ডিগ্রি অর্জনের বাইরে শিক্ষার্থীদের বাস্তব দক্ষতা ও নৈতিক মূল্যবোধ নিশ্চিত করাই আজকের শিক্ষার মূল চ্যালেঞ্জ
মোহসেনা আক্তারঃ বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার পরিসর গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি প্রতি বছর বাড়ছে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীর সংখ্যাও। তবে এই পরিসংখ্যানগত অগ্রগতির আড়ালে একটি মৌলিক প্রশ্ন ক্রমেই সামনে আসছে-আমাদের উচ্চশিক্ষা কি কেবল ডিগ্রি প্রদানেই সীমাবদ্ধ, নাকি তা দক্ষতা ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ গড়ে তুলতে সক্ষম হচ্ছে?
BBS-এর ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, স্নাতক বা উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৩.৫%। পাশাপাশি, প্রায় ৯ লাখ গ্র্যাজুয়েট চাকরি চাইছেন,তবু তাদের অনেকেই নিয়োগ পাচ্ছেন না। ২০২৫ সালের রিপোর্ট বলছে, এক‑মত গ্র্যাজুয়েটদের এক‑তৃতীয়াংশ দুই বছরেও চাকরি পায়নি।এই তথ্য প্রমাণ করে, শুধু ডিগ্রি বা সনদই নয়; দক্ষতা, ফিল্ড‑রিলেভ্যান্ট স্কিল এবং বাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য থাকা জরুরি।
BBS, Labour Force Survey 2024 | TBS, Educated but unemployed, 2025
বর্তমান কর্মজগতে একাডেমিক ডিগ্রির পাশাপাশি বাস্তব দক্ষতার গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। নিয়োগদাতারা এখন আর শুধু সনদ বা ফলাফলের দিকে তাকান না; তারা গুরুত্ব দেন প্রার্থীর যোগাযোগ দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং পেশাগত আচরণে। অথচ বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা কাঠামো এখনও অনেকাংশে মুখস্থনির্ভর পরীক্ষাভিত্তিক ও তাত্ত্বিক জ্ঞানে নির্ভরশীল, যেখানে ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত। এর ফলে শিক্ষার্থীরা ডিগ্রি অর্জন করলেও বাস্তব জীবনের চাহিদার সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছে।
দক্ষতার পাশাপাশি, নৈতিক শিক্ষার ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এক গভীর সংকট। বিভিন্ন গবেষণা ও পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীরা প্রায়ই নিজের দায়িত্ব, সততা, পরিশ্রম ও মানবিক আচরণকে প্রাধান্য না দিয়ে স্বল্পমেয়াদি অর্জন বা কেবল ডিগ্রি অর্জনের দিকে মনোযোগ দেয়। এর ফলে তাদের কর্মস্পৃহা ও নৈতিক দায়িত্ববোধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা ব্যক্তিগত জীবনে এবং পরবর্তীতে সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সম্প্রতিক একটি জাতীয় জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৭০ % যুবক–যুবতিই মনে করেন দুর্নীতি ও আত্মীয়প্রীতি দেশের উন্নয়নের প্রধান বাধা । আরেক বিশ্লেষণে ৮০ %–র বেশি তরুণ দাবি করছেন, আগামী দিনের সমাজ গড়ার জন্য দুর্নীতি প্রতিরোধ ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করাই তাদের প্রতি প্রাথমিক দায়িত্ব । এছাড়া, সাম্প্রতিক সংবাদগুলো বলছে,শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি, মাদক, র্যাগিং এবং ন্যায্যতার অভাবের মতো অনৈতিক ঘটনার বেড়ে চলাছে। BYLC Youth Survey 2024 | BRAC Institute of Governance and Development, 2024 | Alokito Bangladesh, Education & Ethics Report, 2024
এই সব মিলিয়ে বোঝা যায় কেবল দক্ষতা নয়, নৈতিকতা ও মূল্যবোধ যদি পাশাপাশি না থাকে, তাহলে সৃষ্ট গ্র্যাজুয়েট সামাজিক দায়বদ্ধ নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে না; বরং দুর্নীতি, অবিচার ও অবজ্ঞা সমাজে ছড়িয়ে পড়বে।
উচ্চশিক্ষার মূল উদ্দেশ্য কেবল চাকরির জন্য দক্ষ মানুষ তৈরি নয়; বরং দক্ষতাসমপন্ন দায়িত্বশীল, মানবিক ও নৈতিক নাগরিক গড়ে তোলা, যারা সমাজ ও রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে সক্ষম। দক্ষতা যদি নৈতিকতা ও মূল্যবোধ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তবে তা সমাজের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তনের বদলে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই দক্ষতার সঙ্গে নৈতিক শিক্ষা এবং মানবিক মূল্যবোধ সমন্বয় করা অত্যন্ত জরুরি।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দায়িত্ব শুধু পাঠ্যসূচি সম্পন্ন করা নয়। পাঠ্যক্রমে ইন্টার্নশিপ, প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা, গবেষণা কার্যক্রম, সহশিক্ষা কার্যক্রম, বিতর্ক, স্বেচ্ছাসেবামূলক উদ্যোগ ও নৈতিক শিক্ষার অনুশীলন সমান গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে শিক্ষাদানের পদ্ধতি অর্থাৎ পেডাগজি (শিক্ষাদানের কৌশল ও দর্শন) আধুনিক, শিক্ষার্থী‑কেন্দ্রিক ও নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার উপযোগী হতে হবে। শিক্ষকদের ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ, সমালোচনামূলক চিন্তা বিকাশে সহায়ক শিক্ষা পদ্ধতি এবং বাস্তবভিত্তিক মূল্যায়ন ছাড়া দক্ষতাভিত্তিক ও নৈতিক উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
শিক্ষার্থীর ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাঠ্যবইয়ের বাইরে নিজেকে গড়ে তোলার মানসিকতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন, নৈতিক আচরণের চর্চা এবং সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ তৈরি না হলে কেবল ডিগ্রি দিয়ে জীবনের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। প্রকৃত শিক্ষা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা চিন্তা, চরিত্র ও আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে এবং সামাজিক দায়বদ্ধ নাগরিক হিসেবে শক্তিশালী ভূমিকা পালনের ক্ষমতা যোগায়।
নীতিনির্ধারকদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা রয়েছে। উচ্চশিক্ষার সাফল্য যেন কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বা ডিগ্রিধারীর পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং শিক্ষার গুণগত মান, কর্মসংস্থানের সঙ্গে সংযোগ, দক্ষতা ও নৈতিক শিক্ষা সব মিলিয়ে মূল্যায়ন করা উচিত।
সবশেষে বলা যায়, উচ্চশিক্ষার মূল চ্যালেঞ্জ এখন আর শুধু ডিগ্রি বনাম দক্ষতার দ্বন্দ্ব নয়। বরং শুধুমাত্র ডিগ্রি অর্জনের ইচ্ছার সীমা পেরিয়ে এমন একটি উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে দক্ষতা ও নৈতিক মূল্যবোধ পরস্পরের পরিপূরক হয়ে শিক্ষার্থীদের দায়িত্বশীল, মানবিক ও কর্মক্ষম নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে। ডিগ্রির সীমা পেরিয়ে সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করাই আজকের উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। আর ডিগ্রির এই গণ্ডি পেরিয়ে যদি দক্ষতা ও নৈতিকতার সমন্বয়ে একটি দায়িত্বশীল জ্ঞানসমাজ গড়ে তোলা যায়, তবেই উচ্চশিক্ষা তার প্রকৃত
উদ্দেশ্য পূরণ করবে এবং প্রকৃত সামাজিক ও জাতীয় দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হবে।
মোহসেনা আক্তার
প্রভাষক
ইসলামের ইতিহাস ও সভ্যতা বিভাগ
এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