আবুল কালাম আজাদ,রাজশাহী: হঠাৎ বিকট শব্দ, মুহূর্তেই ইঞ্জিন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল দুটি বগি। সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু হয় যাত্রীদের মধ্যে। তবে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি।
১২ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের বামনডাঙ্গা রেলস্টেশন থেকে বুড়িমারী এক্সপ্রেস ছাড়ার সময় এ ঘটনা ঘটে।
ঘটনার পর অন্তত তিন ঘণ্টা ওই লাইনে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে। তবে অন্য লাইনে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক থাকায় যাত্রীদের তেমন ভোগান্তি হয়নি। পরে লালমনিরহাট থেকে করতোয়া এক্সপ্রেসের মাধ্যমে নতুন হুক এনে জরুরি ভিত্তিতে মেরামতের কাজ সম্পন্ন করা হয়। এরপর ট্রেনটি পুনরায় গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে যায়।
বামনডাঙ্গা রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার হাউয়ুল মিয়া ঘটনাটি নিশ্চিত করে বলেন, ‘ বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেনি। ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা বুড়িমারী এক্সপ্রেস বামনডাঙ্গা স্টেশনে যাত্রাবিরতির পর ছাড়ার মুহূর্তে ‘ক-খ’ ও ‘ট-ঠ’ বগির সংযোগ হুক বিকট শব্দে ছিঁড়ে যায়। এতে ট্রেনটি হঠাৎ থেমে যায় এবং যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি।দ্রুত বগি সংযোগ ও মেরামত করে ট্রেনটি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
কোচ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনা এখন নিয়মিত সমস্যা:-
----------------------------------------------------------------------
বাংলাদেশ রেলওয়েতে বাফার ভাঙন ও কোচ আলাদা হয়ে যাওয়ার ঘটনা নতুন নয়। সম্প্রতি এটি নিয়মিত সমস্যায় পরিণত হয়েছে। ১ সেপ্টেম্বর রাত ১০টা ১০ মিনিটে
চট্টগ্রামের পটিয়ায়, কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেনের ইঞ্জিনের বাফার হুক ভেঙে গিয়ে ইঞ্জিন থেকে ১৮টি বগি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পটিয়া রেলস্টেশনের স্টেশনমাস্টার রাশেদুল আলম জানান, চন্দনাইশের দোহাজারী অতিক্রম করে পটিয়ায় প্রবেশের সময় ট্রেনটির ইঞ্জিনের বাফার ভেঙে যায়।
জুলাই মাসে বেশ কয়েকটি স্থানে ট্রেনে বাফার ভাঙন ও কোচ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে।
রেল সংশ্লিষ্টদের দাবি, মানহীন যন্ত্রপাতি, নড়বড়ে ফিটিং এবং দুর্বল কাপলিংয়ের কারণে চলন্ত অবস্থায় সামান্য ঝাঁকুনিতেই বাফার হুক ভেঙে ট্রেন পার্টিং (ইঞ্জিনের হুক ভেঙে বগি বিচ্ছিন্ন) হচ্ছে।
১২ সেপ্টেম্বর গাইবান্ধার বামনডাঙ্গায় হুক ছিড়ে বগি বিছিন্নের ঘটনা ছাড়াও গত তিন মাসে নাটোর, চিলমারী, নেত্রকোনা ও সিলেট ও চট্রগ্রমসহ বিভিন্ন স্থানে, বিভিন্ন ট্রেনের একাধিকবার কোচ আলাদা হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। কখনো সামনের বগি আবার কখনো মধ্যের বগি কখনো পেছনের বগি বিছিন্নের ঘটনা ঘটছে।
এরমধ্যে ১৮ আগস্ট মহানগর এক্সপ্রেস ট্রেনের ১০২৩ ও ৬২০৪ কোচের কাপলিং চলন্ত অবস্থায় ভেঙে যায়।
