• ঢাকা |

ঈদের বাজারে রাজশাহী সিল্কের কদর, ফিরছে পুরোনো ঐতিহ্য


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ১৫ মার্চ, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

শামীম রহমান, রাজশাহী ব্যুরো: প্রতিটি উৎসবে বাঙালির পছন্দের তালিকায় সিল্ক কাপড়ের স্থান সবসময়ই বিশেষ। অন্য কাপড় যত দামিই হোক না কেন, তার সঙ্গে যদি একটি সিল্ক শাড়ি বা পোশাক থাকে, অনেক ক্রেতাই সেটিকেই আগে বেছে নেন। ফলে পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে রাজশাহীর সিল্ক কাপড়ের চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।

বিশেষ করে সামর্থ্যবান পরিবার ও সিল্কপ্রেমীদের মধ্যে ঈদের সময় এই কাপড়ের প্রতি আগ্রহ আরও বাড়ে। চলতি বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ঈদকে ঘিরে রাজশাহীর সিল্ক পণ্যের বিক্রি বাড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

সিল্ক কাপড়ের জন্য রাজশাহী দীর্ঘদিন ধরেই দেশের মানুষের কাছে বিশেষভাবে পরিচিত। এ কারণেই রাজশাহীকে বলা হয় ‘রেশম নগরী’। এই নামেই চলাচল করছে “সিল্কসিটি এক্সপ্রেস” নামের আন্তঃনগর ট্রেন।

বর্তমানে রাজশাহী রেশম কারখানায় সরকারি তত্ত্বাবধানে কাপড় উৎপাদন করা হচ্ছে এবং তা বিক্রি করা হচ্ছে কারখানার নিজস্ব শোরুমে। এখান থেকে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা কাপড় কিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাচ্ছেন। এমনকি ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকেও ব্যবসায়ীরা রাজশাহীতে এসে সিল্ক কাপড় সংগ্রহ করছেন।

বাংলাদেশে সিল্ক শিল্পের সূচনা হয় রাজশাহীতেই। ১৯৫২ সালে সরকারি উদ্যোগে রাজশাহী সিল্কের যাত্রা শুরু হয়। পরে ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রাজশাহী রেশম কারখানা। ১৯৭৮ সালের পর এটি বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে আসে।

তবে দীর্ঘদিন লোকসানের মুখে পড়ে ২০০২ সালের ৩০ নভেম্বর কারখানাটি বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় ১৬ বছর বন্ধ থাকার পর ২০১৭ সালের শেষ দিকে পরীক্ষামূলকভাবে এটি পুনরায় চালু করা হয়।

কারখানা চালুর পর এর ৪২টি লুম মেরামত করা হয়। বর্তমানে ১৯টি লুমে ৪১ জন শ্রমিক ও তাঁতি কাজ করছেন। কারখানার সঙ্গে সংযুক্ত শোরুমটিও পুনরায় চালু করা হয়েছে, যেখানে সরকারি উৎপাদিত বিভিন্ন সিল্ক পোশাক বিক্রি করা হচ্ছে।

রেশমের গুটি থেকে সুতা তৈরি করা হয়। বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ড তুঁত চাষের মাধ্যমে রেশমের গুটি উৎপাদন করে। পরে সেই গুটি মিনিফিলেচার কেন্দ্রে নিয়ে সুতায় রূপান্তর করা হয়।

কারখানা চালুর পর চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ৫৭ হাজার ৩৬৬ মিটার কাপড় উৎপাদন করা হয়েছে। বর্তমানে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২৫০ মিটার কাপড় উৎপাদন হচ্ছে।

কারখানার শোরুমে বিভিন্ন দামে সিল্কের পোশাক বিক্রি হচ্ছে। গরদের শাড়ি বিক্রি হচ্ছে প্রায় সাড়ে আট হাজার টাকায়। প্রিন্টেড শাড়ি পাওয়া যাচ্ছে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার টাকায়। নারীদের টু-পিস বিক্রি হচ্ছে প্রায় তিন হাজার ৮৯০ টাকায়। এছাড়া স্কার্ফ, হিজাব, ওড়না এবং টাইয়ের কাপড়সহ বিভিন্ন ধরনের সিল্ক পণ্যও বিক্রি করা হচ্ছে।

এ ছাড়া গজ হিসেবে কাপড়ও বিক্রি করা হচ্ছে, যা দিয়ে শার্ট, পাঞ্জাবি বা নারীদের ওয়ানপিস তৈরি করা যায়। এসব কাপড়ের দাম প্রতি গজ ৮৫০ থেকে এক হাজার টাকার মধ্যে।

রেশম সুতার দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০০৫ সালে এক কেজি সুতার দাম ছিল প্রায় এক হাজার টাকা। বর্তমানে সেই সুতার দাম দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে সাত হাজার টাকা।

রেশম শিল্পের উন্নয়নে সরকার বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। সুতার উৎপাদন বাড়াতে প্রতি বছর তুঁতগাছ লাগানো হচ্ছে। কয়েক বছরের মধ্যে দেশি সুতায় শতভাগ রেশম উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।

রাজশাহী সিল্ক ইতোমধ্যে দেশের একটি জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ফলে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ও ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়লে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আরও বিকশিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজশাহী রেশম কারখানার অপারেশন ইনচার্জ সাইদুল ইসলাম টুটুল বলেন, " বর্তমানে ১৯টি লুমে কাপড় উৎপাদন চলছে। তবে লুমগুলো অনেক পুরনো হওয়ায় উৎপাদনের গতি কিছুটা ধীর। তারপরও প্রতিদিন গড়ে ৫ থেকে ১০ গজ কাপড় উৎপাদন করা হচ্ছে।"

বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ডের উপপরিচালক তরিকুল ইসলাম জানান, " রেশম শিল্পের উন্নয়নে নতুন প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। প্রায় ১৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে এই শিল্প আরও এগিয়ে যাবে। ভবিষ্যতে রাজশাহী সিল্ককে আবারও দেশের একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।"