• ঢাকা |

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের নতুন আত্মপ্রকাশ


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ৩ জুন, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

মো: মুখলেছুর রহমান: আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো দেশের মর্যাদা শুধু তার অর্থনৈতিক শক্তি বা সামরিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে সেই দেশের কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা, বৈশ্বিক আস্থা এবং বহুপাক্ষিক পরিসরে কার্যকর ভূমিকা রাখার সক্ষমতার ওপর। জাতিসংঘের মতো বিশ্বব্যাপী প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পদ সভাপতি পদে নির্বাচিত হওয়া বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি আনুষ্ঠানিক অর্জন নয়; বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের প্রতি আস্থা, বিশ্বাস ও গ্রহণযোগ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। এটি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি বিশ্ব সম্প্রদায়ের গভীর আস্থা ও বিশ্বাসেরও প্রমাণ বহন করে।

বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে এমন অনেক মুহূর্ত রয়েছে, যা জাতির আত্মবিশ্বাসকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। স্বাধীনতার পর নানা রাজনৈতিক উত্থান-পতন, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক বাস্তবতার মধ্যেও বাংলাদেশ ধীরে ধীরে বিশ্বপরিসরে নিজের একটি স্বতন্ত্র অবস্থান গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান, জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান, উন্নয়নশীল বিশ্বের স্বার্থ রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা এবং বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে ধারাবাহিক অংশগ্রহণ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে সুদৃঢ় করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব খলীলুর রহমানের বিজয় নিঃসন্দেহে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এটি শুধু একটি নির্বাচনী সাফল্য নয়; বরং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতা, গ্রহণযোগ্যতা এবং আন্তর্জাতিক আস্থার প্রতিফলন। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্জন বাংলাদেশের জন্য যেমন সম্মানের, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার সক্রিয় উপস্থিতি ও প্রভাবেরও স্বীকৃতি।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আন্তর্জাতিক সাফল্যের প্রসঙ্গ এলে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়কাল বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাঁর শাসনামলে দেশের বৈদেশিক নীতিতে বাস্তববাদী ও বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন দেখা যায়। মুসলিম বিশ্ব, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, পশ্চিমা দেশসমূহ এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি সক্রিয় ও আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা সেই কূটনৈতিক ভিত্তি পরবর্তী সময়েও দেশের আন্তর্জাতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করেছে।

আজকের বিশ্ব বাস্তবতা অবশ্য অনেক বেশি জটিল ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ। ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আঞ্চলিক সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, অভিবাসন সংকট এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে নতুন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে। এমন সময়ে জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ বাংলাদেশের জন্য যেমন গৌরবের, তেমনি তাৎপর্যপূর্ণও বটে।

এই অর্জনের পেছনে বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্ব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং কূটনৈতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। কারণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমর্থন অর্জন কখনোই একদিনের ফল নয়। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তোলা, আস্থা সৃষ্টি, নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ। বিভিন্ন অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর সমর্থন অর্জন প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ এখনও বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে একটি গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য অংশীদার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তবে আন্তর্জাতিক কোনো পদে নির্বাচিত হওয়ার প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় সেই সুযোগকে কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যায় তার ওপর। বাংলাদেশের সামনে এখন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু রয়েছে, যেগুলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও জোরালোভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য ক্ষতিপূরণ ও অর্থায়ন নিশ্চিত করা, উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা, বৈশ্বিক বাণিজ্যে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা, প্রযুক্তিগত বৈষম্য হ্রাস এবং বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর মানবিক অধিকার রক্ষার মতো প্রশ্নে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি মানবিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। বছরের পর বছর ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীর আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ মানবিক দায়িত্ব পালন করে চলেছে। কিন্তু এই সংকটের স্থায়ী সমাধান এখনো অধরাই রয়ে গেছে। জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের প্ল্যাটফর্মগুলোতে বাংলাদেশের শক্তিশালী উপস্থিতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ ধরে রাখা এবং একটি টেকসই সমাধান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।

এছাড়া উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষায় বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বৈষম্য, ঋণসংকট, জলবায়ু অর্থায়ন এবং টেকসই উন্নয়নের প্রশ্নে দক্ষিণের দেশগুলোর কণ্ঠস্বরকে আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। আন্তর্জাতিক পরিসরে নেতৃত্বের এই সুযোগকে যদি জাতীয় স্বার্থ ও বৈশ্বিক ন্যায়বিচারের পক্ষে ব্যবহার করা যায়, তবে এই অর্জনের প্রকৃত তাৎপর্য আরও বৃদ্ধি পাবে।

তবে আন্তর্জাতিক মর্যাদার সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি দেশের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা। সুশাসন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, জবাবদিহি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রগুলো যত শক্তিশালী হবে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের অবস্থান তত সুদৃঢ় হবে। কূটনৈতিক সাফল্য তখনই দীর্ঘস্থায়ী হয়, যখন তার পেছনে একটি কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং জাতীয় ঐকমত্য কাজ করে।

বাংলাদেশের এই অর্জন নিঃসন্দেহে জাতির জন্য গর্বের। তবে গর্বের পাশাপাশি দায়িত্ববোধও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অর্জিত এই আস্থা ও মর্যাদাকে দেশের উন্নয়ন, জনগণের কল্যাণ এবং বৈশ্বিক ন্যায়ভিত্তিক ব্যবস্থার পক্ষে কাজে লাগাতে পারলেই এই সাফল্য সত্যিকার অর্থে অর্থবহ হয়ে উঠবে।

বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের জন্য এটি শুধু একটি সম্মানজনক মুহূর্ত নয়; বরং আরও সক্রিয়, দায়িত্বশীল এবং প্রভাবশালী ভূমিকা পালনের এক নতুন সুযোগ। সেই সুযোগের সর্বোত্তম ব্যবহারই হওয়া উচিত আগামী দিনের জাতীয় লক্ষ্য।

আল্লাহ তা’আলা মেহেরবানী করে সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে মানবিক বিশ্ব বিনির্মাণে বাংলাদেশকে যথাযথ ভূমিকা পালন করার তাওফিক দান করুন। এই মনোনয়নের মূল কারিগর বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী His highness জনাব তারেক রহমানকে এবং জাতিসংঘের ৮১ তম অধিবেশনের নির্বাচিত সভাপতি His Excellency Dr khalilur রহমান এর সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করছি।

মো: মুখলেছুর রহমান।
[রাজনৈতিক বিশ্লেষক, অর্থনীতিবিদ ও সমাজচিন্তক]
mukhles1975@gmail.com