কল্লোল আহমেদ, সাংবাদিক: সাংবাদিকতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রাষ্ট্রের দুটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একটি তথ্য তুলে ধরে, অন্যটি আইন প্রয়োগ করে। কিন্তু যখন সাংবাদিক ও পুলিশের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি, হয়রানি বা বিতর্কের ঘটনা ঘটে, তখন তা শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং সংশ্লিষ্ট পেশার মর্যাদাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সম্প্রতি আদিতমারীতে সাংবাদিক মুরাদ মুর্শিদকে আটক করে পরে মুচলেকার মাধ্যমে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সাংবাদিক মহলে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। যদি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে, তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করাই স্বাভাবিক। তবে সেই প্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ, ন্যায়সঙ্গত এবং পেশাগত মর্যাদা রক্ষাকারী।
সমাজের প্রতিটি শ্রেণীতেই ভালো ও মন্দ মানুষ রয়েছে। যেমন দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ আছে, তেমনি সৎ ও জনবান্ধব পুলিশও আছে। যেমন দায়িত্বশীল সাংবাদিক আছেন, তেমনি কিছু ব্যক্তি সাংবাদিকতার নাম ব্যবহার করে অপকর্মেও জড়ান। একই চিত্র আমলাতন্ত্র, রাজনীতি ও অন্যান্য পেশাতেও বিদ্যমান। তাই একজনের অপরাধের দায় পুরো পেশাজীবী সমাজের ওপর চাপানো কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
একজন পুলিশ সদস্যের অনৈতিক কর্মকাণ্ড যেমন পুরো বাহিনীর ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তেমনি একজন অপেশাদার বা হলুদ সাংবাদিকের কর্মকাণ্ডের দায়ও পুরো সাংবাদিক সমাজ বহন করে। এ কারণেই উভয় পক্ষের দায়িত্ব আরও বেশি।
দেশের নানা সংকট, দুর্যোগ, অপরাধ কিংবা জনস্বার্থের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও প্রচারে সাংবাদিকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অনেক সময় সেই তথ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজেও সহায়ক হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশে বহু সাংবাদিক হত্যা, হামলা, গুম, মামলা ও নির্যাতনের শিকার হলেও অনেক ঘটনার বিচার আজও ঝুলে আছে। সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড তার অন্যতম আলোচিত উদাহরণ।
গণমাধ্যম ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়, বরং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিপূরক শক্তি। তাই সাংবাদিকদের সঙ্গে আচরণে সংযম, আইনগত স্বচ্ছতা ও পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখা প্রয়োজন। একইভাবে সাংবাদিকদেরও পেশাগত নীতিমালা মেনে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
রাষ্ট্র, প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থার কাছে প্রত্যাশা একটাই, কোনো ব্যক্তি সাংবাদিক হোক বা সাধারণ নাগরিক, তার সঙ্গে আচরণ হবে আইনের ভিত্তিতে, ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা ক্ষমতার প্রদর্শনের ভিত্তিতে নয়।
সম্মান দিলে সম্মান ফিরে আসে। সাংবাদিক ও পুলিশ উভয়েই দেশের জন্য কাজ করেন। তাই সংঘাত নয়, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধই হতে পারে একটি সুন্দর ও জবাবদিহিমূলক সমাজ গঠনের পথ।