সোমবার সকালে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ইউরোপিয়ান পার্টনারশিপ ফর ডেমোক্রেসি (ইপিডি) ও ‘অধিকার’-এর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক স্টেকহোল্ডার ডায়লগে তিনি এসব কথা বলেন।
মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ২০২৬ সালের নির্বাচনে প্রাণহানি ও সহিংসতা আগের কয়েকটি নির্বাচনের তুলনায় কম হয়েছে—এটি সত্য। তবে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কৌশলগত ম্যানিপুলেশন বা প্রভাব বিস্তারের ধরন নতুন রূপ নিয়েছে। নির্বাচনব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন ও সংস্কার না হলে ভবিষ্যতে এই প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে এবি পার্টির চেয়ারম্যান বলেন, নির্বাচনের আগেই যদি কারা ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে—এমন একটি ধারণা মানুষের মধ্যে তৈরি হয়ে যায়, তাহলে নির্বাচন কমিশন ও মাঠ প্রশাসনের পক্ষে কার্যকরভাবে নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তাঁর দাবি, নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত যে এলাকায় যতটা পেরেছে, সেখানে প্রভাব বিস্তার করেছে। ভবিষ্যতে নির্বাচন পদ্ধতিতে পরিবর্তন ও বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা না হলে স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তির পক্ষে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ‘শান্তিপূর্ণ ম্যানিপুলেশন’ হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
মঞ্জুর ভাষায়, নির্বাচনী অনিয়ম সব সময় দৃশ্যমান সহিংসতার মাধ্যমে হয় না। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব, স্থানীয় ক্ষমতার ভারসাম্য এবং নির্বাচনী পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়ও ভোটের ফল ও ভোটারদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।
আলোচনায় দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতিকে ঘিরে সংঘাতের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন মজিবুর রহমান মঞ্জু। সরকারি ছাত্রসংগঠনের সন্ত্রাস ও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা এবং এর বিপরীতে বিরোধী ছাত্রসংগঠনগুলোর প্রতিরোধের কারণে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের যে পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, তা নিয়ে উদ্বেগ জানান তিনি।
তিনি বলেন, এ ধরনের সংঘর্ষের চূড়ান্ত পরিণতি অতীতে কখনো ভালো হয়নি; ভবিষ্যতেও এর পরিণতি ভালো হবে না। পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধানে সরকার ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে কার্যকর ও সমাধানমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
যাঁরা বক্তব্য দেন
স্টেকহোল্ডার ডায়লগে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপি নেতা রুহুল কবির রিজভী, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদ, জামায়াতের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন ও মারদিয়া মমতাজ, সংসদ সদস্য ডা. মাহমুদা মিতু, এনসিপি নেত্রী মুনিরা শারমিন, নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আব্দুল আলিম, অধিকারের পরিচালক নাসিরুদ্দিন এলান, তাসকিন ফাহমিনা এবং ইপিডির প্রকল্প পরিচালক অ্যানাসতাসিয়া এস উইবাওয়াসহ বিভিন্ন পর্যায়ের অংশীজন বক্তব্য দেন।
আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা, রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা, নির্বাচনকালীন পরিবেশ, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং ভবিষ্যতে সহিংসতা ও অনিয়ম প্রতিরোধে করণীয় নিয়ে মতামত তুলে ধরেন।
মঞ্জুর বক্তব্যে মূলত উঠে আসে—শুধু নির্বাচনের দিন শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে হলে নির্বাচনের আগে থেকেই রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সমান সুযোগ, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ কমানোর ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে দৃশ্যমান সহিংসতা কমলেও নির্বাচনী অনিয়ম নতুন কৌশলে ফিরে আসার আশঙ্কা থেকেই যাবে।