বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এমপি বলেছেন, আমরা আপনাদের দাবি নিয়ে আপনাদের সামনে এসেছি। আমরা দলীয় দাবি নিয়ে আসিনি। সরকার আপনাদের অপমান করছে এর প্রতিবাদ করতে আজ এখানে এসেছি।
১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-খুলনা-ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া লংমার্চ উপলক্ষে ৩১ অক্টোবর শনিবার রাত পৌনে ১২টায় কুষ্টিয়ার শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে সমাপনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ; দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধ; আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধের দাবিতে এ লংমার্চের আয়োজন করা হয়।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে চেয়েছিলাম, জুলাই শহীদদের আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ চেয়েছিলাম। ১৪০০ জুলাই শহীদের নতুন বাংলাদেশ চেয়েছিলাম। কিন্ত যদি সরকার জুলাই শহীদের সম্মান করতো তাহলে তারা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করত। কিন্তু তারা তা মানেন না। গণভোটকে অবৈধ বলে। গণভোট অবৈধ নয়, গণভোট অবৈধ হলে সংসদ বৈধ হয় কিভাবে?
তিনি আরও বলেন, আমরা এমন বাংলাদেশ চাইনি। আমরা চেয়েছিলাম গণভোটে জনগণের দেয়া রায় বাস্তবায়ন করে সংবিধান সংস্কার করতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা হবে। কিন্তু তা করা হয়নি। ইতিহাস সাক্ষী যারাই গণভোটকে অগ্রাহ্য করেছে, তাদের পরিণতি ভোগ করেছে। ভালোয় ভালোয় গণভোটের রায় মেনে নিন, তা না হলে ১১ দলের সাত দফা একদফায় রূপ নেবে।
আমীরে জামায়াত বলেন, দেশ আমাদের সবার। দেশকে রক্ষার জন্য সবাইকে লড়তে হবে। আমরা কারো কাছে মাথানত করব না। আমরা আবর্জনা পরিস্কার করে ঘরে ফিরবো, ইনশাআল্লাহ।
এলডিপির চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বীর বিক্রম বলেন, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাস ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ আমরা চেয়েছিলাম। এমন বাংলাদেশ চাই যেখানে মানুষ সুবিচার ও ন্যায়বিচার পাবে। বিভিন্ন জায়গায় দলীয়করণ করা হচ্ছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ও বর্তমান সরকারের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর আল্লামা মামুনুল হক বলেন, গত ১২ ফেব্রুয়ারি দুটি ভোট হয়েছে। একটি শপথ নিয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেয়নি বিএনপির এমপিরা। জনগণ গণভোটে প্রায় ৭০ ভাগ হ্যাঁ -তে রায় দিয়েছে।
তিনি বলেন, সরকারের এমপিরা এমপির শপথ নিয়েছে যাতে সিন্ডিকেট করা যায়, চাঁদাবাজি করা যায় এজন্য। সংবিধান সংস্কার করলে এসব করা যাবে না। দেশে এখন খুন, গুম করা হচেছ।
মামুনুল হক আরও বলেন, বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রবন্দর একটি দেশকে ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে দেশকে করদ রাজ্যে পরিণত করার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। বাংলাদেশকে অন্য কোনো রাষ্ট্রের করদরাজ্য করার ষড়যন্ত্র জীবন দিয়ে হলেও রুখে দেয়ার ঘোষণা দেন তিনি।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনা উন্নয়নের গণতন্ত্রের কথা বলে মেঘা প্রকল্পের নামে মেঘা লুটপাট করেছে। বর্তমান সরকারের উপর শেখ হাসিনার ভূত চেপেছে। কার্ডের গণতন্ত্রের কথা বলছে। কার্ডের গণতন্ত্রের মাধ্যমে দুরভিসন্ধি করলে, কৃষকের পকেটেও লাল কার্ড আছে। জনগণ লাল কার্ড বের করলে সরকার ক্ষমতায় থাকতে পারবে না। বাংলাদেশে আর কারো তালুকদারি প্রতিষ্ঠা করতে দেয়া হবে না।
ঢাকা থেকে কুষ্টিয়া পর্যন্ত লংমার্চ রুটের পথসভা ও জনসভাগুলোয় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান এমপি। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন এলডিপির চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বীর বিক্রম; বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর আল্লামা মামুনুল হক, মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দিন; বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ ; এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ এমপি ও যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব,আব্দুল হান্নান মাসউদ এমপি, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির আমীর মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম ছোবহানী ও মহাসচিব মুসা বিন ইযহার; আমার বাংলাদেশ পার্টির সভাপতি জনাব মুজিবুর রহমান মঞ্জু; জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির সহসভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান; বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান; জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ সদস্য জনাব মোবারক হোসাইন; বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান এডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম চান; বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মুফতি ফখরুল ইসলামসহ ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ ও স্থানীয় নেতারা।
সমাবেশ ও লংমার্চে যোগ দেন ও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি,সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম, এডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল, প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের; কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন এমপি, নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, ঢাকা মহনগরী উত্তরের আমীর মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম, চাকসুর ভিপি ইবরাহীম হোসেন রনি ও ডাকসু জিএস এসএম ফরহাদ প্রমুখ।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কুষ্টিয়া জেলা শাখার আমীর অধ্যক্ষ খন্দকার একেএম আলী মুহসিনের সভাপতিত্বে শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে সমাপনী জনসভায় স্থানীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে বক্তব্য রাখেন কুষ্টিয়া জেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর আব্দুল গফুর এমপি, চুয়াডাঙ্গা জেলা জামায়াতের আমীর রুহুল আমিন,মেহেরপুর জেলা জামায়াতে আমীর তাজ উদ্দিন আহমেদ এমপি, কুষ্টিয়া সদর আসনের সংসদ সদস্য মুফতি আমীর হামজা, কুষ্টিয়া কুমারখালি খোকসা আসনের সংসদ সদস্য আফজাল হোসেন, এনসিপর কুষ্টিয়া জেলার আহ্বায়ক জান্নাতুল ফেরদৌসের টনি,
এবি পার্টির কুষ্টিয়া জেলা সভাপতি আব্দুল্লাহ আল মাসুম; শিবিরের কুষ্টিয়া জেলা সভাপতি ইমরান বিশ্বাস ও শহর সভাপতি হাফেজ আব্দুল্লাহ আল মামুন প্রমুখ।
এর আগে ঢাকার বায়তুল মোকাররমে সকাল ৭টায় উদ্বোধনী সমাবেশের মধ্য দিয়ে লংমার্চ শুরু হয়। সকাল ৮টায় খুলনা কুষ্টিয়ার উদ্দেশে হাজারের অধিক গাড়ির বহর নিয়ে রওনা হয় লংমার্চের বহর। বহরে গণমাধ্যমকর্মীদের গাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স এবং প্রচার ও আইটি টিমের গাড়ি যুক্ত ছিল। পথে পদ্মা সেতু পার হয়ে শরীয়তপুরের জাজিরার নাওডোবা; ফরিদপুরের ভাঙ্গায়, গোপালগঞ্জের কাশিয়ানি, বাগেরহাটের নওয়া পাড়া মোড়, বাগেরহাটের ফকিরহাটের কাঁটাখালীর মোড়; খুলনা মহানগরীর বাবরী চত্বর ও ফুলতলার বাসস্ট্যান্ডের স্বাধীনতা চত্বর;যশোরর অভয়নগর, যশোরের মুড়লীর মোড়; ঝিনাইদহের বাস টার্মিনাল ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় গেটের পথসভায় যোগ দেয় লংমার্চের বহর। সবশেষ লংমার্চের বহর দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে কুষ্টিয়ার শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে সমাপনী সমাবেশে রাত ১১টায় যোগ দেয়।
এছাড়াও লংমার্চ রুটের বিভিন্ন স্থানের গণজমায়েত স্থলে অনানুষ্ঠানিক বক্তব্য রাখেন ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতা ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানসহ নেতৃবৃন্দ। রাস্তার দুধারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় সংগঠনের ১১ দলের লাখ লাখ নেতাকর্মী, পথচারী, ক্ষুদ্রব্যবসায়ী, নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ ফুল দিয়ে অভিবাদন জানায় লংমার্চের বহরকে। পথসভা ও জনসভাগুলোয় লাখ মানুষ সন্ধ্যার পর মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে ও স্লোগান দিয়ে অভিবাদন জানায়। দাবি আদায়ে তারা দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
উল্লেখ্য, দাবি আদায়ে ১১ দল গত ৫ সেপ্টেম্বর প্রথম লংমার্চ করে চট্টগ্রাম অভিমুখে, দ্বিতীয়টি ১৯ সেপ্টেম্বর করে রংপুর অভিমুখে।