প্রকৃতি যখন ভয়াবহ রূপ ধারণ করে, দুর্যোগের কবলে পড়ে মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ে, তখন ধনী-গরিব, ধর্ম-বর্ণ, জাতি-গোষ্ঠি , পেশা, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে সকলের পরিচয় হয়ে উঠে-আমরা মানুষ। আর মানুষ হিসেবে বিপন্ন মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর পাশে দাঁড়ানো কেবল দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়; এটি আমাদের নৈতিক, মানবিক, সামাজিক এবং ধর্মীয় দায়িত্ব।
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল বিশেষত দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ জনপদে সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা সেই মানবিক দায়িত্বের কথাই আবারও আমাদের সামনে তুলে ধরেছে। পাহাড়ি ঢল, টানা ভারী বর্ষণ এবং নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি বহু এলাকাকে প্লাবিত করেছে। হাজার হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। অসংখ্য মানুষ ঘরবাড়ি, ফসল, গবাদিপশু, মাছের ঘের, দোকানপাট ও জীবিকার অবলম্বন হারিয়েছে। কোথাও সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, কোথাও বিশুদ্ধ পানির সংকট, আবার কোথাও খাদ্য, ওষুধ ও শিশুখাদ্যের তীব্র অভাব দেখা দিয়েছে। শিশু, নারী, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি। অন্যান্য প্রাণীকুলও চরম দুর্ভোগের শিকার হয়ে পড়েছে।
বন্যার ক্ষতি কেবল দৃশ্যমান অবকাঠামোর নয়; এর দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও গভীর। কৃষকের এক মৌসুমের ফসল নষ্ট হলে তার প্রভাব পুরো বছরের আয়ে পড়ে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর দোকান ভেসে গেলে পুঁজি হারিয়ে সে নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে হিমশিম খায়। দিনমজুর কাজ হারায়, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হয়, স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে এবং বহু পরিবার ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়ে। অর্থাৎ একটি বন্যা শুধু কয়েক দিনের দুর্যোগ নয়; এটি বহু মানুষের জীবনে দীর্ঘস্থায়ী সংকটের সূচনা করে। বহু প্রাণী মারা যায়। প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়।
এমন পরিস্থিতিতে সরকারের ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদ্ধার অভিযান, আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনা, জরুরি খাদ্য ও চিকিৎসাসেবা, নিরাপদ পানি সরবরাহ এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর ভূমিকা অপরিহার্য। তবে বাস্তবতা হলো, এত বড় দুর্যোগ মোকাবিলায় শুধু সরকারের একার পক্ষে সব চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। তাই সমাজের প্রতিটি সক্ষম ব্যক্তি, ব্যবসায়ী, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় সংগঠন এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদেরও এগিয়ে আসতে হবে।
বাংলাদেশের ইতিহাস বলে, জাতীয় দুর্যোগে মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। বন্যা, ঘূর্ণিঝড় কিংবা মহামারির সময় সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সহায়তা বহু অসহায় পরিবারকে নতুন করে বাঁচার আশা দিয়েছে। এই মানবিক ঐতিহ্যই আমাদের জাতীয় শক্তি।
ইসলাম মানুষের দুঃসময়ে সহযোগিতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কুরআনে সৎকাজ ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে একে অপরকে সহযোগিতা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণে সচেষ্ট থাকে, আল্লাহও তার প্রয়োজন পূরণ করেন।” এই শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো শুধু মানবিক কর্তব্য নয়; এটি মহান ইবাদতও। একইভাবে বিশ্বের অন্যান্য ধর্ম ও মানবিক দর্শনও অসহায় মানুষের প্রতি সহমর্মিতা ও সহযোগিতাকেই সভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ হিসেবে বিবেচনা করে।
এ সময় আমাদের আরেকটি বিষয় মনে রাখতে হবে—ত্রাণ কার্যক্রম যেন কেবল ছবি তোলা, প্রচারণা বা আত্মপ্রচারের মাধ্যম না হয়ে ওঠে। প্রকৃত মানবিকতা হলো মর্যাদা রক্ষা করে, বৈষম্যহীনভাবে এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দেওয়া। ত্রাণ বিতরণে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সুশৃঙ্খল সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে কোনো পরিবার সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হয় এবং কোনো ধরনের অপচয় বা অনিয়ম না ঘটে।
দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য কৃষি পুনর্বাসন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহজ ঋণ, শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর দ্রুত পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে মানুষকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে হবে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে নদী ব্যবস্থাপনা, খাল পুনঃখনন, কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, পাহাড় ধস ও জলাবদ্ধতা প্রতিরোধ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের বিকল্প নেই।
সারাদেশের বিভিন্ন এলাকা বিশেষত দক্ষিণ চট্টগ্রামের এই বন্যা আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে—দুর্যোগ মোকাবিলা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি একটি জাতীয় ও সামাজিক দায়িত্ব। আমাদের প্রত্যেকের সামর্থ্য ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু মানবিক দায়িত্ব সবার জন্য সমান। কেউ অর্থ দিয়ে, কেউ খাদ্য দিয়ে, কেউ ওষুধ দিয়ে, কেউ স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে, আবার কেউ রক্তদান বা উদ্ধারকাজে অংশ নিয়ে অবদান রাখতে পারেন। ছোট একটি সহায়তাও কোনো অসহায় পরিবারের জন্য নতুন জীবনের আশার আলো হয়ে উঠতে পারে।
আজ দুর্গত এলাকার মানুষের যে অসহায় অবস্থা, আগামীকাল তা দেশের অন্য কোনো অঞ্চলেরও হতে পারে। তাই মানবিক সংহতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলাই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। একটি সভ্য, দায়িত্বশীল ও কল্যাণমুখী সমাজ গড়তে হলে বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই মূল্যবোধকে আমাদের ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র—সব স্তরে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
কারণ একটি জাতির প্রকৃত শক্তি তার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে নয়; বরং সংকটের সময় মানুষ কতটা মানুষের পাশে দাঁড়ায়, তার মধ্যেই সেই জাতির প্রকৃত মহত্ত্বের পরিচয় নিহিত থাকে।
মো: মুখলেছুর রহমান।
অর্থনীতিবিদ, সমাজচিন্তক ও মানবাধিকার কর্মী।