• ঢাকা |

ভাষা আন্দোলনের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক নাশকতা   


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ২২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

ফিরোজ মাহবুব কামাল                                                      

ভাষা আন্দোলনের গোলপোষ্ট এবং জামায়াত নেতার কাণ্ড

ভাষা আন্দোলনের মূল লক্ষ্যটি শুধু পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা রূপে বাংলা ভাষার স্বীকৃতি লাভ ছিল না। বরং এর ছিল সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় গোলপোস্ট। এ আন্দোলেন মুল সংঘটক ছিল ইসলাম ও পাকিস্তানের শত্রুপক্ষ। এরা ছিল পূর্ব পাকিস্তানের থেকে যাওয়া ধীরেন্দ্র দত্ত মনরঞ্জন ধরের ন্যায় কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ, বাঙালি কম্যুনিস্ট এবং ইসলাম থেকে দূরে বাঙালি সেক্যুলারিস্ট ও জাতীয়তাবাদীগণ। কোন ইসলামপন্থী ব্যক্তি বা দল এ আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিল না। কারণ, এ আন্দোলনের নাশকতাটি তারা শুরুতেই সঠিক ভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন। তারা এ আন্দোলনের মধ্য যে বিপদ দেখেছিলেন -তা পরবর্তীতে শত ভাগ সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। ফলে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা রূপে স্বীকৃতি দিলেও এ আন্দোলনের নাশকতা থেকে বাঙালি মুসলিমদের বাঁচানো যায়নি। ভাষা আন্দোলনকে হাতিয়ার বানিয়েই ইসলামের শত্রুপক্ষ বাঙালি মুসলিম জীবনে তাদের অনুকুলে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় জোয়ার আনে এবং বিজয়ী হয়। ১৯৪৭ সালে এরা হেরে গেলেও ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তারা তার বদলা নেয়।     

এ আন্দোলনের প্রধান রাজনৈতিক গোলপোষ্টটি ছিল প্যন-ইসলামী চেতনার ভিত্তিতে গড়ে উঠা বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান ভাঙ্গা -শুরু থেকেই যা ছিল হিন্দুত্ববাদী ভারতের প্রধান এজেন্ডা। ফলে মুসলিম উম্মাহ হারিয়েছে তার অভিভাবক রাষ্ট্র -যা অখণ্ড থাকলে আজ হতে পারতো ৪৪ কোটি জনসংখ্যার পারমানবিক শক্তি। এবং তার চালকের আসনে থাকতো বাঙালি মুসলিমরাই। কারণ বাঙালিরাই ছিল দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক। ভাষা আন্দোলনই বাঙালি জীবনে তীব্রতর করেছে জাতীয়তাবাদ, সেক্যুলার বা ফ‌্যাসিবাদের ন্যায় হারাম মতবাদের জোয়ার।

ভাষা আন্দোলনের সাংস্কৃতিক গোলপোস্ট ছিল বাঙালি মুসলিমদের সংস্কৃতিতে হিন্দুত্বায়ন। নগ্নপদে ফুল হাতে গান গেতে গেতে বেদি স্তম্ভে গিয়ে ফুল দেয়া বিশ্বের কোন মুসলিম দেশেই মুসলিম সংস্কৃতি নয়। এটি নিরেট হিন্দু সংস্কৃতি। সে হিন্দু সংস্কৃতির প্রবল স্রোতে এতকাল ভেসেছিল বাঙালি ফ্যাসিস্ট, বাঙালি সেক‌্যুলারিস্ট ও বামধারার লোকেরা। এখন সে হিন্দুয়ানী স্রোতে এখন ভাসতে দেখা যাচ্ছে ইসলামের পতাকাধারি জামায়াতে ইসলামীকেও। সেটির প্রমাণ, এবারের একুশের বেদিস্তম্ভে দলবল নিয়ে হাজির হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। ক্ষমতার নেশা তথাকথিত একটি ইসলামপন্থী দলকে ইসলাম থেকে যে কতটা দূর সরাতে পারে -জামায়াত তারই নজির পেশ করলো। তাদের মুখে এখন আল্লাহ তায়ালার সার্বভৌম শরিয়ার কথা নাই। বিজয় এখানে হিন্দু সংস্কৃতির ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের। ইসলাম থেকে এতো দূরে সরে কি ইসলামকে বিজয়ী করা যায়?   

