• ঢাকা |

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর: রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে জনগণের নতুন বার্তা


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ৪ আগস্ট, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

এমএম রহমাতুল্লাহ: দুই বছর আগে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা করে। সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহালের প্রতিবাদ থেকে শুরু হওয়া ছাত্রদের আন্দোলন অল্প সময়ের মধ্যেই পরিণত হয় সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে এক অভূতপূর্ব গণজাগরণে। শিক্ষার্থী, শ্রমিক, পেশাজীবী, দিনমজুর, রিকশাচালক, রাজনৈতিক কর্মী এবং সাধারণ মানুষ এক কাতারে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি, সুশাসন ও গণতান্ত্রিক সংস্কারের দাবি তোলেন। শেষ পর্যন্ত এই আন্দোলন তৎকালীন সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন আনে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন—রাজনৈতিক দলগুলো কি জনগণের সেই বার্তা সত্যিই বুঝতে পেরেছে?

দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষক, শিক্ষাবিদ, জননীতি বিশেষজ্ঞ, শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন নথিপত্র বিশ্লেষণ করে পরিচালিত এই অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলালেও যে সংকটগুলো মানুষের ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল, সেগুলোর অধিকাংশই এখনো জনআলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।

কোটা ছিল উপলক্ষ, ক্ষোভ ছিল বহু বছরের
বিশ্লেষকদের মতে, আন্দোলনের তাৎক্ষণিক কারণ ছিল সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহাল। কিন্তু সেটিই ছিল দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশের উপলক্ষ মাত্র।

বিভিন্ন গবেষক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের মতে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন, নির্বাচনব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় সীমাবদ্ধতা, দুর্নীতি, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, প্রশাসনিক দুর্বলতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাহীনতা—এসব কারণ মানুষের ক্ষোভকে দীর্ঘদিন ধরে পুঞ্জীভূত করেছিল।

একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষকের ভাষায়, "কোটা ছিল স্ফুলিঙ্গ, কিন্তু বিস্ফোরণের জ্বালানি বহু বছর ধরে জমছিল।"

ফলে আন্দোলন কেবল একটি নীতিগত সিদ্ধান্তের বিরোধিতা নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি, সংস্কার এবং কার্যকর গণতন্ত্রের দাবিতে পরিণত হয়।

দলীয় রাজনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে নাগরিক আন্দোলন

অনুসন্ধানে অংশ নেওয়া বহু আন্দোলনকারী জানিয়েছেন, আন্দোলনের শুরুতে এটি কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি হিসেবে নয়, বরং নাগরিকদের ন্যায়বিচার ও সমঅধিকারের আন্দোলন হিসেবেই গড়ে উঠেছিল।

বিশেষ করে তরুণদের বড় একটি অংশ মনে করতেন, তারা কোনো দলের পক্ষে নয়; বরং বৈষম্যহীন রাষ্ট্র, স্বচ্ছতা এবং সমান সুযোগের দাবিতে রাস্তায় নেমেছিলেন।

রাজনৈতিক বিজ্ঞানীদের মতে, এই আন্দোলনের মালিকানা এককভাবে কোনো রাজনৈতিক দল দাবি করতে পারে না। কারণ বিভিন্ন মতাদর্শ, শ্রেণি ও পেশার মানুষ এতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছিলেন।

তরুণ ভোটারদের মানসিকতায় বড় পরিবর্তন

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের নির্বাচনী সংস্কৃতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা।

তাদের মতে, শিক্ষিত তরুণ ভোটারদের বড় একটি অংশ এখন আর শুধু ঐতিহ্যগত দলীয় আনুগত্য বা আবেগ দিয়ে ভোটের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না। তারা মূল্যায়ন করছেন—

দলটির সুশাসন নিশ্চিত করার সক্ষমতা;
দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান;
অর্থনৈতিক পরিকল্পনা;
কর্মসংস্থান তৈরির রূপরেখা;
প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বিশ্বাসযোগ্যতা।

রাজনৈতিক গবেষকদের মতে, বাংলাদেশের ভোটের রাজনীতিতে এটি একটি নতুন ধারা, যেখানে আবেগের চেয়ে বাস্তব ফলাফল ও নীতিনির্ভর রাজনীতি গুরুত্ব পাচ্ছে।

নির্বাচনী ইশতেহারে চাই বাস্তবায়নের রূপরেখা

এই অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জনগণ এখন শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের স্পষ্ট পরিকল্পনাও জানতে চান।

জননীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের নির্বাচনী ইশতেহারে রাজনৈতিক দলগুলোকে অন্তত কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে—

দুর্নীতি কীভাবে কমানো হবে?
জবাবদিহি নিশ্চিত হবে কোন প্রক্রিয়ায়?
বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা কী?
কর্মসংস্থান কীভাবে বাড়বে?
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কীভাবে শক্তিশালী করা হবে?

তাদের মতে, বাস্তবায়ন পরিকল্পনাহীন বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিয়ে এখন আর ভোটারদের আস্থা অর্জন করা কঠিন হবে।

সংস্কারের শুরু নিজেদের ঘর থেকেই

বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশের মত, জনগণের আস্থা ফিরে পেতে চাইলে রাজনৈতিক দলগুলোকেই আগে নিজেদের ভেতরে সংস্কার শুরু করতে হবে।

তারা গুরুত্ব দিচ্ছেন—

অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা;
যোগ্যতার ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্বাচন;
আর্থিক স্বচ্ছতা;
দলীয় জবাবদিহি;
তরুণ ও পেশাজীবীদের নেতৃত্বে অন্তর্ভুক্তি;
গবেষণাভিত্তিক নীতিনির্ধারণ।

তাদের ভাষায়, যে দল নিজেই গণতান্ত্রিক নয়, সে দলের পক্ষে জাতীয় পর্যায়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে না।

ডিজিটাল যুগে রাজনীতির নতুন বাস্তবতা

রাজনৈতিক যোগাযোগ ব্যবস্থাও দ্রুত বদলে যাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সফল রাজনৈতিক প্রচারে এখন প্রয়োজন—

স্পষ্ট বার্তা;
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় উপস্থিতি;
তথ্যভিত্তিক প্রচার;
সহজ ভাষায় নীতির ব্যাখ্যা;
গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের দ্রুত জবাব।

বর্তমানে তরুণদের বড় অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিও এবং স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম থেকেই রাজনৈতিক তথ্য সংগ্রহ করছেন। ফলে প্রচলিত জনসভাকেন্দ্রিক প্রচারণার পাশাপাশি ডিজিটাল যোগাযোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

জাতীয় স্বার্থ ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বাড়ছে আগ্রহ

অনুসন্ধানে অংশ নেওয়া গবেষকদের মতে, গণ-অভ্যুত্থানের পর জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং পররাষ্ট্রনীতি নিয়েও জনমনে আগ্রহ বেড়েছে।

কেউ কেউ মনে করেন, জনগণ এখন জানতে চান রাজনৈতিক দলগুলো আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনায় কী নীতি অনুসরণ করবে এবং কীভাবে দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষা করবে।

অন্যদিকে বিশেষজ্ঞদের আরেকটি অংশ মনে করেন, পররাষ্ট্রনীতি রাজনৈতিক স্লোগানের বিষয় নয়; এটি কূটনীতি, অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ভারসাম্যের ওপর নির্ভরশীল।

পরিচয়ের রাজনীতি থেকে ইস্যুভিত্তিক রাজনীতির দিকে

রাজনৈতিক বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ভোটারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখন পরিচয় বা দলীয় আবেগের চেয়ে দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব সমস্যাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

তাদের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে—

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ;
কর্মসংস্থান;
শিক্ষা;
স্বাস্থ্যসেবা;
জনসেবা;
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি;
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কার।

বিশ্লেষকদের মতে, মতাদর্শের গুরুত্ব থাকলেও ভোটারদের বড় অংশ এখন নীতির কার্যকারিতা দিয়ে দলকে মূল্যায়ন করতে চাইছেন।

যুবসমাজ এখন নির্ধারণ করছে রাজনৈতিক গতি

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান আবারও প্রমাণ করেছে, বাংলাদেশের তরুণরাই এখন রাজনৈতিক পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী চালিকাশক্তি।

গবেষকদের মতে, সড়ক নিরাপত্তা আন্দোলন, করনীতি, শিক্ষা ও সুশাসনসহ বিভিন্ন নাগরিক ইস্যুতে গত কয়েক বছরে তরুণদের ধারাবাহিক সক্রিয়তা নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে।

তাদের ধারণা, ভবিষ্যতের যেকোনো সরকারকে ডিজিটালি সংযুক্ত এবং দ্রুত সংগঠিত হতে সক্ষম এই তরুণ প্রজন্মের জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে।

রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য পাঁচটি বড় শিক্ষা

বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে ভবিষ্যতের রাজনীতির জন্য পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা উঠে এসেছে—

এক. বিশ্বাসযোগ্যতা এখন কেবল প্রতিশ্রুতির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

দুই. কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ভোটারদের প্রধান উদ্বেগ।

তিন. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি এখন জাতীয় নির্বাচনের অন্যতম বড় ইস্যু।

চার. তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ আগামী দিনের নির্বাচনে নির্ণায়ক ভূমিকা রাখবে।

পাঁচ. নির্বাচন জেতাই যথেষ্ট নয়; জনগণের আস্থা ধরে রাখতে কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক শাসন নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ কোন পথে?

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পর বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।

এই আন্দোলন দেখিয়েছে, সাধারণ মানুষ—বিশেষ করে তরুণরা—সমষ্টিগত উদ্যোগের মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতির গতিপথ বদলে দিতে পারেন।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, সেই সময়ের আকাঙ্ক্ষাগুলো ভবিষ্যতের রাষ্ট্র পরিচালনায় কতটা প্রতিফলিত হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের ভোটাররা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সচেতন, তথ্যসমৃদ্ধ এবং দাবি আদায়ে দৃঢ়। তারা শুধু নির্বাচনী স্লোগান নয়, বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, কার্যকর প্রতিষ্ঠান এবং দৃশ্যমান ফলাফল দেখতে চান।

দুই বছর আগে জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলো যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি করেছিল, তার প্রকৃত মূল্যায়ন হবে কেবল সরকার পরিবর্তনে নয়; বরং এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠলে, যেখানে জবাবদিহি, সুশাসন, আইনের শাসন এবং জনগণের অংশগ্রহণ রাষ্ট্র পরিচালনার স্থায়ী ভিত্তি হয়ে ওঠে।