এমএম রহমাতুল্লাহ: রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতিতে নতুন করে সামনে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন—পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন?
রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে স্পিকার নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন—সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদে এমন বিধানই রয়েছে। আর রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পর ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান রয়েছে সংবিধানের ১২৩(২) অনুচ্ছেদে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন সংসদ সদস্যদের ভোটে।
ফলে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের দায়িত্ব গ্রহণকে স্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর নির্বাচনের সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এখন মূল নজর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দিকে।
রাষ্ট্রপতি পদে সম্ভাব্য ব্যক্তিদের আলোচনা ঘিরে নতুন করে সামনে এসেছে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একটি অংশ মনে করছেন, দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি বৈদেশিক সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ড. ইউনূসকে রাষ্ট্রপতি পদে বিবেচনা করা হতে পারে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ড. ইউনূসকে রাষ্ট্রপতি করার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা সরকারি ঘোষণা পাওয়া যায়নি। বরং বিএনপির ভেতরে রাষ্ট্রপতি পদে একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতার নাম আলোচনায় রয়েছে।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও নজরুল ইসলাম খানসহ কয়েকজন অভিজ্ঞ নেতার নাম আলোচনায় এসেছে। দলীয় সূত্রের বরাতে আরও কয়েকজনের নাম নিয়েও আলোচনা চলছে। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী নির্ধারণের বিষয়টি দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অর্থাৎ, এই মুহূর্তে ড. ইউনূসের নামটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণের গুরুত্বপূর্ণ একটি সম্ভাবনা হলেও সেটিকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
ড. ইউনূসের নাম আলোচনায় আসার পেছনে সবচেয়ে বড় যুক্তি হিসেবে সামনে আসছে তাঁর আন্তর্জাতিক পরিচিতি ও কূটনৈতিক যোগাযোগ।
বাংলাদেশ বর্তমানে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতির একটি জটিল পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভারতকে ঘিরে নিরাপত্তা, সীমান্ত, বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের নতুন মাত্রা নিয়েও আলোচনা চলছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখাও সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এই বাস্তবতায় ড. ইউনূসের দীর্ঘ আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁর বৈশ্বিক পরিচিতি এবং বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারক মহলে পরিচিতি—রাষ্ট্রপতি পদে তাঁকে বিবেচনার একটি সম্ভাব্য রাজনৈতিক যুক্তি হিসেবে সামনে আসতে পারে।
তবে ‘আন্তর্জাতিক যোগাযোগ আছে’—এটি যেমন একটি বাস্তবতা, তেমনি তাঁর রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনা এবং সেই সম্ভাবনার রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা এখনো অনুমান ও রাজনৈতিক আলোচনার পর্যায়েই রয়েছে।
এদিকে ভারতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক যুব আন্দোলন দেশটির রাজনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করেছে। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলন দিল্লিসহ বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে এবং ভারতের বিরোধী দলগুলোও বিক্ষোভকারীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানায়।
তবে এই আন্দোলনে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অদৃশ্য সমর্থন’ রয়েছে—এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। ফলে এ ধরনের দাবিকে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক মহলে প্রচলিত একটি ধারণা বা অনুমান হিসেবে দেখা উচিত।
বাংলাদেশের জন্য মূল প্রশ্ন হলো—ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন বা অস্থিরতার সম্ভাব্য প্রভাব ভবিষ্যৎ ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কে কীভাবে পড়বে। বিশেষ করে পলাতক আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনা, সীমান্ত নিরাপত্তা, বাণিজ্য, পানি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো বিষয়ে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বর্তমান সরকারের সামনে আরেকটি বড় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হতে পারে বিদেশে অবস্থানরত পলাতক আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনা এবং পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা।
এই ধরনের কাজে শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক যোগাযোগ, আইনি প্রক্রিয়া, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতা।
এই জায়গায় ড. ইউনূসের আন্তর্জাতিক পরিচিতি ও যোগাযোগকে কেউ কেউ সম্ভাব্য সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন। সেই বিবেচনা থেকেই তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদে বসালে সরকার ও বিএনপির জন্য একটি আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ‘অভিভাবকসুলভ’ অবস্থান তৈরি হতে পারে—এমন রাজনৈতিক বিশ্লেষণও সামনে আসছে।
তবে এটি এখনো রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, কোনো সিদ্ধান্ত বা নিশ্চিত তথ্য নয়।
ড. ইউনূস যদি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিতে আগ্রহী না হন, তাহলে বিএনপির পরীক্ষিত ও প্রবীণ নেতাদের মধ্য থেকে কাউকে বেছে নেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এ ক্ষেত্রে স্পিকার ও বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকারী হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের নামও আলোচনায় আসতে পারে। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং বিএনপির দীর্ঘদিনের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তবে তিনিই পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হবেন—এমন কোনো সরকারি বা দলীয় ঘোষণা এখনো হয়নি।
বরং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আলোচনায় বিএনপির আরও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার নাম সামনে এসেছে। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে দলটির অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ড. ইউনূস রাষ্ট্রপতি হলে তাঁর আন্তর্জাতিক পরিচিতি বাংলাদেশের জন্য কাজে লাগতে পারে—এমন যুক্তির পাশাপাশি আরেকটি সম্ভাবনাও রাজনৈতিক আলোচনায় আসতে পারে। সেটি হলো, ভবিষ্যতে তিনি আন্তর্জাতিক কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে যেতে পারেন।
এমনকি কেউ কেউ তাঁকে জাতিসংঘের মহাসচিব পদে সম্ভাব্য ব্যক্তি হিসেবেও কল্পনা করছেন। তবে এটিও বর্তমানে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া বা নিশ্চিত তথ্য নয়। ফলে রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনার মতোই জাতিসংঘের মহাসচিব হওয়ার বিষয়টিকেও রাজনৈতিক অনুমান হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে বিএনপির ভেতরে আলোচনা থাকলেও দলীয় সিদ্ধান্তের পাশাপাশি সাংবিধানিক প্রক্রিয়াটিই চূড়ান্ত। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দলীয় সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য প্রার্থীর বিষয়ে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা চলছে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করছেন।
তাই এখনকার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন—রাষ্ট্রপতি পদে কি দলীয় অভিজ্ঞ কাউকে বেছে নেওয়া হবে, নাকি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বাইরে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত একজন ব্যক্তিকে সামনে আনা হবে?
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম সেই দ্বিতীয় সম্ভাবনার সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি। তাঁর আন্তর্জাতিক পরিচিতি, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা তাঁকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রাখছে।
কিন্তু শেষ কথা বলবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর এখন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ দায়িত্ব পালন করছেন। সংবিধান অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত এই ব্যবস্থা কার্যকর থাকবে।
অতএব, ‘কে হচ্ছেন পরবর্তী রাষ্ট্রপতি’—এই প্রশ্নের উত্তর এখনো অমীমাংসিত। তবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম যে আলোচনার বাইরে নয়, সেটিও অস্বীকার করার উপায় নেই।
আগামী কয়েক সপ্তাহের রাজনৈতিক আলোচনা, বিএনপির নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত এবং শেষ পর্যন্ত সংসদ সদস্যদের ভোটই নির্ধারণ করবে—বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতির আসনে কে বসছেন।