মোহাম্মদ ইউসুফ, বরিশাল: বাংলার ভেনিসখ্যাত বরিশালে প্রথমবার দুই দিনের সফরে এসে এখানকার নদী, গ্রাম-বাংলার অপরূপ সৌন্দর্য এবং সাধারণ মানুষের আন্তরিকতায় মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন।
সফরের শেষ দিন সোমবার (১০ আগস্ট) বেলা ১১ টায় বরিশালের গৌরনদী ক্যাথলিক চার্চে বিভিন্ন ধর্মের প্রতিনিধিদের সাথে আন্তঃধর্মীয় সংলাপে তিনি প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন। এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী এম. জহির উদ্দিন স্বপন এমপি।
ঘন্টাব্যাপী সংলাপে চার্চের ফাদার লিটন ফ্রান্সিস গোমেজের সভাপতিত্বে ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ ইব্রাহীমের সঞ্চালনায় অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, গৌরনদী উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব শরীফ জহির সাজ্জাদ হান্নান, আগৈলঝাড়া উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব বশির আহম্মেদ পান্না, ধর্মীয় নেতা মাওলানা আসাদুজ্জামান, যতীন্দ্রনাথ মিস্ত্রী, ফাদার মাইকেল দেউরি প্রমুখ।
সংলাপে মুসলিম-হিন্দু-খ্রীষ্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহন করেন। সংলাপ শেষে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত দুপুরে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের গৌরনদী উপজেলার সরিকলস্থ বাসভবনে মধ্যাহ্নভোজে অংশগ্রহন করেন।
শনিবার (৮ আগষ্ট) রাতে ঢাকা থেকে একটি বিলাস বহুল লঞ্চে যাত্রা করে রবিবার সকালে বরিশাল পৌঁছে বরিশাল সার্কিট হাউজে যান। সেখান থেকে সড়কপথে ঝালকাঠির ভিমরুলি পৌঁছান। ভীমরুলীর ভাসমান পেয়ারা বাজার ও পেয়ারা বাগান পরিদর্শন করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী ডিয়ান ডাও সহ তাঁর সফর সঙ্গীরা। তারা নৌকায় চরে ভাসমান পেয়ারা বাজার ঘুরে ঘুরে দেখেন। পরে একটি ট্রলারে করে তাঁর সফর সঙ্গীদের নিয়ে পেয়ারা বাগানে যান। এসময় তিনি পেয়ারা চাষী এবং বাগান মালিকদের সাথে কথা বলেন। ঘণ্টা কাল ভিমরুলি এলাকায় থেকে বহর নিয়ে ফিরে যান বরিশালে।
পরে বরিশালের সদর উপজেলার কড়াপুরে অবস্থিত ঐতিহাসিক মিয়াবাড়ি মসজিদ পরিদর্শন করেন ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন। ১৮ শতকে নির্মিত প্রাচীন এই মসজিদের স্থাপত্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তিনি অবগত হন এবং স্থাপনাটি ঘুরে দেখেন।
বরিবার দুপুরে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের আমন্ত্রণে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কীর্তনখোলা নদীতে নৌবিহারে অংশ নেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত। প্রায় তিন ঘণ্টা এমভি এম খান নামের একটি লঞ্চে কীর্তনখোলা ও সুগন্ধা নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করেন তাঁরা। নৌযানেই মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করা হয়।
নৌবিহারে বরিশাল প্রেসক্লাব আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তিনি।
এ সময় প্রেসক্লাব নেতৃবৃন্দ মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও তাঁর স্ত্রীকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। পরে তাঁদের হাতে বরিশালের ঐতিহ্যবাহী কুটিরশিল্পের একটি স্মারক তুলে দেওয়া হয়।
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বরিশাল সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন বলেন, বাংলার ভেনিসে এসে আমি সত্যিই মুগ্ধ ও অভিভূত। নদী-খাল, নৌকার চলাচল এবং পানির সঙ্গে মানুষের নিবিড় জীবনযাপন বরিশালকে ভিন্ন এক সৌন্দর্য দিয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ভাসমান বাজারের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, সকালে ভাসমান বাজারে নৌকায় ঘুরেছেন। নদীর ওপর এমন প্রাণবন্ত বাজার তাঁর জন্য অসাধারণ অভিজ্ঞতা বলেও জানান তিনি।
নৌবিহারের সময় মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে বরিশাল বন্দরের ইতিহাসও জানানো হয়। মোগল আমলে প্রতিষ্ঠিত বর্তমান বরিশাল বন্দরের নাম ছিল ‘গিরি-ই-বন্দর’। সে সময় এ নদীবন্দর দিয়ে লবণ, মসলা ও কাঠের ব্যবসা পরিচালিত হতো। পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৭৬ সালে এটি বরিশাল বন্দরে রূপান্তরিত হয়। বন্দরের ইতিহাস শুনে আগ্রহ প্রকাশ করেন রাষ্ট্রদূত এবং সেখানে দাঁড়িয়ে ছবি তোলেন।
নৌবিহারে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়ে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বন্ধু এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের অন্যতম বড় বাজারও যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে বরিশালে স্বাগত জানিয়ে ভবিষ্যতে আবারও তিনি বরিশালের সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসবেন বলেও আশা প্রকাশ করেন তথ্যমন্ত্রী।
বরিশাল প্রেসক্লাবের সভাপতি আমিনুল ইসলাম খসরুর সভাপতিত্বে সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসেন অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন।
এসময় আরও উপস্থিত ছিলেন বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক এ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন, বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মামুন অর রশিদ, রেঞ্জ ডিআইজি ড. মো. সাইফুল্লাহ বিন আনোয়ার, মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আবু রায়হান মুহাম্মদ সালেহ, জেলা প্রশাসক মোঃ মামুন খন্দকার, পুলিশ সুপার এ, জেড, এম মোস্তাফিজুর রহমানসহ স্থানীয় সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দ।