• ঢাকা |

আদর্শ শিক্ষক ফেডারেশনের সেমিনারে শিক্ষা সংস্কারে নৈতিকতা, দক্ষতা ও বৈষম্য দূরের আহ্বান


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ১১ জুলাই, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

এমএম রহমাতুল্লাহ: ‘জুলাই বিপ্লবোত্তর শিক্ষা সংস্কার ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তারা বলেছেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী, বৈষম্যহীন, দক্ষতাভিত্তিক ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন করে গড়ে তুলতে হলে মৌলিক সংস্কারের বিকল্প নেই। একই সঙ্গে তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ বন্ধ, গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, মেধার যথাযথ মূল্যায়ন এবং ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষাকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।

শনিবার (১১ জুলাই) বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবের আব্দুস সালাম হলে বাংলাদেশ আদর্শ শিক্ষক ফেডারেশনের উদ্যোগে আয়োজিত এ সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির উপদেষ্টা ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় শিক্ষা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হাসান বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে, যাতে জাতীয় আত্মপরিচয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি দাবি করেন, প্রশাসনের একটি অংশ ধর্মবিমুখ মানসিকতায় পরিচালিত হচ্ছে। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত ধর্মীয়, নৈতিক ও আদর্শিক শিক্ষাকে অন্তর্ভুক্ত করে শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে।

প্রধান বক্তা দৈনিক আমার দেশ-এর সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি সম্ভব হচ্ছে না। বৈষম্যমুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম মানবসম্পদ তৈরির ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। পাঠ্যবইয়ের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, বিভিন্ন খাতভিত্তিক বই রচনা এবং শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতি থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষকদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে নিয়োগ ও প্রশাসনে দলীয়করণ বেড়েছে, ফলে যোগ্যরা বঞ্চিত হচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলন দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আত্মবিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করেছে এবং সেই প্রজন্মকে নৈতিক ও আদর্শিক শিক্ষায় গড়ে তুলতে হবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ইলিয়াস মোল্লা এমপি বলেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা লক্ষ্যহীন হয়ে পড়েছে। সুস্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করে নতুন শিক্ষা নীতি প্রণয়ন এবং ন্যায়বিচার ও ইনসাফভিত্তিক নেতৃত্ব তৈরিতে শিক্ষার ভূমিকা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি বলেন, শিক্ষা সংস্কারের মাধ্যমে রাষ্ট্র সংস্কার সম্ভব হলেও এর জন্য সরকারের আন্তরিকতা অপরিহার্য। তিনি অভিযোগ করেন, মেধার মূল্যায়নের অভাব, দলীয়করণ ও আত্মীয়করণের কারণে দেশে মেধাপাচার বেড়েছে। একই সঙ্গে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রসঙ্গেও রাজনৈতিক মন্তব্য করেন।

সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য ও শহীদ জাবের ইব্রাহিমের মা রোকেয়া বেগম বলেন, রাষ্ট্র সংস্কার ছাড়া প্রকৃত শিক্ষা সংস্কার সম্ভব নয়। তিনি সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ এবং এ বিষয়ে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।

কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সাবেক সিনিয়র সচিব ড. খ ম কবিরুল ইসলাম বলেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এটিকে নতুনভাবে ঢেলে সাজাতে হবে। তিনি বলেন, উচ্চশিক্ষিত তরুণদের পিয়ন পদে আবেদন করতে হওয়া বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার সংকটের প্রতিফলন।

ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, উন্নত দেশগুলো শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিলেও বাংলাদেশে গবেষণার যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। তিনি দাবি করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দকৃত বাজেটে গবেষণার জন্য পৃথক বরাদ্দ না থাকা উদ্বেগজনক। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের কল্যাণে নেওয়া বিভিন্ন প্রকল্প বাতিলের সমালোচনা করে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সরকারের প্রতি সহযোগিতামূলক ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।

লেখক ও ইসলামিক চিন্তাবিদ মুফতি আলী হাসান উসামা বলেন, বৈষম্যহীন শিক্ষা নীতি প্রণয়ন জরুরি। তিনি প্রাথমিক স্তর থেকে কুরআন ও হাদিস শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেন এবং মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের প্রতি বিদ্যমান সামাজিক বৈষম্য দূর করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

সেমিনারের শুরুতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক যুবাইর মুহাম্মদ এহসানুল হক। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন বাংলাদেশ আদর্শ শিক্ষক ফেডারেশন ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সভাপতি অধ্যাপক রবিউল ইসলাম। এতে আরও বক্তব্য দেন সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক এবিএম ফজলুল করিম, তা'মীরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা খলিলুর রহমান মাদানী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শামসুল আলম এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. শহিদুল ইসলামসহ বিভিন্ন শিক্ষাবিদ ও সংগঠনের নেতারা।

সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি বলেন, শিক্ষা মানুষের নৈতিক চরিত্র গঠন এবং সমাজে কল্যাণ প্রতিষ্ঠার অন্যতম মাধ্যম। তিনি কুরআনের শিক্ষার আলোকে সমাজ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে শিক্ষার প্রতিটি স্তরে কুরআন শিক্ষার শিক্ষক নিয়োগ এবং ইসলামিক স্টাডিজকে ঐচ্ছিকের পরিবর্তে আবশ্যিক বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান। পাশাপাশি শিক্ষা ব্যবস্থায় দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ বন্ধ করে যোগ্যতার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করারও আহ্বান জানান।

সেমিনারে বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক পরিষদ, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক পরিষদ, কলেজ শিক্ষক পরিষদ, মাদ্রাসা শিক্ষক পরিষদ, কারিগরি শিক্ষক পরিষদ, মাধ্যমিক স্কুল শিক্ষক পরিষদ, প্রাইমারি স্কুল শিক্ষক পরিষদ ও কিন্ডারগার্টেন শিক্ষক পরিষদসহ বিভিন্ন শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।