ভোলা প্রতিনিধি: ভোলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে বিগত নিয়োগ, বদলি, বিদ্যুৎ যন্ত্রাংশ ক্রয় ও আর্থিক লেনদেন ঘিরে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের প্রেক্ষাপটে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দ্রুত বদলির দাবি উঠেছে।
২৫ এপ্রিল (শনিবার ) সমিতির একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ দাবি জানিয়েছেন।
তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একই এলাকায় বদলি ছাড়া দায়িত্ব পালনকে কেন্দ্র করে বিদ্যুৎ কর্মকর্তাদের একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এই চক্রের কারণে কর্মপরিবেশে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
ঢাকাস্থ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) অর্থ ও হিসাব বিভাগ সংশ্লিষ্ট জনৈক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে এবং ভোলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির হিসাব শাখার কর্মকর্তাদের মধ্যে সম্পর্কের ভিত্তিতে একটি প্রভাবশালী বলয় তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী জানান, এই প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে জোনাল ও সাব-জোনাল কার্যালয়ে বদলির ভয় দেখানো হয়। ফলে পুরো অফিসে এক ধরনের ভীতি বিরাজ করছে।
এ ছাড়া সমিতির তহবিল ও বিভিন্ন বিনিয়োগ, নিম্নমানের বিদ্যুৎ যন্ত্রাংশ ক্রয় সংক্রান্ত বিষয়েও এ সিন্ডিকেটের প্রভাব বিস্তার রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকারি কোষাগারে অর্থ জমা দেওয়ার ক্ষেত্রেও অনিয়ম হচ্ছে বলে একাধিক সূত্র দাবি করেছে। একটি সূত্র জানায়, নির্ধারিত ব্যাংকিং প্রক্রিয়ার বাইরে অর্থ লেনদেনের ঘটনাও ঘটছে।
অভিযোগকারীরা বলেন, আর্থিক খাত কার্যত একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দ্রুত বদলির ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলে মনে করেন তারা।
এদিকে, পবিসের ভূতপূর্ব জেনারেল ম্যানেজারকে এখান থেকে অন্যত্র বদলি হতে বাধ্য করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। কথিত আছে, ভূতপূর্ব জেনারেল ম্যানেজার এক বছর সাত মাস যেতে না যেতেই অত্র পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সিন্ডিকেটের দৌরাত্বের শিকার হন। বিদ্যমান সেন্ডিকেটের জ্বালা যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে শেষ পর্যন্ত তিনিও নিজের ট্রান্সফারের জন্য নিজেই কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করলে তাকে এখান থেকে সিলেট শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) সরিয়ে দেওয়া হয়।
সূত্রগুলো আরও অভিযোগ করে বলেন, অত্র পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের কোষাধক্ষ্য মাহবুব তার নিজ জেলা ভোলাতে পাঁচ বছরের অধিক চাকুরী করছেন। মনে হচ্ছে বদলি সংক্রান্ত পল্লী বিদ্যুৎ আইন তার জন্য প্রযোজ্য নয়। তার সাথে মহরম মহরমে সময় কাটায় বর্তমান এজিএম অর্থ'। চলমান চক্রের হোতা হিসেবে এভাবেই পরিচিতি লাভ করেন তারা।
অভিযোগ রয়েছে, বিগত নিয়োগ প্রক্রিয়ায় লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় প্রভাব খাটানোর মত ঘটনাও। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও উঠেছে। পাশাপাশি প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে প্রতিষ্ঠানে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কথাও বলা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এমত অবস্থায় ভবিষ্যতে তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তীতে প্রকাশ করা হবে।
এদিকে চরফ্যাশন জোনাল অফিসের আওতাধীন জাহাঙ্গীর নামের এক ভুক্তভোগী হাঁটু গেড়ে বছর-বছর পল্লী বিদ্যুতে চেয়ার দখল করে বসে থাকা কর্মকর্তাদের ট্রান্সফারের দাবি জানান। এ সময় তিনি অভিযোগ করে বলেন, এলাকার বসতবাড়ি ও ফলবান বাগানের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যুৎ লাইন স্থানান্তরের জন্য লিখিত আবেদন নিয়ে অফিসের দ্বারে দ্বারে ঘুরলেও বিদ্যুৎ লাইন বা খুঁটি স্থানান্তরে মোটা অংকের অর্থের দাবি বিদ্যবান সিন্ডিকেটের নিত্য দৌরাত্বের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে পল্লী বিদ্যুতের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে প্রাণ হারালে ওই পরিবারের কাউকে মৃত কর্মচারীর পোষ্য বিবেচনায় নিয়োগে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা থাকলেও চলমান সিন্ডিকেট বিভিন্ন সুবিধা ভোগ করে বাহির থেকে নিয়োগ দিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই সিন্ডিকেটের মর্জির উপর খেয়াল খুশি মত নিয়োগ হচ্ছে "কাজ আছে অর্থ আছে, কাজ নেই অর্থ নেই " এমন প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন কর্মচারী। এ প্রসঙ্গে ভুক্তভোগী মুন্নি আক্তার অভিযোগ করে বলেন, আমার স্বামী পল্লী বিদ্যুতের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে প্রাণ হারায়। স্বামীর পোষ্য হিসেবে আমাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, "কাজ নেই অর্থ নেই" এমন একটি প্রকল্পে। মুনি আক্তার অভিযোগ করে বলেন, ভোলা পল্লী বিদ্যুতে বিদ্যবান সিন্ডিকেটের দৌড়াত্মের কারণে আমাকে চাকরি হারাতে হয়। আমি এখন একটি বাচ্চা নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছি। এ প্রসঙ্গে মুন্নি আক্তার সিন্ডিকেটের সাথে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরকে দ্রুত ট্রান্সফারের দাবি জানান।
বিদ্যুৎ লাইনের এই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা এবং জনদুর্ভোগের বিষয়ে জানতে ভোলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বর্তমান জেনারেল ম্যানেজার -এর সাথে যোগাযোগ করলে তিনি পরবর্তীতে অভিযোগের বিষয়ে তথ্য দিবেন বলে জানিয়েছেন।
ভোলার সাধারণ মানুষ পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে বছরের পর বছর ধরে হাঁটু গেড়ে বসে থাকা সিন্ডিকেটের সদস্যদেরকে দ্রুত ট্রান্সফার করে ভোলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিকে স্বচ্ছ ও সচল রাখার ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।