মো: মুখলেছুর রহমান: একসময় বর্ষাকালে কয়েক দিন টানা বৃষ্টি হলে তাকে স্বাভাবিক মৌসুমি বৃষ্টি বলে মনে করা হতো। কিন্তু এখন পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। বর্তমানে কয়েক ঘণ্টার অস্বাভাবিক অতিবৃষ্টি একটি পুরো শহরকে অচল করে দিতে পারে , পাহাড়ে ভয়াবহ ভূমিধস ঘটাতে পারে, হাওরাঞ্চল অস্বাভাবিক মাত্রায় প্লাবিত করতে পারে, কৃষকের সারা বছরের পরিশ্রম নষ্ট নিমিষেই করে দিতে পারে এবং লাখো মানুষের জীবন-জীবিকাকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিতে পারে। এ ধরনের বিরূপ আবহাওয়া এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবেরই বাস্তব প্রতিফলন।
বিশ্বের জলবায়ুবিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরেই সতর্ক করে আসছেন যে, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে পৃথিবীর জলচক্র আরও অস্থির হয়ে উঠবে। কোথাও দীর্ঘ খরা, কোথাও অতিবৃষ্টি, কোথাও ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বৃদ্ধি, আবার কোথাও আকস্মিক বন্যা—এসবই হবে নতুন স্বাভাবিক বাস্তবতা। বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই সেই বাস্তবতার সম্মুখীন হয়েছে।
বাংলাদেশ বিশ্বের জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশসমূহের মধ্যে অন্যতম। আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান, নিম্নভূমি, বিশাল নদী ব্যবস্থা, উপকূলীয় অঞ্চল এবং ঘনবসতি—সব মিলিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিটি অভিঘাত এখানে বহুগুণ বেশি অনুভূত হয়। পাহাড়ি অঞ্চলে অতিবৃষ্টির ফলে ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ছে। হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যা কৃষকদের ফসল নষ্ট করছে। উপকূলে লবণাক্ততা বাড়ছে। অন্যদিকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ বড় শহরগুলো কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতায় স্থবির হয়ে পড়ছে।
এই পরিস্থিতির জন্য বাংলাদেশ দায় খুবই গৌণ। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান অত্যন্ত নগণ্য। শিল্পোন্নত দেশগুলো গত দুই শতাব্দীর শিল্পায়নের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ করেছে। সেই ঐতিহাসিক নিঃসরণের ফল ভোগ করছে বাংলাদেশসহ আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অসংখ্য উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশ। এটি শুধু পরিবেশগত সংকট নয়; এটি একটি নৈতিক, অর্থনৈতিক এবং বৈশ্বিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।
এ কারণেই আজ “জলবায়ু ন্যায়বিচার” (Climate Justice) কেবল একটি স্লোগান নয়; এটি বাংলাদেশের অস্তিত্বের দাবি। যে দেশ ক্ষতির জন্য প্রায় দায়ী নয়, সেই দেশই যদি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ন্যায্য ক্ষতিপূরণ, প্রযুক্তি সহায়তা এবং অর্থায়ন নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত বৈশ্বিক দায়িত্ব।
কিন্তু শুধু আন্তর্জাতিক সহায়তার অপেক্ষায় থাকলে চলবে না। দেশের ভেতরেও আমাদের প্রস্তুতি বহুগুণ বাড়াতে হবে। দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ, বৈজ্ঞানিক নগর পরিকল্পনা, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, নদী ও খাল পুনরুদ্ধার, জলাধার সংরক্ষণ, বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনা, পাহাড় রক্ষা, জলাভূমি সংরক্ষণ এবং কার্যকর আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।
বিশেষ করে আমাদের নগর উন্নয়নের ধারা নতুন করে মূল্যায়ন করা জরুরি। প্রাকৃতিক জলাধার ভরাট, খাল দখল, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে অনেক সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ে রূপ নেয়। প্রকৃতিকে উপেক্ষা করে উন্নয়ন কখনো টেকসই হতে পারে না।
একই সঙ্গে কৃষি খাতেও জলবায়ু অভিযোজনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। জলবায়ু-সহনশীল ধান ও অন্যান্য ফসলের জাত উদ্ভাবন, বৃষ্টিনির্ভর কৃষির উন্নয়ন, পানি সংরক্ষণ প্রযুক্তি, কৃষি বীমা এবং আধুনিক আবহাওয়া তথ্য কৃষকের হাতে পৌঁছে দেওয়ার যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।
সমস্যার পাশাপাশি বাংলাদেশের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার দ্বারও খোলা দেখা যাচ্ছে, তা হলো কার্বন অর্থনীতি। বিশ্বব্যাপী এখন কার্বন ক্রেডিট (Carbon Credit) এবং আন্তর্জাতিক কার্বন বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। যে দেশ বা প্রতিষ্ঠান বনায়ন, কার্বন শোষণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জলাভূমি সংরক্ষণ কিংবা নির্গমন হ্রাসে সফল হবে, তারা আন্তর্জাতিক কার্বন বাজার থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন করতে পারবে।
বাংলাদেশের রয়েছে বিশাল উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী, সুন্দরবন, ম্যানগ্রোভ বন, সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি, কৃষিভিত্তিক কার্বন সংরক্ষণের সম্ভাবনা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তৃত সুযোগ। এগুলোকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী নিবন্ধিত ও ব্যবস্থাপনা করা গেলে বাংলাদেশ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের এক নতুন ও টেকসই খাত হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
এ জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত জাতীয় কার্বন নীতি, দক্ষ কার্বন হিসাব ব্যবস্থা (Carbon Accounting), আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী যাচাই (Verification), গবেষণা, আইনগত কাঠামো এবং দক্ষ মানবসম্পদ। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ, সরকারি সংস্থা এবং বেসরকারি খাতকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
এখানে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল (Climate Finance), ক্ষয়ক্ষতি তহবিল (Loss and Damage Fund), সবুজ জলবায়ু তহবিল (Green Climate Fund), অভিযোজন তহবিল এবং কার্বন বাজার—এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে হবে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু কূটনীতিতে দক্ষতা বাড়ানো, প্রমাণভিত্তিক গবেষণা উপস্থাপন এবং বৈশ্বিক ফোরামে সুসংগঠিত কৌশল গ্রহণ এখন খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন নীতিনির্ধারক, গবেষক এবং নীতি-পরামর্শক মহলে জলবায়ু অর্থায়ন, কার্বন ক্রেডিট এবং বাংলাদেশের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। এটিকে ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে দেখা যায়। তবে আলোচনা থেকে বাস্তব নীতিতে রূপান্তরই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দলীয় বা ব্যক্তিগত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে এই প্রশ্নকে জাতীয় স্বার্থের বিষয় হিসেবে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।
আজ বাংলাদেশের প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি “জাতীয় জলবায়ু ও কার্বন অর্থনীতি কৌশল”। যেখানে থাকবে অভিযোজন, প্রশমন (Mitigation), কার্বন বাণিজ্য, প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান (Nature-based Solutions), দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের সমন্বিত রূপরেখা। এই কৌশল বাস্তবায়নে পরিবেশ, অর্থ, পরিকল্পনা, কৃষি, বন, স্থানীয় সরকার, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের জন্য কিছুটা আশঙ্কার বিষয় হলেও এটিই বর্তমানের বাস্তবতা। অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস, উপকূলীয় লবণাক্ততা এবং নগর জলাবদ্ধতা আমাদের প্রতিদিন স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। এখন আর কেবল ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করার সময় নয়; এখন ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য বিনিয়োগ, পরিকল্পনা এবং বৈশ্বিক নেতৃত্ব প্রদর্শনের সময়।
বাংলাদেশ যদি দূরদর্শী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারে, তবে জলবায়ু সংকটকে শুধু মোকাবিলা নয়, বরং সবুজ অর্থনীতি, কার্বন অর্থায়ন এবং টেকসই উন্নয়নের নতুন সুযোগেও রূপান্তর করা সম্ভব। এজন্য রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, নীতিনির্ধারক, সরকারি কর্মকর্তা, গবেষক, উন্নয়ন অংশীদার, বেসরকারি খাত এবং সচেতন নাগরিক—সবাইকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে।
জলবায়ুর এই সংকট কোনো একক সরকারের নয়, কোনো একক প্রজন্মেরও নয়। এটি সমগ্র জাতির ভবিষ্যৎ। আর সেই ভবিষ্যৎ রক্ষায় করণীয় সম্পর্কে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে এখনই; বিলম্বে নয়।
মো: মুখলেছুর রহমান।
অর্থনীতিবিদ, সমাজচিন্তক ও মানবাধিকার কর্মী।