নিজস্ব প্রতিনিধি: ১১ দলীয় জোট সমর্থিত ও জামায়াতে ইসলামী মনোনীত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী ড. আব্দুল মান্নানের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে বুড়িগঙ্গা রিভারভিউ রেস্টুরেন্টে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি ড. আব্দুল মান্নান জনতার সামনে ইশতেহার ঘোষণা করেন।
‘‘আর নয় অবহেলা, আধুনিক হবে পুরান ঢাকা’’ স্লোগানে ১৪ দফার ভিত্তিতে ড. মান্নান ইশতেহার ঘোষণা করেন। ইশতেহারের দফা গুলো হচ্ছে-
১. পুরান ঢাকার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ: ঢাকা-৬ আসনের ঐতিহাসিক স্থাপনা ও পার্কসমূহের সংস্কার ও সংরক্ষণ, পুরান ঢাকার স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষায় পৃষ্ঠপোষকতা এবং বুড়িগঙ্গা নদীর পাড় দখলমুক্ত করে মেরিন ড্রাইভ-এর আদলে নদীর তীরকে কেন্দ্র করে একটি অর্থনৈতিক ও পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
২. দুর্নীতি, চাঁদাবাজ, মাদক নির্মূল ও জননিরাপত্তা: মাদক ও কিশোর গ্যাং এর বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' নীতি, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি নির্মূলে স্বাধীন জাতীয় মনিটরিং সেল গঠনে সংসদে সক্রিয় ভূমিকা পালন, অপরাধপ্রবণ সড়কগুলোতে পর্যাপ্ত সিসি ক্যামেরা স্থাপন ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য স্থানীয় প্রশাসন, পঞ্চায়েত, সিভিল সোসাইটি ও ধর্মীয় নেতাদের সমন্বয়ে ওয়ার্ড ভিত্তিক কমিটি গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
৩. শিল্প ও ব্যবসা বাণিজ্য: আগামী ৩ বছর সকল শিল্পে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির চার্জ না বাড়ানো, ব্যবসায়ীদের জন্য লাইসেন্স, ভ্যাট, ট্যাক্সসহ যাবতীয় সমস্যা সমাধানে অনলাইন ও ওয়ান-স্টপ সার্ভিস, নতুন উদোক্তা তৈরীর জন্য একটি বিজনেস ইনোভেশন হাব প্রতিষ্ঠা এবং শ্রমিকদের স্বার্থ সংরক্ষণ ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
৪. সামাজিক নিরাপত্তা ও দারিদ্র বিমোচন: সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচী নিরপেক্ষভাবে বাস্তবায়ন ও মনিটরিং করতে মসজিদ কমিটি, পঞ্চায়েত ও সিভিল সোসাইটির সমন্বয়ে একটি কমিটি গড়ে তোলা, স্বল্প আয় ও বস্তিবাসীদের আবাসন সমস্যা সমাধান এবং জীবন-মান উন্নয়নে বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা, স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের সামাজিক মর্যাদা, আবাসিক সমস্যা ও জীবন-মান উন্নয়নে উদ্যোগ গ্রহণ এবং পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের সামাজিক মর্যাদা, আবাসিক সমস্যা ও জীবন-মান উন্নয়নে উদ্যোগ।
৫. শিক্ষা: ঢাকা-৬ এলাকায় ঝুঁকিপূর্ন স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাগুলো সংস্কার ও আধুনিকায়ন নিশ্চিত করা, শিক্ষকদের বেতন, মর্যাদা ও উন্নত মানের প্রশিক্ষণের জন্য জাতীয় সংসদে সক্রিয় ভূমিকা পালন, দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাবৃত্তি চালু, Specialized Skills Worker তৈরীর জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, গ্রাজুয়েশন শেষে শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণকালীন আর্থিক সহায়তা হিসেবে সর্বোচ্চ দুই বছর মাসিক দশ হাজার টাকা সুদমুক্ত ঋণ (কর্জে হাসানা) প্রদান এবং শিক্ষিত যুবকদের জন্য আইটি পার্ক প্রতিষ্ঠা এবং ফ্রিল্যান্সিং পেশায় উৎসাহিত করতে উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
৬. স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা: ঢাকা-৬ আসনে একটি আধুনিক সরকারি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ, পার্কগুলোতে বিনামূল্যে প্রাইমারি হেলথ চেকাপ, ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে বয়স্ক, ৫ বছরের নিচে শিশু ও সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং কর্মজীবী মায়েদের সন্তানদের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক ডে-কেয়ার সেন্টার চালু উদ্যোগ গ্রহণ।
