• ঢাকা |

চার বছরে পাঁচ প্রধানমন্ত্রী—অস্থিরতা কাটিয়ে মেয়াদ পূর্ণ করতে পারবেন স্টারমার?


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ২০ জুলাই, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে টালমাটাল পরিস্থিতি যেন কোনোভাবেই কাটছে না। বিগত ৪ বছরে মোট ৫ জন প্রধানমন্ত্রী পাওয়ার মধ্য দিয়ে এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক অস্থিরতার সাক্ষী হলো ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট। 

কিয়ার স্টারমারের নাটকীয় পদত্যাগের পর সোমবার (২০ জুলাই) লেবার পার্টির অভিজ্ঞ নেতা এবং গ্রেটার ম্যানচেস্টারের জনপ্রিয় সাবেক মেয়র অ্যান্ডি বার্নহাম যুক্তরাজ্যের ৫৯তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। 

বাকিংহাম প্যালেসে রাজা চার্লসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আনুষ্ঠানিকভাবে সরকার গঠনের দায়িত্ব পাওয়ার পর বার্নহাম জানান, তার সরকার দেশের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে। তবে বর্তমান ব্রিটিশ রাজনীতির ঘূর্ণাবর্তে দাঁড়িয়ে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— অ্যান্ডি বার্নহাম কি তার পূর্ণ মেয়াদ সাফল্যের সঙ্গে শেষ করতে পারবেন, নাকি পূর্বসূরিদের মতোই মাঝপথে বিদায় নিতে হবে? 

বিগত কয়েক বছর ধরে ব্রেক্সিট-পরবর্তী অর্থনৈতিক ধাক্কা ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সংকটে ব্রিটেনের রাজনীতিতে একের পর এক নেতৃত্ব পরিবর্তন হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম পিবিএস নিউজ তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, মাত্র এক দশকে বার্নহাম ব্রিটেনের সপ্তম প্রধানমন্ত্রী। বরিস জনসন, লিজ ট্রাস, ঋষি সুনাক এবং সর্বশেষ কিয়ার স্টারমারের পর বার্নহামের এই অভিষেককে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো ব্রিটেনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনের চরম বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছে। স্টারমার যেখানে মাত্র দুই বছর টিকে থাকতে পেরেছেন, সেখানে বার্নহামের সামনে চ্যালেঞ্জটা পাহাড়সম। 

যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশনস (সিএফআর)-এর এক রাজনৈতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বার্নহামের ক্ষমতার কেন্দ্রে আসা লেবার পার্টির শীর্ষ নেতৃত্বের একটি বড় রূপান্তর। তিনি মূলত বিকেন্দ্রীকরণ এবং আঞ্চলিক পুনর্গঠনের নীতি নিয়ে চলেন। তবে তার সাফল্যের মূল চাবিকাঠি নির্ভর করবে তিনি তার নিজস্ব মন্ত্রিসভা এবং বিভক্ত লেবার এমপিদের কতটা ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারেন তার ওপর। 

ব্রিটেনের সংসদীয় ব্যবস্থায় সাধারণ নির্বাচন ছাড়াই ক্ষমতাসীন দল তাদের নেতা পরিবর্তন করতে পারে, যার ফলে দলের ভেতরে একটু অসন্তোষ দানা বাঁধলেই প্রধানমন্ত্রীর চেয়ার নড়েচড়ে ওঠে। 

ওয়াশিংটন পোস্ট তাদের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বার্নহামের আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বিশ্বরাজনীতির চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরেছে। সংবাদমাধ্যমটির মতে, বার্নহামের দীর্ঘ অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা থাকলেও বৈশ্বিক রাজনীতি কিংবা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তার অভিজ্ঞতা তুলনামূলক সীমিত। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ডাউনিং স্ট্রিটের সমীকরণ মেলানো এবং ইউক্রেন-রাশিয়া সংকটে ব্রিটেনের অবস্থান ধরে রাখা তার জন্য বড় পরীক্ষা হবে। ওয়াশিংটন পোস্টের বিশ্লেষকদের মতে, বার্নহামের ব্যক্তিত্ব কিছুটা আবেগপ্রবণ, যা আন্তর্জাতিক চাপের মুখে তাকে কিছুটা নাজুক অবস্থানে ফেলতে পারে, যদিও ১০ বছরের আঞ্চলিক মেয়রের অভিজ্ঞতা তাকে শাসনকাজে অনেকটাই পরিপক্ব করেছে। 

অন্যদিকে ভারতের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু’র ভাষ্য, বার্নহাম লেবার পার্টির ৪০১ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ৩৭৯ জনের বিপুল সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। এই বিশাল জনসমর্থন এবং জনগণের কাছে তার ‘কিং অব দ্য নর্থ’ বা সাধারণ মানুষের নেতা হিসেবে ইমেজ তাকে প্রাথমিক স্তরে বড় সুবিধা দেবে। দ্য হিন্দুর মতে, অর্থনৈতিক সংস্কার ও কর কাঠামোতে বড় কোনো বিপর্যয় না ঘটলে এবং দলের ভেতরের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারলে বার্নহামের পক্ষে আগামী সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত টিকে থাকা অসম্ভব নয়। 

পরিশেষে বলা যায়, অ্যান্ডি বার্নহাম এমন এক সময়ে ব্রিটেনের হাল ধরেছেন যখন ব্রিটিশ নাগরিকরা ঘন ঘন সরকার পরিবর্তনে ক্লান্ত। তবে ব্রিটেনের বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দা, মূল্যস্ফীতি এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির যে জটিল সমীকরণ, তাতে বার্নহামের মেয়াদ শেষ করার বিষয়টি শুধু তার জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর করছে না। ডাউনিং স্ট্রিটের এই ‘মিউজিক্যাল চেয়ার’ খেলা বন্ধ করে তিনি যদি আগামী তিন বছর সরকারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারেন, তবেই ব্রিটেনের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে।