• ঢাকা |

যুক্তরাষ্ট্রকে কৌশলগত পাল্টা বার্তা চীনের: বাণিজ্য ও প্রযুক্তি সংঘাতের নতুন অধ্যায়


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ৬ আগস্ট, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

বিশেষ প্রতিবেদন: বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে চলমান বাণিজ্য ও প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা আরও এক ধাপ তীব্র হলো। যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক বাণিজ্য ও প্রযুক্তি নিষেধাজ্ঞার জবাবে এবার একাধিক পাল্টা পদক্ষেপ নিয়েছে চীন। সাতটি মার্কিন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবসা ও সহযোগিতা নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রমুখী ড্রোন, গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির রপ্তানিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে বেইজিং।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল একটি প্রতিশোধমূলক সিদ্ধান্ত নয়; বরং বৈশ্বিক প্রযুক্তি সরবরাহ ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং কৌশলগত প্রতিযোগিতায় চীনের অবস্থান আরও শক্ত করার একটি সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ। ফলে বিশ্বের দুই অর্থনৈতিক পরাশক্তির মধ্যকার সংঘাত নতুন মাত্রা পেতে পারে।

পাল্টা নিষেধাজ্ঞায় সাত মার্কিন প্রতিষ্ঠান

চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ঘোষণায় বলা হয়েছে, সাতটি মার্কিন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চীনা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক সম্পর্ক এবং সহযোগিতা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে—

Compliance Testing LLC
Applied DNA Sciences
Stratum Reservoir
Altana Technologies
Responsible Business Alliance
Verité Group
Human Rights in China

চীনের অভিযোগ, এসব প্রতিষ্ঠান শিনজিয়াং-সংক্রান্ত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে অ্যারিজোনাভিত্তিক Compliance Testing LLC-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কমিউনিকেশন কমিশনের এমন পদক্ষেপে সহায়তা করেছে, যা চীনা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

ড্রোন রপ্তানিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ

চীনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটি হলো ড্রোন ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির রপ্তানি ব্যবস্থায় নতুন নিয়ন্ত্রণ।

সরকার জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো প্রতিটি নিয়ন্ত্রিত ড্রোন, গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ এবং প্রযুক্তি পৃথকভাবে পর্যালোচনা করে লাইসেন্স দেওয়া হবে। অর্থাৎ সরাসরি রপ্তানি বন্ধ না হলেও অনুমোদন প্রক্রিয়া দীর্ঘ হবে, ফলে সরবরাহে বিলম্ব এবং ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সামরিক, শিল্প, কৃষি ও নজরদারি প্রযুক্তিতে ড্রোনের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের কারণে এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।

মার্কিন পরিদর্শন সংস্থার কার্যক্রম স্থগিত

চীনের বাধ্যতামূলক পণ্য সনদ (সার্টিফিকেশন) ব্যবস্থার আওতায় মার্কিনভিত্তিক পরিদর্শন সংস্থাগুলোর কারখানা পরিদর্শনের অনুমতিও সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।

এর ফলে চীনে উৎপাদিত বিভিন্ন পণ্যের আন্তর্জাতিক মান যাচাই ও রপ্তানি প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘ হতে পারে। উৎপাদকদের অতিরিক্ত সময় ও ব্যয় বহনের সম্ভাবনাও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অফিস সরঞ্জাম আমদানিতে নিরাপত্তা তদন্ত

একই সঙ্গে আমদানি করা প্রিন্টার, ফটোকপি মেশিন এবং অন্যান্য অফিস সরঞ্জামের বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তাভিত্তিক তদন্ত শুরু করেছে বেইজিং।

যদিও কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়নি, চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এটিকে সাম্প্রতিক মার্কিন পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ার অংশ হিসেবেই ব্যাখ্যা করেছে।

কেন এই পাল্টা পদক্ষেপ?

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র চীনের টেলিকম অপারেটর, পরীক্ষাগার, ড্রোন নির্মাতা, রাউটার প্রস্তুতকারী, সাবমেরিন কেবল, উন্নত রোবোটিক্স সরঞ্জাম এবং বিদ্যুৎ ইনভার্টার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর ধারাবাহিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

এর পাশাপাশি গত সপ্তাহে ৪০টিরও বেশি চীনা প্রতিষ্ঠানকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বেইজিং শুরু থেকেই এসব পদক্ষেপকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য ক্ষতিকর বলে অভিযোগ করে আসছে।

বিশ্লেষকদের মতে, চীনের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত মূলত সেই চাপেরই কৌশলগত জবাব।

বৈশ্বিক অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে?

অর্থনীতিবিদদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এখনো পূর্ণমাত্রার বাণিজ্য যুদ্ধের পথে হাঁটছে না। বরং উভয় দেশই নির্দিষ্ট খাতকে লক্ষ্য করে চাপ সৃষ্টির কৌশল অনুসরণ করছে।

তবে এই পাল্টাপাল্টি নিষেধাজ্ঞার কারণে—

বৈশ্বিক প্রযুক্তি সরবরাহ শৃঙ্খলে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
ড্রোন, টেলিযোগাযোগ ও উন্নত প্রযুক্তিপণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে বিকল্প উৎপাদন ও সরবরাহ কেন্দ্র খুঁজতে হতে পারে।
বিশ্ববাজারে কিছু প্রযুক্তিপণ্যের দাম বাড়তে পারে।
বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের জন্য নিয়ন্ত্রক ঝুঁকি ও ব্যবসায়িক ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য কী বার্তা?

বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একদিকে যেমন সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে, অন্যদিকে নতুন বিনিয়োগ ও উৎপাদন স্থানান্তরের সুযোগও সৃষ্টি হতে পারে।

বিশেষ করে ইলেকট্রনিক্স, তথ্যপ্রযুক্তি, টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম এবং উৎপাদন খাতের উদ্যোক্তাদের বৈশ্বিক বাজারের পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে হবে।

সামনে কী?

ওয়াশিংটন ও বেইজিং—দুই পক্ষই জাতীয় নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত আধিপত্য এবং অর্থনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। ফলে অদূর ভবিষ্যতে নিষেধাজ্ঞা ও পাল্টা নিষেধাজ্ঞার এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকার আশঙ্কাই বেশি।

বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এর অর্থ একটাই—প্রযুক্তি ও বাণিজ্যের লড়াই এখন আর কেবল শুল্কের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়; এটি ক্রমেই রূপ নিচ্ছে বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তার, সরবরাহ শৃঙ্খলের নিয়ন্ত্রণ এবং ভবিষ্যতের প্রযুক্তিগত নেতৃত্বের প্রতিযোগিতায়।