ভাষা আন্দোলনের ধর্মীয় গোলপোস্ট ছিল বাঙালি মুসলিমদের গলা থেকে ইসলামের রশিটি ছিন্ন করা। প্যান-ইসলামী চেতনার বিলুপ্তি ঘটাতে এ আন্দোলন এতোটাই সফল হয়েছিল যে ষাট ও সত্তরের দশকে বাঙালি মুসলিম ছাত্র-ছাত্রী ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীগণ কম্যুনিজম, জাতীয়তাবাদ ও সেক্যুলারিজমের স্রোতে লাখে লাখে ভেসে যায়। জামায়াতের আমীর জনাব ডা. শফিকুর রহমানও সে স্রোতে ভাসাদেরই একজন। উনি উঠে এসেছেন জাসদ ছাত্রলীগ থেকে -যা ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্রের মিশ্রিত ধারা। তিনি যে একুশের বেদিমূলে শ্রদ্ধা দিতে হাজির হয়েছেন তার কারণ সম্ভবত এটিই, তার মধ্যে এখনো অতীতের জাসদ চেতনা বেঁচে আছে। নইলে কোন বিশুদ্ধ ইসলামী চেতনার লোক কি একুশের বেদিস্তম্ভে হাজির হতে পারে? আজ অবধি অন্য কোন জামায়াত নেতা বা মুসলিম লীগ নেতা কখনোই সেখানে হাজির হয়নি। কারণ তাদের কেউই ছাত্রলীগের স্রোতে ভাসা লোক ছিলেন না।

ভাষা আন্দোলন ও মিথ্যাচার

বাংলাদেশের ইতিহাসে অতি মিথ্যাচার হয়েছে বাংলা ভাষা ও ভাষা-আন্দোলনকে ঘিরে। ভাষা-আন্দোলন নিয়ে সবচেয়ে বড় মিথ্যাটি হলো, বাঙালির মুখের ভাষা নাকি পাকিস্তান সরকার কেড়ে নিতে চেয়েছিল। এ প্রসঙ্গে যে সত্যটিকে তারা বুঝতে রাজী নয় তা হলো, দেশের অনেকগুলি ভাষার মধ্য থেকে একটিকে রাষ্ট্র বানানোর অর্থ অন্য ভাষাগুলোকে কবরে পাঠানো নয়। বর্তমান পাকিস্তানে রয়েছে পাঞ্জাবী, সিন্ধি, পশতু, বেলুচ – এ চারটি প্রধান প্রাদেশশিক ভাষা। উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা বানানোর সে ভাষাগুলির কোনটিরই মৃত্যু হয়নি। বরং সেগুলোও সমৃদ্ধ হয়েছে। ১৯৫২ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ঢাকার সন্তান খাজা নাযিম উদ্দীন। তখন পূর্ব পাকিস্তানের মূখ্যমন্ত্রী ছিলেন আরেক বাংলাভাষী জনাব নুরুল আমীন। পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রনায়কগণ মধ্য খানে ১২ শত মাইলের ভারতীয় ভূমি দিয়ে বিভক্ত পাকিস্তানের অখণ্ডতা টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে যথেষ্ট চিন্তিত ছিলেন। দেশের অখণ্ডতা বজায়ে ভাষার বন্ধন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই বিশ্বের অধিকাংশ দেশই ভৌগলিক অখণ্ডতা বাঁচাতে একটি লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা তথা যোগাযোগের ভাষা গড়ে  তুলে। গ্রেট ব্রিটেনে ইংরেজী ভাষার বাইরে স্কটিশ, আইরিশ ও ওয়েলশ ভাষা রয়েছে। কিন্তু সকল ভাষাভাষী জনগণই ইংরাজীকে লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা রূপে গ্রহণ করেছে। তেমনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গৃহিত হয়েছে ইংরাজী। ভারতে প্রসার ও প্রতিষ্ঠা দেয়া হচ্ছে হিন্দিকে। আজকের অবশিষ্ট পাকিস্তানে উর্দু কোন প্রাদেশিক ভাষা নয়। কিন্তু সেখানকার ৪টি প্রদেশের জনগণই উর্দুকে লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা রূপে গ্রহণ করেছে। তাতে বেঁচে যাওয়া অবশিষ্ট পাকিস্তানের সংহতি মজবুত হয়েছে। পাকিস্তানের জন্মের পূর্ব  থেকেই দেশটির ভিতরে ও বাইরে প্রচুর শত্রু ছিল। তারা কখনোই চাইতো না, পাকিস্তান সৃষ্টি হোক ও বেঁচে থাকুক। ফলে তারা কখনোই চাইতো না উর্দুকে লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা করার মধ্য দিয়ে দেশটির সংহতি শক্তিশালী হোক। এরাই ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের সংহতিতে মজবুত করার চেষ্টা বানচাল করে দেয়।

বাংলাভাষা কোন কালেই রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পায়নি। পাকিস্তান সরকারই সর্বপ্রথম রাষ্ট্রভাষা রূপে বাংলাভাষাকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। এবং সেটি ১৯৫৪ সালে। বাংলা ভাষার উন্নয়নে বাংলা এ্যাকাডেমী ও বাংলা-উন্নয়ন বোর্ড প্রতিষ্ঠা এবং বিদেশী ভাষার বিপুল সংখ্যক বইয়ের বাংলায় তরজমার কাজ তখনই শুরু করা হয়। বলা যায়, বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করার কাজে সরকারি ভাবে পাকিস্তানের ২৩ বছরে যে কাজ করা হয় তা অতীতে কোন কালেই হয়নি। বাংলা ভাষার উন্নয়নে ভারতের পশ্চিম বাংলাতেও এতো সরকারি বিনিয়োগ হয়নি। অথচ সেই পাকিস্তানকে ইতিহাসে চিত্রিত করা হয়েছে বাংলা ভাষার শত্রু রূপে।

ভাষা আন্দোলন নিয়ে আরেক মিথ্যাচার হলো, দুনিয়ার আর কোথাও নাকি ভাষার নামে এতো রক্তদান হয়নি -যা হয়েছে ১৯৫২ সালে ২১ ফেব্রেয়ারীতে। অথচ হিন্দি ভাষাকে যখন দক্ষিণ ভারতের তামিলদের উপর চাপিয়ে দেয়া চেষ্টা হয়, বহুগুণ বেশী মানুষ প্রাণ দেয় সে চেষ্টা রুখতে। একই ঘটনা ঘটে আসামের কাছাড় ও করিম গঞ্জে। বহু মানুষ সেখানেও প্রাণ দেয় যখন বাংলা ভাষার উপর অসমিয় ভাষাকে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা হয়। তবে সেসব ভাষা কেন্দ্রিক আন্দোলনকে কখনোই দেশ ভাঙ্গার আন্দোলেন পরিণত হয়নি -যা হয়েছে বাংলাদেশে।

 

শহীদ শব্দের অপব্যবহার ও সাংস্কৃতিক কনভার্শন

আদর্শের জন্য প্রাণদান ইসলামে নতুন কিছু নয়। নবীজী (সা:)’র সাহাবাদের অর্ধেকের বেশী শহীদ হয়েছেন। “শহীদ” শব্দটিও এসেছে ইসলাম থেকে। শহীদদের রক্তের বরকতেই আল্লাহর রহমত প্রাপ্তি ঘটেছিল এবং নির্মিত হয়েছিল মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা। সমগ্র মুসলিম ইতিহাসে যা কিছু গর্বের তার বেশীর ভাগের নির্মাতা হলেন এই শহীদগণ। বিশ্বের সকল মুসলিমদের কাছে তাই তারা সর্বকালের পরম সম্মানের পাত্র। কিন্তু ইসলামে সম্মান প্রদর্শনেরও নিজস্ব রীতি আছে। সেটি স্তম্ভ গড়ে নয়। স্তম্ভের গোড়ায় ফুল দিয়ে স্তম্ভ পূজাও নয়। রাতে বা প্রভাতে নারী-পুরুষকে রাস্তায় নামিয়েও নয়। শহিদদের স্মৃতিতে স্তম্ভ গড়া সিদ্ধ রীতি হলে শুধু মক্কা-মদীনাতে নয়, মুসলিম বিশ্বের অসংখ্য শহরে হাজার হাজার স্তম্ভ গড়া হতো। সেসব স্তম্ভে বছরের একটি দিনে শুধু নয়, প্রতিদিন ফুল দেওয়া হতো। কিন্তু সেটি হয়নি। কারণ সেটি মুসলিম সংস্কৃতি নয়। ইসলামসিদ্ধও নয়। অথচ বাংলাদেশের নগরে বন্দরের প্রতিটি স্কুল-কলেজে বহুলক্ষ স্তম্ভ গড়ে সেটিকে আজ বাঙালির সংস্কৃতি রূপে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। এভাবে মুসলিম জীবনে শুরু হয় চরম সাংস্কৃতিক পথভ্রষ্টতা। সে সাথে চরম বুদ্ধিবৃত্তিক ভ্রষ্টতাও। তাই বাঙালি মুসলিম জীবনে শতভাগ হারাম রীতি চালু করা হয় ভাষা আন্দোলনের নামে। এতে নাশকতা ঘটে বাঙালি মুসলিমের ঈমানের ভূবনে। এভাবে খুলে দেয়া হয় জাহান্নামে পথ। বাংলাদেশীদের এরূপ সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভ্রষ্টতা সুস্পষ্ট করে দেশের ইসলামপন্থীদের চরম বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক ব্যর্থতা। ব্যর্থতা এখানে আলেমদের। দেশে মসজিদ-মাদ্রাসার সংখ্যা বিপুল হারে বেড়েছে, বেড়েছে আলেমদের সংখ্যাও। কিন্তু আলেমগণ ব্যর্থ হয়েছে দেশের জনগণকে ভয়াবহ শিরকের স্রোতে ভেসে যাওয়া থেকে বাঁচাতে।

