ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচন: উন্নয়ন, দুর্নীতি ও ভোট কারচুপি নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
ঠাকুরগাঁও সংবাদদাতা: ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন সামনে রেখে উন্নয়ন, দুর্নীতি, মাদক, সন্ত্রাস ও ভোটের পরিবেশ নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্যে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে নির্বাচনী মাঠ। আগামী ২৯ অক্টোবরের ভোটে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেনকে বিজয়ী করার আহ্বান জানিয়ে বিএনপির বিরুদ্ধে দুর্নীতি, দলীয়করণ ও নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলেছেন জামায়াতে ইসলামী ও ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা। একই সঙ্গে ঠাকুরগাঁওয়ে আধুনিক হাসপাতাল, কর্মসংস্থান, বিমানবন্দর চালু এবং শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রার্থী।
শনিবার সকালে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে দাঁড়িপাল্লার সমর্থনে ১১ দলীয় ঐক্য আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় এসব বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার, প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন এবং জোটের অন্যান্য কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতা।
জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, অতীতে ঠাকুরগাঁওয়ের উন্নয়নের জন্য বিপুল অর্থ বরাদ্দ এলেও সাধারণ মানুষ তার সুফল পায়নি। তাঁর দাবি, বরাদ্দের অর্থ বিএনপির নেতাদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা হয়েছে। আবারও বিএনপির প্রার্থী নির্বাচিত হলে উন্নয়নের অর্থের অপব্যবহার হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষকে কোনো একটি পরিবারের কাছে বন্দি রাখা যাবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের শোষণ থেকে মুক্তি এবং এলাকার উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ভোটারদের ২৯ অক্টোবর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দেওয়া উচিত।
নির্বাচনে কারচুপির আশঙ্কা প্রকাশ করে মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, পরাজয় নিশ্চিত বুঝতে পেরে বিএনপি জাতীয় নির্বাচনের মতো এই উপনির্বাচনেও ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ষড়যন্ত্র করছে। ভোটের ফল নিয়ে অনিয়মের চেষ্টা হলে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তাকে বেঁধে রাখার বক্তব্যও দেন তিনি। ভোটের সঠিক হিসাব নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কেন্দ্র না ছাড়তে স্থানীয় ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানান জামায়াতের এই নেতা।
তবে নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তা আইনসম্মতভাবে নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উত্থাপন করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
জনসভায় জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে বিএনপির নেতাদের বক্তব্যের সমালোচনা করে মিয়া গোলাম পরওয়ার পাল্টা অভিযোগ করেন, বিএনপি নিজেদের অতীত আড়াল করতে জামায়াতের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে বিএনপির কোনো বক্তব্য সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়নি।
জনসভায় দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন ঠাকুরগাঁওয়ের স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর গত ৫৫ বছরে এই আসন থেকে অনেকে সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী নির্বাচিত হলেও সাধারণ মানুষের জীবনমানের প্রত্যাশিত পরিবর্তন হয়নি। উন্নত চিকিৎসার জন্য ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষকে রংপুর ও দিনাজপুরে যেতে হয় এবং অনেক পরিবারকে চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গরু-ছাগল কিংবা জমিজমা বিক্রি করতে হয় বলে দাবি করেন তিনি।
নির্বাচিত হলে ঠাকুরগাঁওয়ে একটি আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা, রুহিয়া ও ভুল্লীতে পৃথক মা ও শিশু হাসপাতাল স্থাপন এবং প্রতিটি ইউনিয়নে কমিউনিটি ক্লিনিক চালুর প্রতিশ্রুতি দেন দেলাওয়ার হোসেন। তাঁর মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসাসেবা পাওয়া সহজ হবে এবং চিকিৎসার জন্য দূরবর্তী জেলায় যাওয়ার প্রবণতা কমবে।
কর্মসংস্থান সৃষ্টি প্রসঙ্গে তিনি ঠাকুরগাঁওয়ে একটি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানান। পাশাপাশি বন্ধ বিমানবন্দর চালু, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ঠাকুরগাঁওকে অর্থনৈতিক অঞ্চলে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
এ ছাড়া ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয় ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালু এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করার কথা বলেন এই প্রার্থী। সরকারি নিয়োগে দলীয়করণ করা হবে না বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়ে দেলাওয়ার হোসেন বলেন, নির্বাচিত হলে ব্যবসায়ীদের চাঁদা দিতে হবে না এবং ঠাকুরগাঁওকে মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত শান্তিপূর্ণ জনপদ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বিএনপি সরকারের সাত মাসেও ঠাকুরগাঁও থেকে মাদক নির্মূল হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। বিএনপির প্রার্থী ও নেতাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো তথ্য সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দেওয়া হয়নি।
ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দেন দেলাওয়ার হোসেন। তিনি বলেন, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকতে হবে।
উন্নয়ন বরাদ্দের অর্থ ব্যবহারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো বরাদ্দ পাওয়া গেলে তা জনগণের সামনে প্রকাশ করা হবে। অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হয়েছে, সেই হিসাবও জনসমক্ষে তুলে ধরা হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।
জনসভায় জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, এলাকার উন্নয়নের জন্য সংসদ সদস্য সরকারদলীয় নাকি বিরোধীদলীয়, সেটি মুখ্য নয়; বরং সৎ ও যোগ্য নেতৃত্বই উন্নয়নের প্রধান শর্ত।
তিনি দাবি করেন, বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য থাকাকালেও নিজ এলাকায় উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন। ভোটারদের আবেগ বা প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতিতে প্রভাবিত না হয়ে তাঁদের যোগ্যতা ও সততা বিবেচনা করে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিমও বিএনপি প্রার্থীকে ঘিরে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে অতীতের রাজনৈতিক অবস্থান, মামলা ও দুর্নীতির প্রসঙ্গ উঠে আসে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লা সিবগা বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নিয়ে সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, ক্ষমতায় যাওয়ার আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতির সঙ্গে ক্ষমতায় যাওয়ার পরের কর্মকাণ্ডের মিল নেই। দুর্নীতি, লুটপাট ও দলীয়করণ বন্ধে ভোটারদের ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা এনামুল হক মুসা গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্ন তুলে বিএনপি সরকারের সমালোচনা করেন। অন্যদিকে জাগপার সহসভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েমও দুর্নীতি, মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে দেলাওয়ার হোসেনের পক্ষে ভোট চান। তিনি বলেন, নির্বাচনে অনিয়মের চেষ্টা হলে তা রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
২৯ অক্টোবরের উপনির্বাচনকে সামনে রেখে ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা ভোটারদের কেন্দ্রে উপস্থিত থাকা, ভোটের হিসাব পর্যবেক্ষণ এবং ফলাফলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্যে নির্বাচনী অনিয়মের আশঙ্কা এবং ভোটাধিকার রক্ষার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে জনসভায় উত্থাপিত অভিযোগগুলো মূলত সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য ও দাবি। এগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। একইভাবে নির্বাচনের পরিবেশ, প্রশাসনের ভূমিকা এবং ভোট গণনার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের ভোটারদের কাছে এবার স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, যোগাযোগব্যবস্থা, মাদক নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি প্রতিরোধ ও নাগরিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করবে ভোটাররা কোন প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলের প্রতিশ্রুতির ওপর আস্থা রাখছেন।
জনসভায় সভাপতিত্ব করেন ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক বেলাল উদ্দীন প্রধান। সঞ্চালনা করেন জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মোহাম্মদ আলমগীর। এ ছাড়া জামায়াত, ইসলামী ছাত্রশিবির, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জাগপা ও ১১ দলীয় ঐক্যের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা বক্তব্য দেন।