২৬ জুলাই কক্সবাজার এক্সপ্রেসের গার্ড ব্রেক বগির হুক ভেঙে গিয়ে মূল ট্রেন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার গোমদণ্ডী স্টেশনে প্রায় ৩০ মিনিট ট্রেন আটকে থাকার পর বিচ্ছিন্ন বগি ফেলে মূল ট্রেন চট্টগ্রামের উদ্দেশে ছেড়ে যায়।পরদিন ২৭ জুলাই বোয়ালখালী এলাকায় কক্সবাজার এক্সপ্রেসে আবারও ঘটে বাফার ভাঙার ঘটনা ঘটে। এছাড়া পাহাড়িকা এক্সপ্রেসের কোচ নং WEC 2302 ও 1099 এও একই ধরনের সমস্যা দেখা দেয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পশ্চিম রেলের এক কর্মকর্তা বলেন, “রেল কোচে প্রতিনিয়ত পার্টিং ও বাফার ভাঙছে। যদিও বড় দুর্ঘটনা ঘটেনি, কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত কেনাকাটা, ত্রুটিপূর্ণ বাফার সরবরাহ এবং প্রতিস্থাপনের কারণেই বারবার এই সমস্যা হচ্ছে। যাত্রীদের জন্য এটি খুবই উদ্বেগজনক।”তিনি আরও বলেন, যাত্রীরা ট্রেনে ভ্রমণ করলেও সবসময় আশঙ্কায় থাকেন ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যাবে নাকি বগি রেখেই ট্রেন চলে যাবে।
অনিয়ন্ত্রিত কেনাকাটা, ত্রুটিপূর্ণ বাফার সেট সরবরাহ সহ প্রতিস্থাপনের কারনেই রেলে বারবার ট্রেন পার্টিং হচ্ছে। রক্ষণাবেক্ষণে অনিয়ন্ত্রিত ব্যায় নয় বরং অনিয়ন্ত্রিত কেনাকাটা বন্ধ করে সচ্ছতা ও দায়িত্বশীলদের জবাবদিহির আওতায় আনলে নিরাপদ ট্রেন পরিচালনা সম্ভব হবে।
রেলের একটি সূত্রে জানায়, একটি পূর্ণাঙ্গ বাফার সেটের ক্রয়মূল্য সর্বনিম্ন ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা এবং একটি বাফার শেং-এর দামই ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা।
একটি পূর্ণাঙ্গ বাফার সেটের আনুমানিক মেয়াদকাল সর্বনিম্ন ১০ বছর হলেও এক বছরের বেশি সময় একটি বাফার শেং ব্যবহার করা যায় না। তবে বর্তমানে অসংখ্য পুরোনো মেয়াদোত্তীর্ণ বাফার দিয়েই চলছে ট্রেন । আর তাই পদে পদে ঘটছে এমন দুর্ঘটনা।
পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে সূত্রে জানাযায়, ২০১২ সালে ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ে বাফার শেং পরীক্ষা করার জন্য অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় মেশিন কেনা হলেও তা একদিনের জন্যও ব্যবহার হয়নি। বর্তমানে পাহাড়তলী ওয়ার্কশপে নষ্ট অবস্থায় পড়ে আছে মেশিনটি।
সূত্রটি আরো জানায়, একটি ট্রেনের ভার বহনের সক্ষমতা ১৬ থেকে ২২ বগি, তবে বর্তমানে ইঞ্জিন সংকটের কারণে ট্রেনগুলোতে ২২ থেকে ২৫ টি বগি ব্যবহার করা হচ্ছে। আর তাই অতিরিক্ত লোড নিতে না পেরেও এমন দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
পশ্চিম রেলের প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলী সাদেকুর রহমান বলেন, কারখানার সক্ষমতা কম থাকার কারণে শিডিউল ওভারডিউ অবস্থায় কোচসমূহ চলাচল করে। ফলে নিয়মিত যন্ত্রাংশসমূহ পরীক্ষা বা পরিবর্তন করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে এ ধরণের বিকলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে পশ্চিমাঞ্চলে এ ধরণের ঘটনা কম। আমরা চেকিং আরো জোরদার করেছি।
রেলওয়ে অতিঃ মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) আহমেদ মাহবুব বলেন,সকল দুর্ঘটনা বিশ্লেষনে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।তদন্ত প্রতিবেদন স্বাপেক্ষে সমস্যাগুলোর সমাধের ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে