঠে সাদা ফুলগুলো। মুহূর্তেই বদলে যায় দৃশ্যপট। মনে হয়, শহরের কোলাহল পেরিয়ে হঠাৎ যেন ঢুকে পড়া গেছে অন্য এক জগতে।
এই দৃশ্য টানছে নগরবাসীকেও। বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে মানুষের আনাগোনা। কেউ আসছেন বন্ধুদের সঙ্গে, কেউ পরিবার নিয়ে। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ কাশবনের পাশে দাঁড়িয়ে গল্প করছেন, আবার কেউ কিছুক্ষণ নীরবে প্রকৃতি দেখেই ফিরছেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অনিক শাহরিয়ার বন্ধুদের সঙ্গে বাইপাসের কাশফুল দেখতে এসেছেন। তাঁর ভাষায়, “পরীক্ষা ও ক্লাসের ব্যস্ততার মধ্যে বাইপাসের কাশফুল যেন এক টুকরো শান্তির জায়গা। বাতাসে কাশফুলের ঢেউ দেখলে স্বাভাবিকভাবেই মন ভালো হয়ে যায়।”
শরতের কাশফুল দেখতে রাজশাহীবাসীকে খুব দূরে যেতে হচ্ছে না। বড়বনগ্রাম, জামালপুর ও বিনোদপুরের বেতার মাঠেও ফুটেছে কাশফুল। নগরের কাছেই খোলা মাঠ, সবুজ আর গ্রামীণ আবহ থাকায় এসব জায়গায় শরতের সৌন্দর্য আরও আপন হয়ে উঠেছে।
পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী মাসুদা আক্তার বলেন, “শহরে খোলা জায়গা দিন দিন কমে যাচ্ছে। শরতের বিকেলে সন্তানদের নিয়ে কাশফুলের মধ্যে হাঁটাহাঁটি করার আনন্দ আলাদা।”
পদ্মার চরাঞ্চলও রাজশাহীর শরৎ-সৌন্দর্যের বড় অংশ। তবে এবার নদীতে পানি বেশি থাকায় কিছু চরে আগের তুলনায় কাশফুলের বিস্তার কমেছে। তারপরও পদ্মাপাড়ে প্রকৃতির এই শুভ্রতা দেখতে মানুষের আগ্রহ কমেনি।
রাজশাহীর নগরজীবনের বড় বৈশিষ্ট্য এর উন্মুক্ত পরিবেশ। পদ্মার পাড়, খোলা মাঠ, লেক ও সবুজ এলাকা নগরবাসীকে ব্যস্ততা থেকে কিছুটা দূরে যাওয়ার সুযোগ দেয়। সরকারি পর্যটন তথ্যেও বুলনপুর থেকে বড়কুঠি ও পঞ্চবটি হয়ে সাতবাড়িয়া পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার পদ্মাপাড়কে বিনোদনের গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই উন্মুক্ত পরিবেশ ধরে রাখার পাশাপাশি তা আরও পরিকল্পিত করার কথাও বলছে সিটি করপোরেশন। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, নগরের উন্মুক্ত স্থান, সবুজায়ন ও বিনোদন ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে রাজশাহীকে পরিচ্ছন্ন, আধুনিক, সবুজ, স্বাস্থ্যকর, নিরাপদ, বাসযোগ্য ও শান্তির নগরী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, টি-বাঁধসংলগ্ন সড়কে গার্ডেন লাইট, গুলজারবাগ লেক, ভদ্রা লেক ও সোনাদিঘিতে সৌন্দর্যবর্ধন এবং কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানার উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় পদ্মার চরে পাখির অভয়ারণ্য ও বনায়নের বিষয়ও রয়েছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক রেজিস্ট্রার ও অধ্যাপক ড. ইফতিখারুল আলম মাসউদের চোখে, এই কাশফুল শুধু ঋতুর পরিবর্তনের বার্তা নয়। তিনি বলেন, “শরতের কাশফুল বেশিদিন থাকে না। ক্ষণস্থায়ী এই শুভ্রতা ব্যস্ত নগরজীবনে কিছুটা প্রশান্তি এনে দিয়েছে।”
তাঁর মতে, রাজশাহীর সৌন্দর্য শুধু পরিচ্ছন্ন সড়ক কিংবা স্থাপনায় সীমাবদ্ধ নয়; শহরটির বড় শক্তি খোলা আকাশ, সবুজ, নদী ও শান্ত পরিবেশ।
তবে প্রকৃতির এই সৌন্দর্য উপভোগের সঙ্গে দায়িত্বও রয়েছে। কাশফুল ছিঁড়ে ফেলা, কাশবনের ভেতর অযথা প্রবেশ, প্লাস্টিক ও খাবারের প্যাকেট ফেলে রাখা—এসব থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রধান ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা (পশ্চিম) উপসচিব নাদিম সারওয়ার বলেন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের স্থানগুলো রক্ষায় দর্শনার্থীদের সচেতন হতে হবে। পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি দর্শনার্থীদের নিরাপত্তায় প্রশাসনের নজরদারিও প্রয়োজন।
শহর তার নিজস্ব গতিতে ছুটবে। যানবাহনের শব্দ থাকবে, মানুষের ব্যস্ততাও থাকবে। তার মধ্যেই রাস্তার ধারে দুলতে থাকবে কাশফুল। শরৎ হয়তো অল্প সময়ের জন্যই আসে, কিন্তু তার শুভ্রতা নগরবাসীকে মনে করিয়ে দেয়—ব্যস্ততার মাঝেও একটু থামতে হয়, প্রকৃতির কাছে ফিরতে হয়।
রাজশাহীর কাশফুল তাই শুধু শরতের সৌন্দর্য নয়; ব্যস্ত নগরের বুকের মধ্যে জেগে থাকা এক টুকরো প্রশান্তির নামও।