• ঢাকা |

রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন অপরিহার্য


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ১৪ জুন, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

মো: মুখলেছুর রহমান: একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রথম এবং প্রধান দায়িত্ব হলো তার ভূখণ্ড, জনগণ ও জাতীয় স্বার্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। উন্নয়ন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার কিংবা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি—সবকিছুর ভিত্তি হলো একটি নিরাপদ রাষ্ট্রব্যবস্থা। নিরাপত্তা দুর্বল হলে রাষ্ট্রের অর্জিত উন্নয়ন মুহূর্তেই হুমকির মুখে পড়তে পারে। তাই বর্তমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করার কোনো বিকল্প নেই।

বিশ্ব রাজনীতির সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করেছে যে আন্তর্জাতিক আইন, কূটনৈতিক সম্পর্ক কিংবা অর্থনৈতিক সম্পর্ক সব সময় যুদ্ধ ও সংঘাত প্রতিরোধ করতে পারে না। বিভিন্ন অঞ্চলে সীমান্ত বিরোধ, ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, সন্ত্রাসবাদ, সাইবার হামলা এবং সামরিক উত্তেজনা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে যে রাষ্ট্র নিজের নিরাপত্তা সক্ষমতা শক্তিশালী রাখতে ব্যর্থ হয়, তাকে প্রায়ই বহুমুখী ঝুঁকির সম্মুখীন হতে হয়।

বাংলাদেশ শান্তিপ্রিয় রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বে পরিচিত। দেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হলো—“সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়।” কিন্তু শুধু শান্তির প্রতি অঙ্গীকার থাকলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। শান্তি রক্ষার জন্যও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা সক্ষমতা খুবই প্রয়োজন। কারণ দুর্বল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কখনো কখনো বহি:শত্রুর আগ্রাসনকে নিরুৎসাহিত করার পরিবর্তে উৎসাহিত করতে পারে। ইতিহাসে এর ভুড়ি ভুড়ি নজীর আছে, একটি দেশের সামরিক ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা শত্রুর সম্ভাব্য হুমকিকে প্রতিহত করার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে।

প্রতিরক্ষা শক্তি জোরদার করার অর্থ শুধু আধুনিক অস্ত্র সংগ্রহ নয়। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনবল গড়ে তোলা, গোয়েন্দা সক্ষমতা বৃদ্ধি, সাইবার নিরাপত্তা শক্তিশালী করা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার। বর্তমান যুগে যুদ্ধের ধরন বদলে গেছে। প্রচলিত যুদ্ধের পাশাপাশি তথ্যযুদ্ধ, সাইবার হামলা, ড্রোন প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সামরিক সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সময়োপযোগী ও প্রযুক্তিনির্ভর করে গড়ে তোলা অপরিহার্য।

বাংলাদেশের জন্য সামুদ্রিক নিরাপত্তাও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ক্রমশ বাড়ছে। সমুদ্রসম্পদ, বন্দর, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রক্ষার জন্য একটি শক্তিশালী নৌ সক্ষমতা অপরিহার্য। একই সঙ্গে শক্তিশালী ও আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে আকাশসীমা রক্ষা এবং সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তবে প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির প্রশ্নে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো খাতকে অবহেলা করে কেবল সামরিক ব্যয় বাড়ানো কোনো টেকসই সমাধান নয়। বরং জাতীয় নিরাপত্তাকে একটি সমন্বিত ধারণা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে, যেখানে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক সংহতি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে।

রাষ্ট্রের নিরাপত্তা শুধু সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী বা বিমানবাহিনীর ওপর নির্ভর করে না; এটি একটি জাতীয় দায়িত্ব। নাগরিকদের দেশপ্রেম, আইন মেনে চলার সংস্কৃতি, সামাজিক সম্প্রীতি, নাগরিকদের ন্যূনতম সামরিক জ্ঞান এবং জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ অবস্থানও নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। একটি সচেতন ও দায়িত্বশীল নাগরিক সমাজ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান শক্তি।

এ কথা দ্বিধাহীনচিত্তে বলা যায়, অনিশ্চিত ও প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আধুনিক, দক্ষ ও যুগোপযোগী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিকল্প নেই। তবে সেই প্রতিরক্ষা শক্তি হতে হবে দায়িত্বশীল, প্রতিরোধমূলক এবং জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। একটি নিরাপদ রাষ্ট্রই পারে তার জনগণের জন্য স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন এবং সমৃদ্ধির পথ সুগম করতে।

মো: মুখলেছুর রহমান।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক, সাবেক ক্যাডেট,
বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর, বিএনসিসি, সেনা উইং, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।