• ঢাকা |

সৌদি অর্থায়নে ৫ হাজারের বেশি মানুষকে বিনামূল্যে চক্ষুসেবা, ৫৮৬ জনের ছানি অস্ত্রোপচার


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ১৮ অক্টোবর, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

এমএম রহমতুল্লাহ: রংপুরের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিতে মানবিক উদ্যোগ নিয়েছে সৌদি আরবের দুটি প্রতিষ্ঠান। সৌদি আরবের কিং সালমান হিউম্যানিটারিয়ান এইড অ্যান্ড রিলিফ সেন্টার (কেএসরিলিফ) ও আল-বাসার ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে পরিচালিত সাত দিনের বিশেষ চক্ষু চিকিৎসা কার্যক্রমে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা পেয়েছেন ৫ হাজার ১৪ জন। এ সময় ছানি আক্রান্ত ৫৮৬ জনের অস্ত্রোপচার করা হয়েছে।
রংপুরের মক্কা আই হাসপাতালে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে রোগীদের চোখ পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ, ওষুধ ও পড়ার চশমা বিনামূল্যে দেওয়া হয়। আর্থিক সংকটের কারণে যাঁদের পক্ষে বিশেষায়িত চক্ষু চিকিৎসা নেওয়া কঠিন, তাঁদের জন্য এ উদ্যোগ নতুন আশার আলো দেখিয়েছে।
সৌদি আরবের অর্থায়নে পরিচালিত এ মানবিক কার্যক্রম দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের জনকল্যাণমূলক সহযোগিতার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। বিশেষ করে প্রত্যন্ত ও স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
রোববার আরব নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আল-বাসার ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশনের বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর ডা. আহমেদ তাহের হামিদ আলী জানান, সাত দিনের এ কর্মসূচিতে ৫ হাজার ১৪ জন রোগী বিনামূল্যে চক্ষু পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ, ওষুধ ও পড়ার চশমা পেয়েছেন। পাশাপাশি সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে ৫৮৬টি ছানি অস্ত্রোপচার।
তিনি বলেন, রংপুর অঞ্চলে ছানি ও বয়সজনিত অন্যান্য দৃষ্টিসংক্রান্ত সমস্যা এখনো বড় উদ্বেগের বিষয়।
কর্মসূচিতে কেএসরিলিফের তিনজন স্বেচ্ছাসেবী সৌদি চিকিৎসক স্থানীয় হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে কাজ করেন। তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় স্বল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক রোগীকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব হয়।
উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জনপদ রংপুরের অনেক পরিবার সীমিত আয়ে জীবনযাপন করে। এসব পরিবারের জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ এবং অস্ত্রোপচারের ব্যয় বহন করা প্রায়ই কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ছানি অস্ত্রোপচারের খরচ জোগাড় করতে না পেরে অনেক রোগী দীর্ঘদিন চিকিৎসার বাইরে থাকেন।
অথচ চোখের সমস্যা শুধু দৃষ্টিশক্তি কমিয়ে দেয় না, মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন, কর্মক্ষমতা ও পরিবারের ওপর নির্ভরতাকেও প্রভাবিত করে। যাঁরা দিনমজুরি কিংবা শারীরিক শ্রমের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন, তাঁদের জন্য দৃষ্টিশক্তি হারানো বা কমে যাওয়া আরও বড় সংকট তৈরি করতে পারে। এতে আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি দৈনন্দিন কাজকর্মেও অন্যের সহযোগিতা নেওয়ার প্রয়োজন হয়।
এ বাস্তবতায় বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা কার্যক্রমটি অসচ্ছল মানুষের জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। অর্থের অভাবে যাঁরা অস্ত্রোপচার পিছিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন, তাঁদের অনেকে এ কর্মসূচির মাধ্যমে চিকিৎসার সুযোগ পেয়েছেন। সময়মতো ছানি অস্ত্রোপচার হলে অনেক রোগীর কার্যকর দৃষ্টিশক্তি ফিরে আসতে পারে, যা তাঁদের স্বাধীনভাবে চলাফেরা ও স্বাভাবিক কাজে ফেরার সুযোগ তৈরি করে।
এ কর্মসূচির অন্যতম উপকারভোগী ৫৫ বছর বয়সী চায়না বেগম। ছানি অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হলেও অর্থের অভাবে দীর্ঘদিন তা করাতে পারেননি তিনি। চিকিৎসকেরা তাঁকে আগেই অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু অস্ত্রোপচার ও প্রয়োজনীয় ওষুধের খরচ জোগাড় করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি।
সৌদি অর্থায়নে পরিচালিত এ উদ্যোগে অবশেষে বিনামূল্যে অস্ত্রোপচার করানোর সুযোগ পান তিনি। চিকিৎসা পেয়ে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ায় দৈনন্দিন কাজকর্ম ও পরিবারের দেখাশোনা আগের তুলনায় সহজ হবে বলে আশা করছেন চায়না বেগম।