এরূপ সাংস্কৃতিক ভ্রষ্টতা এসেছে আদর্শিক ভ্রষ্টতা থেকে। বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশে দেহব্যবসার মত ব্যভিচার যেমন আইনগত বৈধতা পেয়েছে, তেমনি বৈধতা পেয়েছে আরেক হারাম কর্ম স্তম্ভপূজা। স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের হাজির করা হচ্ছে শেখ মুজিবের মুর্তি বা ছবির সামনে। এমন সাংস্কৃতিক ভ্রষ্টতার পিছনে ভ্রষ্ট দর্শনটি হলো সেক্যুলারিজম –যার মূলকথা পরকালের ভাবনা বিলুপ্ত করে মানুষকে দুনিয়ামুখী করা। মানুষের ঢল মসজিদমুখী না করে স্তম্ভমুখী ও মুর্তিমুখী করা। বাঙালি মুসলিমদের জীবনে এভাবেই নেমে এসেছে এক ব্যাপক সাংস্কৃতিক কনভার্শন। সংস্কৃতির পথ ধরে এভাবেই চরম দুষণ ঘটেছে বাঙালি মুসলিমদের চেতনালোকে। ইসলামের শত্রুদের আজকের স্ট্রাটেজী মুসলিমদেরকে হিন্দু বানানো নয়। বরং সেটি হলো, সংস্কৃতির লেবাসে এমন সব বিশ্বাস ও রীতিনীতিতে অভ্যস্ত করা -যা ইসলামের মূল শিক্ষা থেকেই দূরে সরিয়ে নেয়। এভাবেই মুসলিমদের সরানো হচ্ছে ইসলাম থেকে। এর অনিবার্য পরিণতি হলো, শতকরা ৯০ ভাগ মুসলিমের দেশে হলো ইসলামের লাগাতর পরাজয়। সেটি রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক অঙ্গণে।
কবিরা গুনাহ’র কোরাস

মিথ্যা হলো সকল গুনাহর মা –এটি নবীজী (সা:)’র হাদীস। মিথ্যা রটানো করা তাই কবিরা গুনাহ। মিথ্যাচারি আব্দুল গাফফার চৌধুরী তার একুশে ফেব্রেয়ারি নিয়ে রচিত কবিতায় শয়তানের কালেমা পাঠকেই সেক্যুলার বাঙালির সংস্কৃতিতে পরিণত করেছে। নামাজে সুরা পাঠ না করলে যেমন নামাজ হয় না, তেমনি আব্দুল গাফফার চৌধুরীর রচিত মিথ্যাপূর্ণ কবিতাটি সমবেত ভাবে পাঠ না পারলে সেক্যুলারিস্ট বাঙালির একুশে ফেব্রেয়ারিও উদযাপিত হয়না। তার সে কবিতাটি মিথ্যাপূর্ণ কিছু লাইন নীচে তুলে ধরা হলো:

“ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রু গড়ায়ে ফেব্রুয়ারী

আমি কি ভুলিতে পারি।

জাগো নাগিনীরা জাগো নাগিনীরা জাগো কালবোশেখীরা

শিশু হত্যার বিক্ষোভে আজ কাঁপুক বসুন্ধরা,

ওদের ঘৃণ্য পদাঘাত এই সারা বাংলার বুকে

ওরা এদেশের নয়,

ওরা মানুষের অন্ন, বস্ত্র, শান্তি নিয়েছে কাড়ি

একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি।।

আজো জালিমের কারাগারে মরে বীর ছেলে বীর নারী।”

 

উক্ত কবিতা বা গানটি বহু মিথ্যায় ভরা। সেগুলির মাঝে বড় মিথ্যাটি হলো, দাবী করা হয়েছে শত মা’য়ের সন্তান হারানোর। অথচ একুশে ফেব্রেয়ারীতে নিহত হয় ৫ জন, শত জন নয়। অথচ শেখ হাসিনা বহু শত মায়ের সন্তান কেড়ে নিয়েছে ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের গণহত্যায়। আব্দুল গাফফার চৌধুরীর মধ্যে মানবতা থাকলে এবং সন্তানহারা মায়েদের প্রতি দরদ থাকলে কবিতা লেখা উচিত ছিল শাপলা চত্বরের গণহত্যা নিয়ে।

 

ইন্সটিটিউশন পূজাপালনের

জনগণের মাঝে আদর্শিক বা সাংস্কৃতিক ভ্রষ্টতা সার্বজনীন করার স্বার্থেও ইন্সটিটিউশন চাই। মুর্তিপূজার ন্যায় সনাতন অজ্ঞতা, পথভ্রষ্টতা ও মিথ্যাচার বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে মুর্তি গড়া ও এসব মূর্তির পদতলে ফুল দেওয়া হলো হিন্দুদের ধর্মীয় ইন্সটিটিউশন। সে আচার বাঁচিয়ে রাখতে বাংলার হিন্দু সমাজে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে বারো মাসে তের পার্বন। গড়া হয়েছে লক্ষাধিক মন্দির ও পূজামন্ডপ। একই আদলে বাংলাদেশের সেকুলারিষ্টগণও ভাষা আন্দোলনের নামে বাংলাদেশের নগর-বন্দরেই শুধু নয়, গ্রাম-গঞ্জেও স্মৃতিস্তম্ভের নামে বিপুল সংখ্যায় ইন্সটিটিউশন গড়ে তুলেছে। চালু করেছে স্তম্ভপূজা। বস্তুত বাংলার সেকুলারিষ্টদের এটিই হলো সবচেয়ে শক্তিশালী ইনস্টিটিউশন। একুশের নামে প্রতিবছর যে অনুষ্ঠান হয় সেগুলির মূল লক্ষ্য ভাষায় সমৃদ্ধি আনা নয়, বরং তা হলো সেক্যুলার ধারণাকে আরো প্রবলতর করা এবং সে সাথে সেগুলি দীর্ঘজীবী করা। এমনকি ২১ ফেব্রেয়ারীর বদলে বাংলা সনের ৮ ফাল্গুনও চালু করতে পারিনি। এই হলো বাংলা প্রীতির নমুনা।

ভাষায় সমৃদ্ধি আনা লক্ষ্য হলে, সে জন্য কি নগ্নপদে মিছিল করা ও স্তম্ভের বেদীমূলে নত শিরে ফুলদানের প্রয়োজন পড়ে? রাষ্ট্রভাষা রূপেও কি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন পড়ে? উর্দু ভাষা ব্রিটিশ আমলে রাষ্ট্র ভাষা ছিল না। অথচ উর্দু  বিশ্বের বুকে একটি সমৃদ্ধ ভাষা। কিন্তু সে ভাষার ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে ব্রিটিশ আমলে। উর্দু ভাষায় পবিত্র কুর’আনের বহু অনুবাদ ও বহু তফসির লেখা হয়েছে। বহু তরজমা ও বহু ব্যাখা লেখা হয়েছে হাদীস গ্রন্থগুলিরও। অসংখ্য গ্রন্থ্ লেখা হয়েছে ফিকাহ শাস্ত্র, নবী-জীবনী, সাহাবা-জীবনী, দর্শন ও ইতিহাসের উপর। সমৃদ্ধি এসেছে উর্দু প্রবন্ধ, কবিতা ও গজলে। কিন্তু বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম রাষ্ট্রে রাষ্ট্র-ভাষা রূপে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পরও বাংলা ভাষায় উন্নয়ন কতটুকু হয়েছে?