ফিরোজ মাহবুব কামাল
কিরূপে চেনা যায় অপরাধীদের?
যারা নৈতিক দিক দিয়ে অসুস্থ, দুর্বৃত্ত ও অপরাধী -তাদের অপরাধী চরিত্র কখনোই গোপন থাকে না। তাদের সে রোগ স্পষ্ট ধরা পড়ে সমাজের অপরাধী দুর্বৃত্তদের প্রতি তাদের ভালোবাসা ও তাদেরকে কাছে টেনে নেওয়ার মধ্য দিয়ে। কারণ এক্ষেত্রে কাজ করে অপরাধীদের চরিত্রের রুচির ম্যাচিং এবং অপরাধ কর্মের নেশা। এজন্যই চোর ডাকাত কখনোই ভাল মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করে না; এমন কি ভাল মানুষদের মহল্লায় নিজের ঘরও বানায় না। তারা বরং ডাকাত পাড়া খুঁজে। কারণ, তারা জানে ভাল মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করলে বা তাদের মাঝে বসবাস করলে চুরি ডাকাতি চলবে না; বরং ধরা পড়ার বিপদ আছে। খুনি ফ্যাসিস্ট হাসিনাও তাই সমাজের সবচেয়ে নৃশংস সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের কাছে টেনে নিয়েছিল। তাদের দিয়ে হাসিনা বিশাল টিম গড়ে তুলেছিল ফ্যাসিবাদী রাজনীতির। ভাল মানুষ কাছে রাখলে তার পক্ষে গুম, খুন, আয়না ঘর ও ফাঁসির রাজনীতি দীর্ঘ ১৬ বছর চালু রাখা সম্ভব হতো না।
অপর দিকে সমাজের সৎ এবং চরিত্রবান মানুষদের চেনাও কঠিন নয়। নিজের চোখ কান খোলা রাখলেই তাদের সহজে চেনা যায়। তাদের চেনা যায় সৎ ও চরিত্রবান মানুষদের প্রতি প্রবল ভালোবাসা এবং দুর্বৃত্তদের প্রতি চরম ঘৃণা দেখে। পানি এবং তেল যেমন একত্রে মেশে না, তেমনি দুর্বৃত্ত চরিত্রের মানুষ সাথে কখনোই সৎ ও চরিত্রবান মানুষের বন্ধুত্ব হয় না। তারা কখনো এক সাথে ব্যবসা বাণিজ্য ও রাজনীতি করে না। সেটি করলে বুঝতে হবে, তারা সবাই সমান দুর্বৃত্ত ও অপরাধী। সৎ এবং চরিত্রবান মানুষ সমাজে একলা চলতে রাজী; কিন্তু সে কখনোই দুর্বৃত্তদের কাছে ভিড়ে না।
হাসিনার পথে কি তারেক জিয়া?
হাসিনার রাজনীতি বাংলাদেশেইর কারো অজানা নয়। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়া শেখ হাসিনার পথে অবলম্বন করছে। রাজনীতিতে যারা অসাধু ও নীতিহীন এবং যারা অস্থিরতা ও সন্ত্রাস সৃষ্টি করতে পারে তাদেরকে তারেক জিয়া যেন বেছে বেছে কাছে টেনে নিচ্ছে। তাদেরকে ব্যবহার করা হচ্ছে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে টিভি টক শো’তে গালিগালাজ এবং রাজপথে শারিরীক ভাবে হামলার জন্য। বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য এটি অতি ভয়ানক দিক। এমন রাজনীতি নিয়ে বাংলাদেশকে একটি সভ্য ও উন্নত রাষ্ট্র গড়ে তোলার কাজটি অসম্ভব হয়ে উ যঠছে। ২০২৪য়ের ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখা গিয়েছিল -তা যেন আবার বিলুপ্ত হতে চলেছে। তারেক জিয়ার এ রাজনীতির কারণে বাংলাদেশের রাজনীতি আবার অস্থির হতে চলেছে। সে অস্থিরতার কারণ একদিকে যেমন সংবিধান সংস্কার নিয়ে জনগণের রায়ের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা তেমনি রাজপথে বিএনপির সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। বিএনপির সে সন্ত্রাসী রাজনীতি সম্প্রতি প্রমাণ মিললো হবিগঞ্জে এনসিপি নেতাদের উপরে বিএনপি ঘরানার নেতা কর্মীদের অসভ্য ও নৃশংস হামলা থেকে। বাংলাদেশের রাজনীতি যে কতটা দ্রুত অসভ্য ও অস্থির হতে চলেছে এ হলো তার স্পষ্ট দলিল। মনে হচ্ছে ৫ আগস্টের পর গর্তে ঢুকে যাওয়া আওয়ামী খুনি ফ্যাসিস্টরা বিএনপির লেবাসে আবার রাজনীতিতে ফিরে এসেছে।
