ইপিএ বাস্তবায়ন, জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আলোচনা; রোহিঙ্গা সংকট ও জ্বালানি সহযোগিতাও অগ্রাধিকার
এমএম রহমাতুল্লাহ: বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং দেশে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে আগামী ২৬ অক্টোবর চার দিনের সরকারি সফরে জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি সানায়ের আমন্ত্রণে ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত এ সফর অনুষ্ঠিত হবে।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ঢাকা সময় বেলা ১টা এবং টোকিও সময় বিকেল ৪টায় বাংলাদেশ ও জাপান সরকার যৌথভাবে প্রধানমন্ত্রীর এ সফরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে।
সফরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে থাকবেন তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, অর্থমন্ত্রী, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, ইনভেস্ট বাংলাদেশ অথরিটির চেয়ারম্যান, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে কর্মসংস্থানবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারীসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা, গণমাধ্যমকর্মী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে প্রতিনিধিদলের যাতায়াতের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে এ সফরকে দুই দেশের বিদ্যমান কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও জোরদার করার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন, বাংলাদেশি পণ্যের জাপানি বাজারে প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ, জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়নের নতুন সম্ভাবনা কাজে লাগানো সফরের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সফরকালে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ডিজিটাল রূপান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ বিকাশে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়েও আলোচনা হবে। বাংলাদেশে জাপানি কোম্পানির কারখানা স্থাপন, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের জনশক্তিকে জাপানের শ্রমবাজারের উপযোগী করে গড়ে তুলতে সহযোগিতা পাওয়ার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাবে।
সফরের দ্বিতীয় দিন, ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দুই দেশের সরকারপ্রধানের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ অংশীদারিত্বের দিকনির্দেশনা নিয়ে আলোচনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ ছাড়া জাপানের প্রধানমন্ত্রীর আয়োজিত মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।
সফরসূচিতে জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক, জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের (জেবিসিসিইসি) চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলোচনা এবং জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের গভর্নর, জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) সভাপতি এবং সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হতে পারে। জাপান-বাংলাদেশ ইকোনমিক ফোরামে মূল বক্তব্য দেওয়ার পাশাপাশি দেশটির শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করার কর্মসূচিও রয়েছে।
এসব বৈঠকের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অবকাঠামো, শিল্প, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও উৎপাদন খাতে নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করার বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
জাপান বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া দেশগুলোর মধ্যে জাপান অন্যতম। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের অবকাঠামো নির্মাণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় দেশটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।
ঢাকার মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়িকেন্দ্রিক গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও যোগাযোগ প্রকল্পে জাপানের সহযোগিতা দুই দেশের উন্নয়ন অংশীদারিত্বের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
এবারের সফরে সেই সহযোগিতাকে আরও বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ইপিএ বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য জাপানের বাজারে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং জাপানি প্রতিষ্ঠানের জন্য বাংলাদেশে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরির বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
বাংলাদেশে জাপানি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কারখানা স্থাপন হলে উৎপাদন খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার সুযোগ বাড়তে পারে। পাশাপাশি স্থানীয় উদ্যোক্তা ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
জাপানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি ও মৎস্যসম্পদ, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং আধুনিক শিল্পব্যবস্থাপনায় সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতি বহুমুখী করার প্রচেষ্টা আরও গতি পেতে পারে।
সরকারি বৈঠকের পাশাপাশি জাপানের শিল্প ও জ্বালানি খাতের অভিজ্ঞতা সরেজমিনে দেখতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পরিদর্শনের কর্মসূচি রাখা হয়েছে।
প্রাথমিক সফরসূচি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী চিবা প্রিফেকচারের ফুৎসু সিটিতে একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন করবেন। এ ছাড়া বিশ্বখ্যাত পোশাক ব্র্যান্ড ইউনিক্লোর সদর দপ্তর এবং নাগোয়ায় টয়োটার কারখানা পরিদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে।
জ্বালানি অবকাঠামো, আধুনিক উৎপাদনব্যবস্থা, শিল্পপ্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য পণ্য উৎপাদনে জাপানের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। এসব পরিদর্শনের মাধ্যমে প্রযুক্তিগত জ্ঞান বিনিময়, শিল্পসহযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে কৃষি, মৎস্যসম্পদ, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধি, বেসামরিক বিমান পরিবহন, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় সরকার আধুনিকীকরণসহ বিভিন্ন খাতে সমঝোতা বা সহযোগিতা স্মারক ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এসব সমঝোতা স্মারক চূড়ান্তভাবে সই হবে কি না, তা সফরকালে দুই পক্ষের আলোচনার অগ্রগতি ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রত্যাশা, এ সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে জাপানের বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়বে, চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কাজ ত্বরান্বিত হবে এবং অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতা আরও সম্প্রসারিত হবে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা অব্যাহত রাখা এবং দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বাইরেও আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। বিশেষ করে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সংকটের টেকসই ও শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারের বিষয়গুলো আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গা সংকট একটি দীর্ঘমেয়াদি মানবিক ও নিরাপত্তাগত চ্যালেঞ্জ। এ সংকটের টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা অব্যাহত রাখা জরুরি। জাপানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে এ বিষয়ে সহযোগিতা জোরদারের সুযোগ রয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন জাপান সফরকে শুধু আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সফর হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতি, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সফরে আলোচিত বিষয়গুলো বাস্তব কর্মসূচি ও চুক্তিতে রূপ নিলে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতে পারে।