• ঢাকা |

ইরান–সৌদি উত্তেজনায় নতুন মোড়: তিন ফ্রন্টে চাপের মুখে রিয়াদ, বাড়ছে বৃহত্তর যুদ্ধের শঙ্কা


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ৩০ জুলাই, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

নিজস্ব প্রতিবেদক: মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী, ইরাকভিত্তিক ইরানপন্থী মিলিশিয়া এবং তেহরানের ক্রমবর্ধমান হুমকিকে কেন্দ্র করে সৌদি আরব এখন একসঙ্গে একাধিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তা শুধু উপসাগরীয় অঞ্চল নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্যও বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে।

কয়েক মাস ধরেই উত্তেজনা এড়িয়ে চলার কূটনৈতিক চেষ্টা চালিয়ে আসছিল রিয়াদ। এমনকি সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার লক্ষ্যে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগের পথও খোলা রেখেছিল সৌদি নেতৃত্ব। কিন্তু সাম্প্রতিক হামলা ও পাল্টা সামরিক অভিযানের পর সেই সংযমের কৌশল বড় ধরনের পরীক্ষার মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

তিন দিক থেকে বাড়ছে নিরাপত্তা চাপ

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ইরাকভিত্তিক ইরানঘনিষ্ঠ মিলিশিয়াদের ড্রোন অভিযান এবং ইরানের নতুন হুমকির কারণে সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

এসব ঘটনার জেরে রিয়াদও সামরিক প্রতিক্রিয়া জোরদার করেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এতে আঞ্চলিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

লোহিত সাগরে নতুন উত্তেজনা

হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সৌদি জাহাজের বিরুদ্ধে অবরোধ ঘোষণার কথাও সামনে এসেছে।

এই প্রণালিটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। হরমুজ প্রণালিতে অনিশ্চয়তার কারণে সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরেই লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর ব্যবহার করে তেল রপ্তানি বাড়ানোর পরিকল্পনা করে আসছে। ফলে বাব আল-মানদেবে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়লে সৌদির জ্বালানি রপ্তানি বড় ধরনের চাপে পড়তে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই রুটে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা দেখা দিলে আন্তর্জাতিক বাজারেও জ্বালানির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারে।

ইয়েমেন যুদ্ধের পুরোনো ক্ষত

২০১৫ সালে শুরু হওয়া ইয়েমেন যুদ্ধ সৌদি আরবের জন্য দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল সামরিক অভিযানে পরিণত হয়েছিল। কয়েক বছর ধরে চলা সংঘাত ভয়াবহ মানবিক সংকটেরও জন্ম দেয়। ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা হয়নি।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই পুরোনো সংঘাতকে আবারও নতুন মাত্রা দিয়েছে। পাল্টাপাল্টি হামলার ফলে সীমান্ত এলাকায় নতুন করে সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইরাক থেকেও ড্রোনের হুমকি

একই সময়ে ইরাকভিত্তিক ইরানপন্থী মিলিশিয়াদের ড্রোন হামলার অভিযোগও সামনে এসেছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, এসব হামলার লক্ষ্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং রাজধানী রিয়াদ।

এই ঘটনার পর সৌদি আরব পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ নিয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রে উল্লেখ করা হচ্ছে। যদিও রিয়াদ আনুষ্ঠানিকভাবে বলছে, তারা সংঘাত বাড়াতে চায় না; তবে জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে যেকোনো হামলার জবাব দেওয়া হবে।

ইরানের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক

এই পুরো সংকটে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে ইরানের ভূমিকা। পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ, তেহরান তার আঞ্চলিক মিত্র ও প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে ইরান বরাবরই সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে এবং নিজেদের নিরাপত্তা রক্ষার অবস্থানের কথা বলছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি যুদ্ধ এড়িয়েও প্রক্সি গোষ্ঠীর মাধ্যমে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এই কৌশল আরও বিস্তৃত সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

অর্থনীতিতেও বাড়ছে চাপ

নিরাপত্তা সংকটের পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপও বাড়ছে সৌদি আরবে। যুদ্ধসংক্রান্ত ব্যয় বৃদ্ধি, অবকাঠামো সুরক্ষায় অতিরিক্ত বিনিয়োগ এবং বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ দেশটির অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে।

বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি সাময়িকভাবে কিছু সুবিধা দিলেও উৎপাদন বা রপ্তানিতে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে সৌদি অর্থনীতি নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে দেশটির দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা ও মেগা প্রকল্পগুলোর ওপরও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সামনে কী?

পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমান সংকট শুধু সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। ইয়েমেন, ইরাক, লোহিত সাগর এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন পক্ষ এতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি দ্রুত আরও জটিল হয়ে উঠছে।

কূটনৈতিক উদ্যোগ ব্যর্থ হলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। আর সেই পরিস্থিতি তৈরি হলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিশ্ব অর্থনীতি—সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়তে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান এই উত্তেজনা এখন কোন দিকে মোড় নেয়, সেটিই আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের সবচেয়ে বড় পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে উঠেছে।