• ঢাকা |

ইসলামী ব্যাংক: আস্থার লড়াই নাকি দখলের রাজনীতি?


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ১০ জুন, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

একজন শিক্ষক বন্ধু কল করে বললেন, “ ইসলামী ব্যাংকে আমার আমার একটি এমটিডিআর ম্যাচুরড হয়েছে। টাকা তুলতে চাইলে ম্যানেজার সাহেব বুঝিয়ে শুনিয়ে আদর আপ্যায়ন করে বিদায় দিলেন। টাকা দিলেননা। বললেন, দুশ্চিন্তা করবেননা, ২/৩ দিনের মধ্যে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে। আরও ২ টো ব্যাংকে টাকা রেখেছিলাম, এক টাকাও তুলতে পারছিনা। টেনশনে আছি, টাকা ফেরত পাবো তো?” 
আমার ধারণা, হাজারো আমানতকারীর মনের অবস্থাও আমার বন্ধুটির মতো। তারা জানতে চান—আসলে ইসলামী ব্যাংকে কী হচ্ছে? তাদের অর্থ কি নিরাপদ? আর এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী কে?

বাস্তবতা হলো, ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতি কেবল একটি ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়; এটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং আস্থার সংকটের বহিঃপ্রকাশ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আলোচনায় যতটা জায়গা পাচ্ছে রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, তার চেয়ে অনেক কম জায়গা পাচ্ছে ব্যাংকিং সুশাসনের প্রশ্ন।

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের আর্থিক খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। কয়েক দশক ধরে এটি দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক হিসেবে লক্ষ লক্ষ গ্রাহকের আস্থা অর্জন করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও অস্বীকার করার উপায় নেই যে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ব্যাংকটিকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রভাবের আলোচনা ছিল। বহু বছর ধরে জনপরিসরে একটি ধারণা বিদ্যমান যে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ব্যাংকটির একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। জামায়াতে ইসলামী আনুষ্ঠানিকভাবে এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করলেও বিভিন্ন সময়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, কিছু নিয়োগ, প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড এবং সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত নানা তথ্য সেই বিতর্ককে কখনো পুরোপুরি স্তিমিত হতে দেয়নি।

সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকটিকে কেন্দ্র করে যে আন্দোলন চলছে, সেটিও সেই পুরোনো বিতর্ককে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। একদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে ব্যাংকটিকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা হচ্ছে, অন্যদিকে বিরোধী পক্ষের অভিযোগ—এটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা। এই দুই অবস্থানের মধ্যে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্ত। কারণ তারা রাজনৈতিক বিজয়-পরাজয়ের হিসাব করতে চান না; তারা জানতে চান তাদের আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে কি না।

এখানে একটি মৌলিক সত্য স্মরণ করা জরুরি। ব্যাংকের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মূলধন নয়, তার ভবন নয়, এমনকি তার প্রযুক্তিও নয়; ব্যাংকের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো গ্রাহকের আস্থা। সেই আস্থা যখন ক্ষয় হতে শুরু করে, তখন আর্থিকভাবে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানও চাপে পড়তে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামী ব্যাংক থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আমানত উত্তোলনের খবর প্রকাশিত হয়েছে। এর পেছনে প্রকৃত কারণ নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু এটুকু নিশ্চিত যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক উত্তেজনা, আন্দোলন, কর্মবিরতি, গুজব এবং অনিশ্চয়তা সাধারণ মানুষের মনে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

তবে বর্তমান পরিস্থিতি বোঝার জন্য শুধু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর দিকে তাকালেই হবে না। ২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ কাঠামোতে যে বড় পরিবর্তন আনা হয়েছিল, সেটিও স্মরণ করা প্রয়োজন। তখনও যুক্তি ছিল—ব্যাংকটিকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রভাববলয় থেকে মুক্ত করা হচ্ছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এস আলম গ্রুপকে ঘিরে যে বিপুল ঋণ কেলেঙ্কারি, করপোরেট দখলদারিত্ব এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে, তা প্রমাণ করেছে যে এক ধরনের রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীগত প্রভাব সরিয়ে অন্য প্রভাব প্রতিষ্ঠা করলেই সুশাসন নিশ্চিত হয় না। বরং তখন প্রতিষ্ঠানটি নতুন ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ে।

এই অভিজ্ঞতা থেকেই আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—বর্তমানে যা হচ্ছে, তার লক্ষ্য কি সত্যিই পেশাদার ও অরাজনৈতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, নাকি এটি আরেক দফা প্রভাব পরিবর্তনের প্রক্রিয়া? এই প্রশ্নের উত্তর সরকারকেই দিতে হবে। কারণ জনগণ রাজনৈতিক বক্তৃতা নয়, বাস্তব ফলাফল দেখতে চায়। তারা জানতে চায়, ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা কী, খেলাপি ঋণ উদ্ধারে কী অগ্রগতি হয়েছে, অতীতের অনিয়মের জন্য কারা জবাবদিহির আওতায় এসেছে এবং নতুন নেতৃত্ব ব্যাংকের জন্য কী ধরনের সংস্কার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে।

একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিও প্রশ্ন রয়েছে। যদি কোনো ব্যাংককে দলীয় প্রভাবের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রতিষ্ঠানটি নিজেই। একটি ব্যাংক কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পদ নয়; এটি লাখো আমানতকারী, বিনিয়োগকারী এবং গ্রাহকের প্রতিষ্ঠান। ফলে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা যত বাড়বে, আস্থার সংকটও তত গভীর হবে।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সাম্প্রতিক ইতিহাস আমাদের একটি কঠিন শিক্ষা দিয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয় কখনো সুশাসনের নিশ্চয়তা নয়। ‘রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তকরণ’ শব্দবন্ধও তখনই অর্থবহ, যখন তার সঙ্গে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং পেশাদারিত্ব যুক্ত থাকে। অন্যথায় এটি কেবল এক গোষ্ঠীর জায়গায় আরেক গোষ্ঠীর প্রভাব প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়।

ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান সংকটের স্থায়ী সমাধান তাই কোনো রাজনৈতিক পক্ষের জয়ে নয়। সমাধান নিহিত রয়েছে একটি শক্তিশালী ও পেশাদার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার মধ্যে। পরিচালনা পর্ষদে গ্রহণযোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি, নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা, ঋণ বিতরণে কঠোর জবাবদিহিতা, খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে দৃশ্যমান অগ্রগতি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যকর নজরদারির মাধ্যমেই আস্থা পুনর্গঠন সম্ভব।

এ কথা বলা মোটেই অত্যুক্তি হবেনা যে, ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে চলমান বিতর্ক আসলে একটি বৃহত্তর জাতীয় প্রশ্নের প্রতিফলন। প্রশ্নটি হলো—বাংলাদেশ কি তার আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাব, গোষ্ঠীগত দখলদারিত্ব এবং ক্ষমতার প্রতিযোগিতা থেকে মুক্ত রাখতে পারবে? যদি পারে, তাহলে ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান সংকট একদিন কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। আর যদি না পারে, তাহলে ব্যক্তি বদলাবে, গোষ্ঠী বদলাবে, স্লোগান বদলাবে; কিন্তু সংকটের চরিত্র বদলাবে না। আর সেই মূল্য শেষ পর্যন্ত পরিশোধ করবে সাধারণ আমানতকারী এবং দেশের অর্থনীতি।

মো: মুখলেছুর রহমান।

[ইসলামী অর্থনীতিবিদ, সমাজচিন্তক ও মানবাধিকার কর্মী]