• ঢাকা |

উপসাগরে শক্তির নতুন সমীকরণ, বাহরাইনে যৌথ সামরিক মহড়া


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ২৯ জুলাই, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

নিজস্ব প্রতিবেদক: মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে আবারও বাড়ছে সামরিক তৎপরতা। আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি যখন নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে, ঠিক তখনই উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি)-এর ছয় সদস্য রাষ্ট্র বাহরাইনে শুরু করেছে তিন দিনের যৌথ সামরিক মহড়া ‘বাহরাইন শিল্ড’। ২৮ থেকে ৩০ জুলাই পর্যন্ত চলা এই মহড়ায় অংশ নিচ্ছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান এবং আয়োজক বাহরাইন।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল একটি নিয়মিত সামরিক মহড়া নয়; বরং উপসাগরীয় দেশগুলোর সম্মিলিত প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, রাজনৈতিক ঐক্য এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতার একটি দৃশ্যমান বার্তা।

কেন এই মহড়া গুরুত্বপূর্ণ?
সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা উদ্বেগ বেড়েছে। বিভিন্ন সংঘাত, সীমান্ত উত্তেজনা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার আশঙ্কা এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ উপসাগরীয় দেশগুলোকে আরও সমন্বিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দিকে এগোতে উৎসাহিত করছে।

এই বাস্তবতায় ‘বাহরাইন শিল্ড’ মহড়ার মূল লক্ষ্য হলো—

সদস্য দেশগুলোর যুদ্ধ প্রস্তুতি বৃদ্ধি;
যৌথ সামরিক পরিকল্পনা ও নেতৃত্বের সক্ষমতা উন্নত করা;
বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে দ্রুত সমন্বয় নিশ্চিত করা;
সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় অভিন্ন কৌশল অনুশীলন করা।
কী বলছে বাহরাইন?
বাহরাইনের চিফ অব স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল ধিয়াব বিন সাকর আল-নুয়াইমি বলেছেন, এই মহড়া জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর সম্মিলিত সামরিক শক্তির প্রতিফলন। তার ভাষায়, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সশস্ত্র বাহিনী বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত এবং এই মহড়া সেই সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করবে।

তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সহিংসতা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি প্রমাণ করেছে যে, ভবিষ্যতের যেকোনো আকস্মিক বা শত্রুতামূলক পরিস্থিতি মোকাবিলায় যৌথ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদার করা জরুরি।

কী বার্তা দিচ্ছে এই মহড়া?
বিশ্লেষকদের মতে, ‘বাহরাইন শিল্ড’ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।

প্রথমত, উপসাগরীয় দেশগুলো এখন নিরাপত্তা ইস্যুতে আগের তুলনায় আরও সমন্বিত অবস্থানে রয়েছে।

দ্বিতীয়ত, সম্ভাব্য যেকোনো আঞ্চলিক সংকট বা সামরিক উত্তেজনার ক্ষেত্রে তারা এককভাবে নয়, বরং যৌথভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে প্রস্তুত থাকার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তৃতীয়ত, আধুনিক যুদ্ধের বাস্তবতায় শুধু স্থলবাহিনী নয়, আকাশ, নৌ ও সমন্বিত কমান্ড কাঠামোকে আরও কার্যকর করার দিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে জিসিসি।

আঞ্চলিক রাজনীতিতে এর প্রভাব
উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ প্রতিষ্ঠার পর থেকে সদস্য দেশগুলো বিভিন্ন সময়ে যৌথ সামরিক মহড়া পরিচালনা করলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে এই মহড়ার তাৎপর্য আরও বেড়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ, সামুদ্রিক বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ফলে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এখন শুধু সামরিক বিষয় নয়; বরং অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের সঙ্গেও নিবিড়ভাবে জড়িত।

বাংলাদেশের জন্য কী গুরুত্ব?
বাংলাদেশের সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর সম্পর্ক মূলত জনশক্তি, বাণিজ্য ও জ্বালানি সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল। এসব দেশে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন এবং দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহের একটি বড় অংশ আসে এই অঞ্চল থেকে।

তাই মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির যেকোনো পরিবর্তন বাংলাদেশের অর্থনীতি, প্রবাসী কর্মীদের নিরাপত্তা, জ্বালানি আমদানি এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের ওপর পরোক্ষ প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের সামরিক ও কূটনৈতিক তৎপরতা বাংলাদেশের জন্যও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের বিষয়।

সামনে কী?
পর্যবেক্ষকদের ধারণা, ‘বাহরাইন শিল্ড’ মহড়া শুধু সামরিক অনুশীলনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং ভবিষ্যতে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা, সাইবার নিরাপত্তা এবং আকাশ ও সমুদ্র প্রতিরক্ষায় আরও বিস্তৃত সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

সব মিলিয়ে, বাহরাইনে অনুষ্ঠিত এই যৌথ সামরিক মহড়া মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান নিরাপত্তা বাস্তবতায় উপসাগরীয় দেশগুলোর ঐক্য, প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বার্তা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। তবে এ মহড়া কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের ঘোষণা নয়; বরং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, সমন্বয় এবং যৌথ প্রস্তুতি জোরদারের একটি প্রদর্শন হিসেবে দেখা হচ্ছে।