সৌদি আরবের সহযোগিতার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, চিকিৎসক তাঁকে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে সেবা দিয়েছেন।
চায়না বেগম বলেন, “চিকিৎসককে খুবই বিনয়ী ও আন্তরিক মনে হয়েছে। তিনি আমাকে মায়ের মতো সম্মান করেছেন।”
তিনি জানান, অস্ত্রোপচারে প্রায় ৩০ মিনিট সময় লেগেছে এবং এতে প্রায় কোনো ব্যথাই অনুভব করেননি। অস্ত্রোপচারের পর তাঁকে বিনামূল্যে ওষুধ ও চশমাও দেওয়া হয়েছে।
চায়না বেগমের অভিজ্ঞতা দেশের প্রত্যন্ত ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা এলাকার অনেক মানুষের বাস্তবতাকে তুলে ধরে। কোথাও চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান থাকলেও ব্যয়বহুল চিকিৎসা, যাতায়াত খরচ ও ওষুধের দাম অনেক সময় দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসা নেওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে চিকিৎসা করানোর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অনেকে প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হন।
ডা. আহমেদ তাহের হামিদ আলী বলেন, রংপুর বিভাগের অনেক মানুষের পক্ষে বিশেষায়িত চক্ষু চিকিৎসার ব্যয় বহন করা সহজ নয়। সরাসরি জনগোষ্ঠীর কাছে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার ফলে এমন অনেক রোগী উপকৃত হয়েছেন, যাঁরা অন্যথায় দীর্ঘদিন চোখের সমস্যায় ভুগতে পারতেন।
তিনি সৌদি স্বেচ্ছাসেবী চিকিৎসকদের অবদানের কথাও তুলে ধরেন। তাঁর মতে, এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানবিক সহযোগিতাকে কাজে লাগিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে মক্কা আই হাসপাতালের এ সহযোগিতা স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবাব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতেও সহায়ক হয়েছে। বিদেশি চিকিৎসকদের দক্ষতা, স্থানীয় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের অভিজ্ঞতা এবং হাসপাতালের বিদ্যমান অবকাঠামো একত্রে কাজে লাগিয়ে অল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক রোগীকে সেবা দেওয়া গেছে।
বাংলাদেশে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য চিকিৎসাব্যয় এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে বড় শহরের বাইরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও অস্ত্রোপচারের সুযোগ সীমিত হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। এ কারণে চক্ষু পরীক্ষা থেকে শুরু করে রোগ নির্ণয় ও অস্ত্রোপচার পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সেবা সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চোখের রোগের ক্ষেত্রে সময়মতো পরীক্ষা ও চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন চিকিৎসা না করালে অনেক রোগীর স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হতে পারে। তাই অসচ্ছল মানুষের জন্য বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে চক্ষু চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
রংপুরের সাত দিনের এ কর্মসূচিতে ৫ হাজার ১৪ জন রোগীর চিকিৎসাসেবা গ্রহণ এবং ৫৮৬টি ছানি অস্ত্রোপচার তাৎক্ষণিকভাবে বহু মানুষের উপকারে এসেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের সেবার সুফল ধরে রাখতে নিয়মিত চক্ষু পরীক্ষা, চিকিৎসার ধারাবাহিকতা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী সেবা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
চায়না বেগমের মতো যাঁরা অর্থের অভাবে দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিতে পারেননি, তাঁদের কাছে এ উদ্যোগ কেবল একটি চিকিৎসা কর্মসূচি নয়; বরং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার নতুন সুযোগ। দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার মাধ্যমে একজন মানুষ যেমন নিজের কাজ নিজে করার সক্ষমতা ফিরে পেতে পারেন, তেমনি পরিবারের ওপর নির্ভরতাও কমাতে পারেন।
সব মিলিয়ে সৌদি আরবের অর্থায়নে পরিচালিত এ মানবিক উদ্যোগ বাংলাদেশের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। বিনামূল্যে চিকিৎসা, ওষুধ ও চশমা বিতরণের পাশাপাশি শত শত মানুষের ছানি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে কর্মসূচিটি প্রমাণ করেছে, লক্ষ্যভিত্তিক মানবিক সহায়তা ও স্থানীয় স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে।