• ঢাকা |

জনস্বার্থে’ সরানো সেই কর্মকর্তাই ১৭ মাস পর বিএমডিএর শীর্ষে, কেন?


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ১২ আগস্ট, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

‘জোরপূর্বক’ চেয়ার দখলের অভিযোগে তদন্ত কমিটি, ‘জনস্বার্থে’ অবসর—এবার সেই জাহাঙ্গীরই নির্বাহী পরিচালক

তদন্ত প্রতিবেদনের হদিস নেই, উচ্চ আদালতে মামলা চলার মধ্যেই নিয়োগ

 শামীম রহমান, রাজশাহী ব্যুরো: বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) নির্বাহী পরিচালকের চেয়ার দখল নিয়ে এক বছর আগে যে কর্মকর্তাকে ঘিরে প্রশাসনে তোলপাড় হয়েছিল, এখন সেই চেয়ারেই বসছেন তিনি। অভিযোগের পর কৃষি মন্ত্রণালয় গঠন করেছিল উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি। এর মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে ওই কর্মকর্তাকে সরকারি চাকরি থেকে ‘জনস্বার্থে’ অবসরও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ১৭ মাস না পেরোতেই সেই মো. জাহাঙ্গীর আলম খানকে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বিএমডিএর নির্বাহী পরিচালক (গ্রেড-২) পদে।

বুধবার (১২ আগস্ট) তিনি নির্বাহী পরিচালক পদে যোগদান করেন বলে জানা গেছে।

এদিকে গত মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চুক্তি ও বৈদেশিক নিয়োগ শাখার প্রজ্ঞাপনে এই নিয়োগ দেওয়া হয়। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০১৮-এর ১৪(২) ধারা উল্লেখ করে প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, অন্য কোনো পেশা, ব্যবসা কিংবা সরকারি, আধা-সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের সঙ্গে কর্ম-সম্পর্ক পরিত্যাগের শর্তে যোগদানের তারিখ থেকে এক বছরের জন্য তাঁকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

কাগজে-কলমে নিয়োগের আইনি ভিত্তি থাকলেও জাহাঙ্গীরের অতীতের প্রশাসনিক অধ্যায়ই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে সামনে এসেছে। কারণ, নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্ব নিয়ে বিতর্কিত সেই ঘটনার তদন্তের ফল কী হয়েছিল—তা স্পষ্ট নয়। আর যে কর্মকর্তাকে ‘জনস্বার্থে’ সরকারি চাকরি থেকে অবসর দেওয়া হয়েছিল, সেই একই কর্মকর্তাকে দেড় বছরের ব্যবধানে কেন আবার একই প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে বসানো হলো—এরও সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা মিলছে না।

তিন আদেশে তিন রকম প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত

জাহাঙ্গীর আলম খানের বিএমডিএর নির্বাহী পরিচালক হওয়া নিয়ে প্রশ্নের কেন্দ্রে রয়েছে তিনটি সরকারি আদেশ।

প্রথম আদেশ—২৫ মার্চ ২০২৫। কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওই অফিস আদেশে বলা হয়, বিএমডিএর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. জাহাঙ্গীর আলম খানের চাকরির মেয়াদ ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে। সরকার জনস্বার্থে তাঁকে সরকারি চাকরি থেকে অবসর দেওয়া প্রয়োজন মনে করায় সরকারি চাকরি আইন ২০১৮-এর ৪৫ ধারা এবং সরকারি চাকরি (সংশোধন) আইন, ২০২৩-এর সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী তাঁকে অবসর দেওয়া হয়।

দ্বিতীয় আদেশ—২৭ মার্চ ২০২৫। এই আদেশেই উঠে আসে বিএমডিএর নির্বাহী পরিচালকের চেয়ার দখলকে ঘিরে গুরুতর অভিযোগ। আদেশে বলা হয়, ‘কতিপয় উচ্ছৃঙ্খল কর্মকর্তা-কর্মচারী’ জাহাঙ্গীর আলম খানের নেতৃত্বে তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক মো. শফিকুল ইসলামের কাছ থেকে ‘অবৈধভাবে জোরপূর্বক’ দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁকে অফিস থেকে বের করে দেওয়া এবং ব্যক্তিগত কাগজপত্র নিতে না দেওয়ার অভিযোগও উল্লেখ করা হয়।

ঘটনার কারণ উদঘাটন, দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আহমেদ ফয়সল ইমামকে আহ্বায়ক করে ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়। কমিটিকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে সুপারিশ দিতে বলা হয়েছিল।

তৃতীয় আদেশ—১১ আগস্ট ২০২৬। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০১৮-এর ১৪(২) ধারার ক্ষমতাবলে মো. জাহাঙ্গীর আলম খানকে বিএমডিএর নির্বাহী পরিচালক (গ্রেড-২) পদে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়।

তিনটি আদেশ পাশাপাশি রাখলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের এই পালাবদলই এখন অনুসন্ধানের মূল বিষয়।

২৩ মার্চ চেয়ার, ২৫ মার্চ অবসর

বিএমডিএ সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ২৩ মার্চ প্রতিষ্ঠানের সেচ শাখার প্রধান থাকা অবস্থায় জাহাঙ্গীর আলম খান নির্বাহী পরিচালকের চেয়ারে বসেন। অভিযোগ রয়েছে, এ জন্য তাঁর হাতে কোনো বৈধ অফিস আদেশ ছিল না। তখন নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন সরকারের তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব মো. শফিকুল ইসলাম। তাঁকে বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক পদে বদলি করা হলেও বিএমডিএতে নতুন নির্বাহী পরিচালক নিয়োগ না হওয়ায় তিনি দায়িত্ব পালন করছিলেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, ওই পরিস্থিতিতে শফিকুল ইসলামকে অফিস থেকে বের করে দিয়ে জাহাঙ্গীর আলম খান নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্ব নেন। ঘটনাটি মন্ত্রণালয়ের নজরে এলে দুই দিনের মাথায়—২৫ মার্চ—তাঁকে সরকারি চাকরি থেকে অবসর দেওয়া হয়। এরপরই ২৭ মার্চ তাঁর নেতৃত্বে দায়িত্ব ‘জোরপূর্বক’ নেওয়ার অভিযোগ তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়।

এখানেই প্রশ্ন—অবসর দেওয়ার সঙ্গে ওই ঘটনার কোনো যোগসূত্র ছিল কি না? যদি থাকে, তাহলে তদন্তে কী বেরিয়ে এসেছিল? আর যদি না থাকে, তাহলে একই সময়ের মধ্যে কেন এমন দুটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল?

১৫ কার্যদিবসের তদন্ত, ১৭ মাসেও ফল অজানা

তদন্ত কমিটিকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হলেও ১৭ মাস পরও সেই প্রতিবেদনের ফলাফল স্পষ্ট নয়। কমিটি প্রতিবেদন দিয়েছিল কি না, দিলে জাহাঙ্গীর আলম খানের বিরুদ্ধে দায় নির্ধারণ বা ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ ছিল কি না—তা প্রকাশ্যে আসেনি। তদন্তে দায় না থাকলে প্রতিবেদনটি নিয়োগের সময় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল কি না, আর দায় থাকলে তাঁকে একই প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে নিয়োগের যৌক্তিকতা কী—এসব প্রশ্নই এখন নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে।

‘জনস্বার্থে’ অবসর, আবার ‘জনস্বার্থে’ নিয়োগ

জাহাঙ্গীর আলমের ক্ষেত্রে সরকারি দুটি আদেশে ব্যবহৃত একটি শব্দ বিশেষভাবে নজর কেড়েছে—‘জনস্বার্থ’। ২৫ মার্চ ২০২৫-এর আদেশে তাঁকে অবসর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল ‘জনস্বার্থ’। আর ১১ আগস্ট ২০২৬-এর নিয়োগও করা হয়েছে সরকারের জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত হিসেবে।

ফলে প্রশ্ন উঠছে—মাত্র ১৭ মাসের ব্যবধানে জনস্বার্থের সংজ্ঞায় কী পরিবর্তন ঘটল? যে কারণে একজন কর্মকর্তাকে সরকারি চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়া প্রয়োজন হয়েছিল, সেই কারণ কি পরে আর বিদ্যমান ছিল না? নাকি তাঁর বিষয়ে সরকারের মূল্যায়নে পরিবর্তন এসেছে? যদি পরিবর্তন এসে থাকে, তার ভিত্তি কী?