ইতিমধ্যে বিএনপির কিছু নেতার বয়ান সোসাল মিডিয়াতে এসেছে। এনসিপির নেতাদের উপরে হামলায় কোন কোন বিএনপি নেতা প্রচণ্ড খুশি। যেন তাদের উপর হামলা করে বিএনপি সরকারের নিন্দা করার মজা দেখিয়েছে। কেউ কেউ বলেছে, এনসিপির নেতাদের উপরে যে হামলাটি হয়েছে সেটি নাকি তাদের প্রাপ্য ছিল। ভাবটা এমন, সে হামলার মুখে তারা যে বেঁচে গেছে সেটিই বিস্ময়কর। বলতেই হবে, এটি এক চরম অসভ্য চেতনা। বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মীদের উপর মারধর কখনোই কোনো সভ্য রাজনীতি হতে পারেনা। এর জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী হলো দেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়া নিজে। জনাব তারিক জিয়া যদি তাঁর আশপাশে প্রতিহিংসা পরায়ন অপরাধী দুর্বৃত্তদের স্থান না দিত – তবে এনসিপি নেতাদের উপর এরূপ অসভ্য কাণ্ড ঘটতো না।
পোষ্য কুকুর নীতির প্রয়োগ কি আবারো বাংলাদেশে?
যেসব দেশে বিপুল সংখ্যায় ভেড়া পালন হয়, সেসব দেশের ভেড়ার মালিকরা ভেড়াকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য কুকুর পালে। কুকুরের কাজ ভেড়ার পালকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। সে কুকুর নীতির প্রয়োগ করে ফ্যাসিস্ট শাসকেরা। তারা দেশের জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করতে বিশাল একপাল কুকুর প্রতিপালন করে। কারণ স্বৈরশাসকগণ জনগণকে ভেড়া ছাড়া বেশি কিছু মনে করেনা। ভেড়া জবাই করা যেমন মামুলি ব্যাপার, তেমনি তাদের কাছে মামুলি বিষয় হলো মানব হত্যা। জনগণকে মানুষ মনে করলে হাসিনা কখনোই ১৪ শতের বেশী মানুষকে হত্যা এবং ২২ হাজার মানুষকে আহত করতো না। আহতের অনেকে অন্ধ ও পঙ্গু হয়ে গেছে। জনগণকে মানুষ মনে করলে কখনোই শাপলা চত্বরের গণহত্যা ও পিলখানার সামরিক অফিসার হত্যা করতো না।
হাসিনার পোশমানা কুকুর রূপে তার গদির পাহারা দেয়ার কাজ করেছিল ছাত্র লীগ, যুব লীগের ক্যাডারগণই শুধু নয়, বরং জনগণের অর্থ পালিত পুলিশ বাহিনী, RAB বাহিনী, বিজিবি এবং সেনা বাহিনীর সদস্যরাও। মনে হচ্ছে হাসিনার সে কুকুর নীতি তারেক জিয়াও অনুসরণ করছে। সেটি বুঝা যায়, হবিগঞ্জে পুলিশের ভূমিকা দেখে। ছাত্রদল, যুবদল ও বিএনপির নেতাকর্মীগণ যখন এনসিপি’র নেতাদের হামলা করছিল পুলিশ সে হামলাকারিদের গ্রেফতার না করে বরং প্রোটেকশন দিয়েছে। এ থেকে বুঝা যায় হবিগঞ্জের পুলিশের ভূমিকাটি আদৌ পুলিশের ন্যায় ছিল না; বরং তাদের আচরণ ছিল সরকারের হাতে প্রতিপালিত একপাল পোষ্য জীবের।
দুর্বৃত্তমুক্ত শাসনের শুরুটি তারেক জিয়া থেকেই হতে হবে
পানি যেমন উপর থেকে নিচে নেমে আসে, তেমনি সুনীতি ও সুশাসন উপর থেকে নিচের দিকে নেমে আসে। পানি যেমন নিচ থেকে উপরে যায় না, সুনীতি ও সুশাসনও তেমনি নিচ থেকে উপরে যায় না। তাই দেশকে দুর্বৃত্তমুক্ত করতে হলে সেটির শুরুটি হতে হবে প্রধানমন্ত্রীর অফিস এবং মন্ত্রী পরিষদ থেকে। শুরু করতে হবে প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়ার আশেপাশে যারা দায়িত্ব পেয়েছে তাদের মধ্য থেকে অসাধু লোকদের দূর করার মধ্য দিয়ে। আরো জরুরি হলো, সমগ্র রাষ্ট্রকে দুর্বৃত্ত করার আগে বিএনপির নিজের দলকে দুর্বৃত্তদের থেকে মুক্ত করতে হবে। নিজ দলে চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, ঋণখেলাফি, প্রতারকদের আশ্রয় দিয়ে দেশকে এগিয়ে নেয়ার কাজ কখনোই হবে না। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, দুর্বৃত্ত নির্মূলে কাজটি বিএপির দ্বারা হচ্ছে না। বরং হচ্ছে উল্টোটি। সে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সরকার ও বিএনপির মধ্যে দ্রুত দুর্বৃত্তায়ন দেখে।
চোর ডাকাত, চাঁদাবাজ, ঋণখেলাফিরা বেকুব নয়। তারা বুঝে কোন দলে ঢুকলে অপরাধ করলেও পুলিশের হাত থেকে নিরাপত্তা মিলে এবংঅবাধ সুযোগ মিলে চুরিডাকাতি ও চাঁদাবাজীর। বাংলাদেশে এমন দুর্বৃত্তদের সংখ্যাটি বিশাল। তারা লুট পাটের নেশায় তারা সহায়ক দল খুঁজে। তাই বাংলাদেশের মত দুর্বৃত্তকবলিত দেশে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে দলে লোকবল বৃদ্ধির কাজটি অতি সহজ। দলের দরজা দুর্বৃত্তদের জন্য খুলে দিলে তারা বাঁধ ভাঙা প্লাবনের পানির মত দলে ঢুকে। সেটিই ছিল মুজিবের নীতি। তাই ঢাকাসহ সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানের সকল জেলার গুণ্ডারা আওয়ামী লীগে স্থান পেয়েছল। তাদেরকে মুজিব ব্যবহার করেছিল ১৯৭০য়ের নির্বাচনে অন্য দলগুলি জনসভা পণ্ড করতে। ফলে মুসলিম লীগের তিন গ্রুপ, জামায়াতে ইসলামী, নূরুল আমীন-শাহ আজিজ সাহবদের পাকিস্তান ডেমোক্রাটিক পার্টি (PDP)’য়ের মত গুণ্ডামুক্ত দলগুলি ঢাকাসহ বড় বড় শহরের কোথাও শান্তিপূর্ণ ভাবে জনসভা ও প্রচারণা চালাতে পারিনি। ফলে ১৯৭০’য়ের নির্বাচনের আগেই মুজিব রাজপথ দখলে নিয়ে নেয়। সে নীতি ছিল হাসিনারও। এখন সে নীতি গ্রহণ করছে বিএনপি। বিএনপি তাই সকল দলের সকল ক্ষমতালোভী দুর্বৃত্তদের জন্য দলের দরজা খুলে দিয়েছে। একান্ত বেকুব না হলে কোন চোর ডাকাত ও চাঁদাবাজ জামায়াতে ইসলামী বা এনসিপিতে যোগ দিবে না। সকল দুর্বৃত্তগণ এখন বিএনপিতে যোগ দিচ্ছে। এতে দ্রুত দুর্বৃত্তায়ন হচ্ছে বিএনপি’র। এরাই হবিগঞ্জে এনসিপিকে পেটালো। বহু জায়গায় জামায়াত কর্মীদেরও পিটাচ্ছে।
রাজনীতির আকাশে আবারো কালো মেঘ
হবিগঞ্জে এনসিপি নেতাদের উপর সে অসভ্য ও বীভৎস হামলা হলো তা প্রতিটি দেশপ্রেমীক মানুষের মনে গভীর শংকার জন্ম দিয়েছে। মনে হচ্ছে দেশ আবার দ্রুত আওয়ামী ফ্যাসিবাদের দিকে ধাবিত হচ্ছে। মনে হচ্ছে যে ফ্যাসিবাদীরা ৫ আগস্টের পর গর্তে ঢুকেছিল তারাই বিএনপিতে যোগ দিয়ে রাস্তায় নেমেছে। আশংকার মাত্রা আরো বেড়েছে পুলিশের ভূমিকা দেখে। যখন এনসিপি নেতাদের উপর হামলা হচ্ছিল তখন নিষ্ক্রিয় ভাবে দাড়িয়ে উপভোগ করছিল। পুলিশের এ ভূমিকা নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহউদ্দীনের এ অবধি নীরবতা দেখে আশংকা আরো ঘনিভূত করেছে। তিনি কি বিরোধী দলগুলি দমনে পুলিশকে এভাবেই ব্যবহার করতে চান?
