• ঢাকা |

সরঞ্জাম সংকটে কুমিল্লা মেডিকেলের দন্ত বিভাগে সীমিত চিকিৎসা


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ১২ আগস্ট, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

সাইফুল ইসলাম সুমন, কুমিল্লা প্রতিনিধি: কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দন্ত বিভাগে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকটে ব্যাহত হচ্ছে রোগীদের চিকিৎসাসেবা। চিকিৎসক থাকলেও পর্যাপ্ত ডেন্টাল চেয়ার, সার্জারি সরঞ্জাম, ওপিজি (অরাল প্যানোরামিক এক্স-রে) মেশিন ও রুট ক্যানেলসহ বিভিন্ন চিকিৎসা উপকরণ না থাকায় প্রতিদিন সীমিতসংখ্যক রোগীর সার্জারি করা হচ্ছে। সিরিয়াল না পেয়ে অনেক রোগীকে ফিরে যেতে হচ্ছে কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

সরেজমিনে দন্ত বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের ভিড় থাকলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সরঞ্জামের অভাবে কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে পারছেন না চিকিৎসকেরা। বিভাগের জন্য পাঁচটি ডেন্টাল চেয়ার থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে রয়েছে মাত্র দুটি। ফলে একসঙ্গে প্রয়োজনীয়সংখ্যক রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

মুরাদনগর থেকে ছেলের দাঁত তুলতে হাসপাতালে এসেছিলেন মো. আবু জাফর। দন্ত বিভাগে গিয়ে জানতে পারেন, ওই দিনের নির্ধারিত সংখ্যক রোগীর সার্জারির সিরিয়াল পূর্ণ হয়ে গেছে। চিকিৎসকদের কাছে কয়েকবার অনুরোধ করেও ছেলের চিকিৎসা করাতে পারেননি তিনি।

আবু জাফর বলেন, “বাড়ি থেকে আসতে একটু দেরি হয়ে গেছে। ছেলের দাঁত তোলার জন্য অনেক দূর থেকে এসেছি। ডাক্তারদের কাছে কয়েকবার অনুরোধ করেছি। কিন্তু তারা জানিয়েছেন, নির্ধারিত সংখ্যক রোগীর সিরিয়াল হয়ে গেছে।”

একইভাবে মুদাফফরগঞ্জ থেকে চিকিৎসা নিতে আসা কামরুন্নাহারকে দাঁত পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বাইরে থেকে রুট ক্যানেল চিকিৎসা করানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের ঘটনা নিয়মিতই ঘটছে।

দন্ত বিভাগ সূত্র জানায়, প্রয়োজনীয় সার্জারি যন্ত্রপাতির স্বল্পতার কারণে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ২০ জন রোগীর দাঁতের সার্জারি করা সম্ভব হয়। সাধারণত সিরিয়ালে থাকা প্রথম ২০ জন রোগীরই সার্জারি করা হয়। ফলে নির্ধারিত সংখ্যার বাইরে থাকা রোগীদের অন্যত্র চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

সপ্তাহে দুই দিন জটিল দাঁতের সার্জারির ব্যবস্থাও রয়েছে। বিভাগীয় তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে মোট ৫২২ জন রোগীর সার্জারি করা হয়েছে।

দন্ত বিভাগের অন্যতম বড় সংকট হলো ওপিজি মেশিন না থাকা। এ মেশিনের মাধ্যমে দাঁত ও চোয়ালের পূর্ণাঙ্গ এক্স-রে করা হয়। মেশিন না থাকায় প্রতিদিন অন্তত ২০ জন রোগীকে বাইরে থেকে এক্স-রে করিয়ে আনতে হচ্ছে। এতে রোগীদের অতিরিক্ত অর্থ ও সময় ব্যয় হচ্ছে।

এ ছাড়া দাঁত তোলার সময় ব্যবহৃত লোকাল অ্যানেস্থেশিয়ার ওষুধও হাসপাতালে পর্যাপ্ত নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অনেক রোগীকে বাইরে থেকে এসব ওষুধ কিনে আনতে হচ্ছে। ফিলিং এবং রুট ক্যানেল ট্রিটমেন্টের প্রয়োজনীয় সরঞ্জামেরও ঘাটতি রয়েছে।

বিভাগটিতে চিকিৎসক থাকলেও প্রয়োজনীয় সহায়ক জনবলের ঘাটতি রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী বিভাগে দুইজন কর্মচারী থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে একজনও নেই। রোগীদের সহায়তার জন্য বিভাগ নিজস্ব অর্থায়নে দুজন কর্মচারী রেখেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

চিকিৎসকদের ভাষ্য, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও জনবল না থাকায় রোগীদের কাক্সিক্ষত চিকিৎসা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বাধ্য হয়েই রোগীদের বাইরের চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠাতে হচ্ছে।

দন্ত বিভাগের জন্য ওয়ার্ড থাকলেও সেখানে রোগী ভর্তি নেই। এ বিষয়ে দন্ত বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. রোকেয়া জামান বলেন, নাক, কান ও গলা (ইএনটি) বিভাগে দুটি বেড দেওয়া হয়েছে। তবে সেগুলো ভাড়া করা। ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জারির জন্য প্রয়োজনীয় পদ না থাকায় দন্ত বিভাগের ওয়ার্ডের কার্যক্রম চালু করা যাচ্ছে না।

তবে এ বক্তব্যের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছেন ইএনটি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. শাজিবুর রশিদ। তিনি বলেন, সরকারি হাসপাতালের ওয়ার্ডের বেড ভাড়া দেওয়া বা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ইএনটি বিভাগের কোনো বেড দন্ত বিভাগকে ভাড়া দেওয়া হয়নি।

প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির চাহিদা দেওয়া হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে দন্ত বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. রোকেয়া জামান বলেন, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের চাহিদা দেওয়া হয়েছিল। এরপর আর নতুন করে চাহিদা দেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, “পরবর্তীতে পরিচালকের কার্যালয় থেকে নতুন করে চাহিদা চাওয়া হয়নি। এ কারণে আর চাহিদা দেওয়া হয়নি।”

হাসপাতালের (ভারপ্রাপ্ত) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. শাহজাহানও জানান, দন্ত বিভাগের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির জন্য ২০২৫ সালের জুলাই মাসে চাহিদা দেওয়া হয়েছিল। এরপর আর চাহিদা দেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, দন্ত বিভাগের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, ডেন্টাল চেয়ার ও জনবল নিশ্চিত করার পাশাপাশি ওয়ার্ডের কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

চিকিৎসক ও রোগীদের মতে, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের দন্ত বিভাগে চিকিৎসক থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবে রোগীরা সেবা থেকে বঞ্চিত হওয়া উদ্বেগজনক। দ্রুত প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও জনবল নিশ্চিত করা গেলে সরকারি হাসপাতালে দাঁতের চিকিৎসার ওপর রোগীদের আস্থা বাড়ার পাশাপাশি বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের চাপও কমবে।