নিম্নমানের বালু ও তদারকির ঘাটতির অভিযোগ
জেলা প্রতিনিধি, ভোলা: উপকূল রক্ষায় প্রায় ১ হাজার ১৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন টেকসই বেড়িবাঁধে বারবার ধস ও বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হওয়ায় উদ্বেগ দেখা দিয়েছে ভোলার মনপুরায়। নির্মাণকাজ এখনো শেষ হয়নি, অথচ সামান্য বৃষ্টিতেই বাঁধের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেড় লাখের বেশি উপকূলবাসীর মধ্যে দেখা দিয়েছে আতঙ্ক।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, মূল ঠিকাদারের পরিবর্তে সাব-ঠিকাদারের মাধ্যমে কাজ করানো এবং পর্যাপ্ত তদারকির অভাবেই নির্মাণাধীন বাঁধের বিভিন্ন অংশ বারবার ধসে পড়ছে। তাদের আশঙ্কা, নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই যদি বাঁধের এমন দুরবস্থা হয়, তাহলে জলোচ্ছ্বাস কিংবা বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাঁধের স্থায়িত্ব নিয়ে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মঙ্গল ও বুধবারের টানা বৃষ্টির পর মনপুরা উপজেলার হাজিরহাট ইউনিয়নের ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডসংলগ্ন পশ্চিম পাশের নির্মাণাধীন বেড়িবাঁধের একটি অংশ ধসে পড়ে। ধসে পড়া বালু পাশের এক কৃষকের আমন ধানের খেতে গিয়ে পড়ায় তার ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তবে এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়। স্থানীয়দের দাবি, গত দেড় মাসে প্রকল্পের বিভিন্ন অংশে একই ধরনের ধস ও গর্ত তৈরির ঘটনা ঘটেছে। সরেজমিনে মনপুরা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড, হাজিরহাট ইউনিয়নের ২, ৩ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ড এবং দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নের সূর্যমুখী এলাকায় নির্মাণাধীন বাঁধের বিভিন্ন স্থানে ধস ও বড় গর্তের চিত্র দেখা গেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত ইলিয়াস সহ স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বাঁধ নির্মাণে নিম্নমানের বালু ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই বাঁধের বিভিন্ন অংশে ধস নামছে। স্থানীয়দের দাবি, নির্মাণকাজে ব্যবহৃত উপকরণের মান এবং কাজের গুণগত মান নিয়মিতভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
পরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্দেশে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এস্কেভেটর দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অংশে জরুরি মেরামতের কাজ শুরু করে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভোলা জেলার মুজিবনগর ও মনপুরা উপকূলীয় বাঁধ পুনর্বাসন, নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং তীর সংরক্ষণের লক্ষ্যে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। প্রায় ৫০ দশমিক ৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ১৭০ কোটি টাকা। প্রকল্পের কাজ করছে ছয়টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান—এনবিই, ওটিবিএল, জিসিএল, এলএকে এসএসএ, পিডিএল ও ওয়েস্টার্ন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক ক্ষেত্রে সাব-ঠিকাদারের মাধ্যমে কাজ করাচ্ছে। এতে নির্মাণকাজের মান নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাদের আশঙ্কা, সময়মতো মানসম্মতভাবে কাজ সম্পন্ন না হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের দুর্যোগে বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হতে পারে।
এদিকে স্থানীয়রা জানান, গত বছর বাঁধ নির্মাণে অনিয়মের প্রতিবাদ করতে গিয়ে ছাত্রদল নেতা রাশেদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। একই বছর নির্মাণাধীন বাঁধের গর্তে পড়ে ১০ বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়। ফলে বাঁধের নির্মাণকাজে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন তারা।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী মো. তুহিন বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো দ্রুত মেরামত করা হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীদের তত্ত্বাবধানেই নিয়ম মেনে নির্মাণকাজ পরিচালনা করা হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড ডিভিশন-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসফাউদ্দৌলা বলেন, প্রকল্পটির নির্মাণকাজ এখনো চলমান। বৃষ্টির কারণে কিছু স্থানে ধসের সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো দ্রুত সংস্কারের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ৮ জুলাই পর্যন্ত ধসে যাওয়া অংশ ইতোমধ্যে মেরামত করা হয়েছে। প্রকল্পটির নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হতে ২০২৭ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন—হাজার কোটি টাকার এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই যদি বাঁধের বিভিন্ন অংশে বারবার ধস নামে, তাহলে কাজ শেষ হওয়ার পর বাঁধটি কতটা টেকসই হবে?
উপকূলবাসীর দাবি, প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে নির্মাণসামগ্রীর মান যাচাই, নিয়মিত কারিগরি তদারকি এবং অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো দ্রুত ও স্থায়ীভাবে সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন তারা।