তাই আলামত ভাল নয়। রাজনীতির আকাশে আবার ভয়ানক কালো মেঘে। যখন তখন প্রলঙ্কর ঝড় শুরু হতে পারে। মনে হচ্ছে তারেক জিয়া পরিস্থিতির ভয়াবহতা এখনো বুঝতে পারিনি; তাই আগুন নিয়ে খেলছে। জনগণ তো তাকে হাওয়া ভবনে খাম্বা তারেক হিসাবে দেখতে চায়না, দেখতে চায় দেশপ্রেমিক, সৎ এবং সংবেদনশীল প্রধানমন্ত্রী রূপে। তাকে বুঝতে হবে, জনগণ ভেড়া নয় যে রাজপথে কিছু পোষামানা কুকুর নামিয়ে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। হাসিনার পলিসি এক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে। শান্তিপূর্ণ ভাবে দেশ শাসন করতে হলে বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের শত্রু ভাবলে চলবে না। তাদেরকে স্বাধীনতার শত্রু বা গুপ্ত বলে গালিগালাজ না করে রাজনীতির ময়দান তাদেরকে মর্যাদাবান সহকর্মী মনে করতে হবে। এ ভদ্রতাটুকু তারা অবশ্যই আশা করে। সভ্য ও ভদ্র রাজনীতির এটিই একমাত্র পথ। দলীয় ক্যাডার বা পুলিশ দিয়ে রাস্তায় তাদের পিটালে সরকারই বিপদই বাড়বে। একমাত্র দেশের শত্রু এবং গণতন্ত্রের শত্রুরাই সেরূপ একটি সহিংস পরিস্থিতি আশা করে।
যে কোন সভ্য মানুষই আশা করবে হবিগঞ্জে যে অসভ্য ও বীভৎস অপরাধের কাণ্ড ঘটলো তার নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। যারা দায়ী শাস্তি দিতে হবে। বিচার ও শাস্তিকে জনগণের সামনে দ্রুত দৃশ্যমান করতে হবে। তারিক জিয়ার জন্য এটি এক গুরুতর নৈতিক ও রাজনৈতিক পরীক্ষা। ক্ষমতায় থাকতে হলে এ পরীক্ষায় অবশ্যই তাকে পাশ করতে হবে। যদি তারিক জিয়ার সরকার অপরাধীদের শাস্তি দিতে ব্যর্থ হয়, তবে পরিণাম ভয়াবহ হবে। জনগণ তখন বুঝবে তারেক জিয়া রাষ্ট্র পরিচালনা অযোগ্য। এবং জনগণ আরো বুঝবে, তাকে ক্ষমতায় রাখাই দেশের জন্য বিপদ। তখন তাকে নিজেকেই শাস্তি পেতে হবে। তাকে শাস্তি পেতে হবে গদি হারিয়ে। কারণ, জনগণ এভাবেই ব্যর্থ সরকারকে শাস্তি দিয়ে থাকে। ৩০/০৭/২০২৬