নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির বক্তব্য ও রাষ্ট্রীয় সফর নিয়েও প্রশ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক: গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যাসহ সব হত্যাকাণ্ডের বিচার, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধের দাবিতে আগামী ৩১ অক্টোবর ঢাকা-খুলনা-কুষ্টিয়া লংমার্চ করবে ১১ দলীয় ঐক্য। একই সঙ্গে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকার সহযোগিতামূলক মনোভাব না দেখালে ভবিষ্যতে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে জোটটি।
মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর ২৯ মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা জানান বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
মামুনুল হক জানান, ৩১ অক্টোবর সকাল ৭টায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে উদ্বোধনী সমাবেশের মধ্য দিয়ে লংমার্চ শুরু হবে। বিভিন্ন স্থানে কর্মসূচি পালনের পর এটি কুষ্টিয়ায় গিয়ে শেষ হবে। আগের দুটি লংমার্চের মতো এবারও সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের আশা করছে ১১ দলীয় ঐক্য।
মামুনুল হক বলেন, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সারের সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং প্রশাসনে সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধের দাবিও লংমার্চে তুলে ধরা হবে। পাশাপাশি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হবে।
জুলাই গণহত্যা, শাপলা গণহত্যা এবং শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডসহ সব হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
লংমার্চ শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে উল্লেখ করে মামুনুল হক বলেন, কর্মসূচিতে বাধা বা অপতৎপরতা সৃষ্টি করা হবে না বলে তাঁদের আশ্বস্ত করা হয়েছে। তবে কোনো পক্ষ অপতৎপরতা চালালে তা প্রতিহত করে কর্মসূচি সফল করার ঘোষণা দেন তিনি।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হবে কি না, তা নিয়ে ১১ দলীয় ঐক্যের উদ্বেগ রয়েছে বলে জানান মামুনুল হক। নির্বাচন কমিশনের সচিব পর্যায়ে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। ঠাকুরগাঁওয়ের উপনির্বাচনে কমিশনের ভূমিকা নিয়েও তাঁদের উদ্বেগ রয়েছে।
তিনি বলেন, জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কোনো ব্যত্যয় ঘটলে ১১ দলীয় ঐক্য নীরব থাকবে না। প্রয়োজনে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বড় ধরনের কর্মসূচি দেওয়া হবে।
পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) সাম্প্রতিক বক্তব্যের সমালোচনা করে মামুনুল হক বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা ক্রসফায়ারসংক্রান্ত বক্তব্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সর্বোচ্চ দায়িত্বে থাকা একজন কর্মকর্তার কাছ থেকে এ ধরনের বক্তব্য প্রত্যাশিত নয়। এতে দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক রাষ্ট্রীয় সফর নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ১১ দলীয় ঐক্যের এই নেতা। তাঁর অভিযোগ, সফরে অন্তর্ভুক্ত কয়েকজনের রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিত্বের উপযুক্ততা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফরকে বিনোদনমূলক সফরে পরিণত করার মতো আয়োজন দেখা যাচ্ছে বলে মন্তব্য করে তিনি এ বিষয়ে সরকারকে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান।
জাতীয় সংসদের আসন্ন চতুর্থ অধিবেশনে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুগুলোতে সরকার বিরোধী দলের সঙ্গে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সমাধানের উদ্যোগ নেবে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেন তিনি। অধিবেশনের আগে ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা আবার বৈঠক করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করবেন বলে জানান।
লংমার্চের গাড়িবহর গোপালগঞ্জের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির আশঙ্কা রয়েছে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মামুনুল হক বলেন, তাঁরা এ ধরনের পরিস্থিতির আশঙ্কা করছেন না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক থাকলে কর্মসূচি স্বাভাবিকভাবে পালন করা সম্ভব হবে বলে তাঁরা মনে করেন।
গোপালগঞ্জে ইসলামপন্থী ও দেশপ্রেমিক বিপুলসংখ্যক মানুষ লংমার্চে অংশ নেবেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বা অপতৎপরতা দেখা দিলে তা মোকাবিলায় তাঁরা প্রস্তুত। একই সঙ্গে গোপালগঞ্জের প্রশাসনকে যথাযথ দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান তিনি। কোনো অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে এর দায় সরকার ও প্রশাসনকে বহন করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন।
লংমার্চের কর্মসূচির স্থান নির্ধারণের বিষয়ে তিনি জানান, কয়েকটি স্থানের সুযোগ-সুবিধা ও প্রবেশপথ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে জেলা স্কুল এলাকায় স্থানসংকুলান ও প্রবেশপথের সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ভারতের এক গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠকের অভিযোগসংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে মামুনুল হক বলেন, যাঁরা অভিযোগ করছেন, তাঁরাই এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে পারবেন। ১১ দলীয় ঐক্য কোনো ষড়যন্ত্র বা চক্রান্তের অংশ নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাষ্ট্র সংস্কার, শহীদদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা, আধিপত্যবাদ মোকাবিলা এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রীয় কাঠামো নির্ধারণের লক্ষ্যে তাঁরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছেন।
জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও দেশের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণের সংগ্রামে ১১ দলীয় ঐক্যের পরিসর আরও বিস্তৃত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
বৈঠকে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, এলডিপির প্রেসিডেন্ট কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীসহ জোটভুক্ত বিভিন্ন দলের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
ব্রিফিংয়ের শেষ পর্যায়ে মামুনুল হক ৩১ অক্টোবরের ঢাকা-খুলনা-কুষ্টিয়া লংমার্চ সফল করতে দেশপ্রেমিক নাগরিক, গণমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা কামনা করেন।