৭. অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও পরিকল্পিত নগরায়ন: ঢাকা-৬ এলাকার অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে রাস্তা সংস্কার ও প্রশস্ত, যানজট নিরসনে চক্রাকার ই-কার ও ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দোকানের স্থায়ী সমাধান, ফুটপাতসমূহ দখলমুক্ত, জলাবদ্ধতা প্রতিরোধে ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ ও মশক নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ এবং ব্যবসায়ীদের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে আবাসিক এলাকার রাসায়নিক গুদামগুলি নির্ধারিত নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
৮. পরিবেশ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: "সবুজ ঢাকা-৬" গড়ার লক্ষ্যে ছাদকৃষি ও উল্লম্ব বাগান তৈরিতে নাগরিকদের উৎসাহিত ও প্রযুক্তিগতভাবে সহায়তা, দখলকৃত সকল পার্ক ও উন্মুক্ত মাঠ উদ্ধার, দূষণরোধ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষিত জনবল ও আধুনিক সরঞ্জাম নিয়োগের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
৯. নারী ও শিশু: পাবলিক প্লেসে নারী সহায়ক ব্রেস্টফিডিং কর্ণার, প্রার্থনা স্থান ও স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট নির্মাণ, শিক্ষিত নারীদের আইটি ও ফ্রিল্যান্সিংয়ে দক্ষ করতে আধুনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, নতুন উদ্যেক্তা তৈরিতে জামানতবিহীন, সুদমুক্ত ঋণ সহায়তা ও ব্যবসায়িক লাইসেন্স প্রাপ্তিতে বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত, এবং শিশুদের জন্য বিনোদনের সুযোগ সম্প্রসারণে উদ্যোগ গ্রহণ।
১০. যুব, ক্রীড়া ও বিনোদন: ঢাকা-৬ আসনের অভ্যন্তরে দখলকৃত সকল খেলার মাঠ ও পার্ক উদ্ধার, একটি ক্রীড়া একাডেমি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া, কমিউনিটি সেন্টারকে বহুমুখী কার্যক্রমের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা, ডিজিটাল লাইব্রেরি, পাঠকক্ষ, আধুনিক ব্যায়ামাগার এবং শিল্প-সংস্কৃতি চর্চার জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
১১. প্রবাসী ও কর্মসংস্থান: আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের জন্য দক্ষ জনশক্তি প্রস্তুত ও রপ্তানি করার লক্ষ্যে Global Skills Development Hub স্থাপন এবং একটি ইনকিউবেশন সেন্টার প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
১২. ডিজিটাল পরিসেবা, তথ্য ও প্রযুক্তি: প্রতিটি ওয়ার্ডে ডিজিটাল সরকারি নাগরিক সেবা কেন্দ্র স্থাপন ও যথাযথ মনিটরিং, নাগরিকদের বিভিন্ন সমস্যা, অভিযোগ ও প্রস্তাবনা সরাসরি সংসদ সদস্যের নিকট পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে একটি বিশেষায়িত মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করা।
১৩. সামাজিক সম্প্রীতি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন: ধর্মীয় অধিকার এবং সহাবস্থান নিশ্চিত করা; মসজিদ, মন্দির, গির্জাসহ সকল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ধর্মীয় নেতাদের সন্মানজনক সন্মানীর ব্যবস্থা করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
১৪. সুশাসন ও জবাবদিহিতা: ঢাকা-৬ আসনের নাগরিকদের অভিযোগ গ্রহণ ও সেবা প্রদানের জন্য সংসদ সদস্যের একটি স্থায়ী কার্যালয় স্থাপন করা, প্রতি তিন মাস অন্তর অন্তর ওয়ার্ড ভিত্তিক নাগরিকদের সাথে মতবিনিময় করা হবে এবং কাজের রিপোর্ট উপস্থাপন করা এবং সকল প্রকার দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও বৈষম্য নির্মূল করে একটি স্বচ্ছ জবাবদিহিমূলক এবং জনবান্ধব প্রশাসন নিশ্চিত করতে উদ্যোগ গ্রহণ।
ড. আব্দুল মান্নান বলেন, লাল সবুজের পতাকা হৃদয়ে এঁকে জুলাই-আগস্ট গণ অভ্যুত্থানের চেতনায় ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠাই আমার স্বপ্ন। এই স্বপ্নপূরণে এবং মানবিক ও বসবাসযোগ্য ঢাকা-৬ গড়ে তুলতে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে আপনাদের সকলের সহযোগিতা সমর্থন ও দোয়া কামনা করছি। যে কোনো বিপদে আপদে, আন্দোলন-সংগ্রামে, অধিকার আদায়ে, সুখে দুঃখে জনগণের পাশে থাকার অঙ্গীকার ব্যত্যয় করে ড. মান্নান বলেন, দীর্ঘ ১৬ বছরের আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনের কবল থেকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আমরা মুক্ত হয়েছি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করা সকল শহীদ ও গাজিকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। মহান মুক্তিযুদ্ধের সকল শহীদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও নির্যাতিতদেরও গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি যাদের ত্যাগের বিনিময়ে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র পেয়েছি। আমাদের নৈতিক দায়িত্ব বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা। আদিপত্যবাদের কাছে কোনো অবস্থাতেই আপোস না করাই জামায়াতে ইসলামীর অঙ্গীকার।
তিনি আরও বলেন, ৩টি মূলনীতির (সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার) জন্য বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, স্বাধীনতার পর থেকেই সেই আদর্শের পথে আমাদের যাত্রা বারবার বিঘ্নিত হয়েছে। স্বাধীনতা পরবর্তী 'বাকশাল' প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একদলীয় শাসন প্রবর্তন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ এবং সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন করায় গণতান্ত্রিক ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে একের পর এক সামরিক ও স্বৈরশাসনের পালাবদলে দেশের গণতন্ত্র ও আইনের শাসন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। গত দেড় দশকে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থায় সেই ধ্বংসযজ্ঞ চূড়ান্ত রূপ নেয়। বিরোধী দল ও ভিন্নমত দমন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ, বিচারবহির্ভূত গুম-খুন, ব্যাপক দমন-পীড়ন ও আতঙ্কের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এছাড়া, ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ পাচার, দুর্নীতির করাল গ্রাসে অর্থনীতির ভীত নষ্ট, প্রশাসনিক ও বিচার বিভাগকে দলীয়করণ এবং সর্বোপরি মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো বিপন্ন করা হয়েছে। গত ৫৪ বছরে আমরা দেখেছি কীভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় স্বার্থে ব্যবহৃত হয়েছে, স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল চেতনা লঙ্ঘন করা হয়েছে। ফলে একটি বৈষম্যমূলক সমাজ গঠিত হয়। এই বৈষম্যমূলক সমাজ ব্যবস্থা ভেঙ্গে দিয়ে একটি মানবিক ও কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা জামায়াতে ইসলামীর অন্যতম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে। এখন সময় এসেছে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সেই আদর্শের বাংলাদেশ গড়ার, যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়ে ৭১ ও ২৪ এ শহীদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল। আমাদেরকে স্বাধীনতার মূলে ফিরে যেতে হবে, একটি জবাবদিহিমূলক ও স্বচ্ছ সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে, সকল প্রকার দুর্নীতি ও স্বৈরতন্ত্রের মূলোৎপাটন করতে হবে এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে সচেষ্ট হতে হবে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান আমাদের শক্তি যেন বৃথা না হয়, সে লক্ষ্যে আমরা সকল নাগরিকের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি গণতান্ত্রিক, অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছ ও সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক কল্যাণকর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর।
ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের অফিস সেক্রেটারি ও ঢাকা-৬ আসন কমিটির পরিচালক কামরুল আহসান হাসান, মহানগরী দক্ষিণের মহিলা বিভাগের সহকারী সেক্রেটারি যথাক্রমে মাহবুবা খাতুন শরিফা ও ডা. শাহানা পারভীন লাভলী। এছাড়াও ১১ দলীয় জোটের স্থানীয় বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীল নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।