তদন্তের পর সেই প্রতিষ্ঠানেই সর্বোচ্চ পদ
প্রশাসনিক জবাবদিহির জায়গা থেকেই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। একজন কর্মকর্তাকে ঘিরে কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব হস্তান্তর নিয়ে গুরুতর অভিযোগ ওঠে, মন্ত্রণালয় সেই অভিযোগ তদন্তে কমিটি করে এবং পরবর্তীতে তাঁকে সরকারি চাকরি থেকে অবসর দেওয়া হয়। এরপর একই ব্যক্তিকে ওই প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক করা হলে স্বাভাবিকভাবেই তাঁর পূর্ববর্তী ভূমিকা ও তদন্তের ফল নিয়োগের ক্ষেত্রে বিবেচিত হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্ন সামনে আসে।

কারণ নির্বাহী পরিচালক বিএমডিএর প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমের কেন্দ্রীয় ব্যক্তি। কর্মকর্তা-কর্মচারী ব্যবস্থাপনা, প্রকল্প বাস্তবায়ন, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত, সেচ ও উন্নয়ন কার্যক্রমসহ প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক বিষয়ে তাঁর ভূমিকা থাকবে।

অতএব, অতীতের বিতর্কের নিষ্পত্তি না করে তাঁকে এই পদে বসানো হলে ভবিষ্যতে একই ধরনের প্রশাসনিক প্রশ্ন ফের সামনে আসার আশঙ্কা থেকেই যায়।

অবসরের ১৭ মাস পর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ
২৫ মার্চ ২০২৫ অবসর। ১১ আগস্ট ২০২৬ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ। অর্থাৎ ব্যবধান প্রায় ১৭ মাস।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে নিয়োগের আইনি ভিত্তি হিসেবে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০১৮-এর ১৪(২) ধারা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অন্য কোনো পেশা, ব্যবসা কিংবা সরকারি, আধা-সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের সঙ্গে কর্ম-সম্পর্ক পরিত্যাগের শর্ত দেওয়া হয়েছে।

তবে প্রশ্ন হলো—অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাকে এ ধরনের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য অন্যান্য বিধি ও প্রশাসনিক শর্তগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না।

নিয়োগের অনুমোদন দেওয়ার সময় তাঁর পূর্ববর্তী চাকরির অবসর আদেশ, মন্ত্রণালয়ের তদন্ত, তদন্ত প্রতিবেদন এবং আদালতে চলমান মামলা—এসব বিষয় কতটা যাচাই করা হয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

উচ্চ আদালতে মামলা, তবু নিয়োগ
জাহাঙ্গীর আলম খান সরকারি চাকরি থেকে অবসর দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন বলে জানা গেছে। মামলাটি নিষ্পত্তির আগেই তাঁকে বিএমডিএর নির্বাহী পরিচালক করা হয়েছে।

‘অতীত ঘাঁটাঘাঁটি না করাই ভালো’
এসব অভিযোগ ও প্রশ্নের বিষয়ে সদ্য নিয়োগ পাওয়া বিএমডিএর নির্বাহী পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম খানের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি অতীতের বিষয় নিয়ে কথা বলতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন।

তিনি কালবেলাকে জানান, আপাতত অতীতের কোনো বিষয় নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি না করাই ভালো। শফিকুল আলম খান নিঃসন্দেহে একজন ভালো মানুষ। তাঁকে মব সৃষ্টি করে (বের করে) দেওয়ার প্রক্রিয়ায় আমি ছিলাম না। এসব বিষয় নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি না করাই ভালো। ঘাঁটাঘাঁটি করলে চারিত্রিকভাবে একে অপরের বদনাম হবে।

অন্যদিকে, জাহাঙ্গীর আলম খানের বিরুদ্ধে যে ঘটনায় অভিযোগ উঠেছিল, সেই সময়ের বিএমডিএর নির্বাহী পরিচালক এবং পরে অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব মো. শফিকুল ইসলামকে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি হাসতে হাসতে বলেন, এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি নন।

বিএমডিএর চেয়ারম্যান কৃষিবিদ মো. হাসান জাফির তুহিনের বক্তব্য জানতে ফোন করা হলে তিনি কল রিসিভ করেননি। ফলে তাঁর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অভিযোগ বা তদন্ত মানেই দোষী নয়। তবে সরকারি নথিতে ‘অবৈধভাবে জোরপূর্বক’ দায়িত্ব নেওয়ার অভিযোগ, তদন্ত এবং ‘জনস্বার্থে’ অবসরের তথ্য থাকায় পরবর্তী নিয়োগের আগে এসবের নিষ্পত্তি ও ব্যাখ্যা জরুরি। বরেন্দ্র অঞ্চলের পানি, সেচ ও কৃষি ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বিএমডিএর শীর্ষ পদে পুরোনো প্রশ্ন অমীমাংসিত থাকায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—এটি কি প্রশাসনিক পুনর্বাসন, নাকি নতুন মূল্যায়নের ফল?