• ঢাকা |

সাম্প্রদায়িক রবীন্দ্রনাথ এবং বিএনপি নেতাদের রবীন্দ্রভক্তি


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ১০ মে, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

পশ্চিম বাংলা বিধান সভা নির্বাচনে বিজিপি’র হাসিনার স্টাইলে ভোটচুরির বিজয়ে সেখানে মুসলিমদের উপর আক্রমণ শুরু হয়েছে। মসজিদে ঢুকে এবং পথে ঘাটে মুসলিমদের উপর মারধর শুরু হয়েছে। তাদের ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ভাঙা হচ্ছে। ইরান, তুরস্ক ও পাকিস্তান সরকার ভারতের বিরুদ্ধে নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে নতজানু বিএনপি সরকার নিশ্চুপ। এখন পর্যন্ত তারা কোন নিন্দা জানায়নি। বরং বিএনপি নেতারা ময়দানে রবীন্দ্র ভক্তি দেখাতে নেমেছে। সম্প্রতি বিএনপির মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, রবীন্দ্রনাথকে যারা সাম্প্রদায়িক বলে তাদের রয়েছে জ্ঞানের অভাব। অথচ জ্ঞানের অভাব তো মির্জা ফখরুলের।  রবীন্দ্রনাথের লেখনী পড়লে তিনি বুঝতে পারতেন, কত বড় সাম্প্রদায়িক ছিল রবীন্দ্রনাশ। প্রমাণ হলো রবীন্দ্রনাথের নিজের লেখনী। নিচে রবীন্দ্রনাথের লেখা থেকে উদ্ধৃতি দেয়া গেল:

১।  

খুন করাটা যেখানে ধর্ম, সেখানে না করাটাই পাপ। যে মুসলমান আমাদের ধর্ম নষ্ট করেছে তাদের যারা মিত্র তাদের বিনাশ না করাই অধর্ম।

— প্রায়শ্চিত্ত, নাটক

২। 

‘আল্লা হো আকবর’ শব্দে রণভূমি প্রতিধ্বনিত হইয়া উঠিয়াছে। একদিকে তিনলক্ষ যবনসেনা, অন্যদিকে তিন সহস্র আর্যসৈন্য। হর হর বোম্ বোম্! পাঠক বলিতে পার, কে ঐ দৃপ্ত যুবা পঁয়ত্রিশ জন মাত্র অনুচর লইয়া মুক্ত অসি হস্তে অশ্বারোহণে ভারতের অধিষ্ঠাত্রী দেবীর কর নিক্ষিপ্ত দীপ্ত বজ্রের ন্যায় শত্রু সৈন্যের উপরে আসিয়া পতিত হইল? বলিতে পার, কাহার প্রতাপে এই অগণিত যবন সৈন্য প্রচণ্ড বাত্যাহত অরণ্যানীর ন্যায় বিক্ষুব্ধ হইয়া উঠিল?— কাহার বজ্রমন্দ্রিত ‘হর হর বোম্ বোম্’ শব্দে তিন লক্ষ ম্লেচ্ছকণ্ঠের ‘আল্লা হো আকবর’ ধ্বনি নিমগ্ন হইয়া গেল? ইনিই সেই ললিত সিংহ। কাঞ্চীর সেনাপতি। ভারত-ইতিহাসের ধ্রুব নক্ষত্র।

— রীতিমত নভেল, গল্প

৩। 

ভালো মানুষি ধর্ম নয়; তাতে দুষ্ট মানুষকে বাড়িয়ে তোলে। তোমাদের মহম্মদ সে কথা বুঝতেন, তাই তিনি ভালোমানুষ সেজে ধর্ম প্রচার করেন নি।

— গোরা, উপন্যাস

৪।  

নীরব হইল জয়-কোলাহল,

নীরব সমর বাদ্য।

প্রভু কেন আজি—কহে রঘুনাথ,—

অসময়ে পথ রুধিলে হঠাৎ,

চলেছি করিতে যবন-নিপাত

যোগাতে যমের খাদ্য। 

— কথা, কবিতা 

 

৫।  

❝ মুসলমান বিদ্বেষ বলিয়া আমরা আমাদের জাতীয় সাহিত্য বিসর্জন দিতে পারি না। মুসলমানদের উচিত নিজেদের জাতীয় সাহিত্য নিজেরাই সৃষ্টি করা।

নওয়াব আলী চৌধুরী বঙ্কিমের উগ্র মুসলিম বিদ্বেষী সাহিত্য প্রচার বন্ধের প্রতি রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টি আকর্ষন করলে, এর উত্তরে। 

— সলিমুল্লাহ খান, ‘সাম্প্রদায়িকতা’, বণিক বার্তা ২০ অক্টোবর, ২০১২

৬। 

❝ কিছুদিন হইল একদল ইতর শ্রেণীর অবিবেচক মুসলমান কলিকাতার রাজপথে লোষ্ট্র খন্ড হস্তে উপদ্রবের চেষ্টা করিয়াছিল। তাহার মধ্যে বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে- উপদ্রবের লক্ষ্যটা বিশেষরূপে ইংরেজদেরই প্রতি। তাহাদের শাস্তিও যথেষ্ট হইয়াছিল। প্রবাদ আছে- ইটটি মারিলেই পাটকেলটি খাইতে হয়; কিন্তু মূঢ়গণ (মুসলমান) ইটটি মারিয়া পাটকেলের অপেক্ষা অনেক শক্ত শক্ত জিনিস খাইয়াছিল। অপরাধ করিল, দণ্ড পাইল। এই নিম্নশ্রেণীর মুসলমানগণ সংবাদপত্র পড়েও না, সংবাদপত্রে লেখেও না। একটা ছোট বড়ো কাণ্ড – হইয়া গেল অথচ এই মূঢ় (মুসলমান) নির্বাক প্রজা সম্প্রদায়ের মনের কথা কিছুই বোঝা গেল না। 

— কণ্ঠরোধ, ভারতী, বৈশাখ-১৩০৫

৭। 

জ্বল জ্বল চিতা ! দ্বিগুন দ্বিগুন

পরান সপিবে বিধবা বালা

জ্বলুক জ্বলুক চিতার আগুন

জুড়াবে এখনই প্রাণের জ্বালা

শোনরে যবন, শোনরে তোরা

যে জ্বালা হৃদয়ে জ্বালালি সবে

স্বাক্ষী রলেন দেবতার তার

এর প্রতিফল ভুগিতে হবে। 

— সতীদাহ, কবিতা

৮। 

❝ কোরআন পড়তে শুরু করেছিলুম কিন্তু বেশিদূর এগুতে পারিনি আর তোমাদের রসুলের জীবন চরিতও ভালো লাগেনি।

— সৈয়দ মুজিবুল্লা, বিতণ্ডা, পৃ-২২৯

৯। 

❝ যে মুসলমানকে আজ ওরা প্রশ্রয় দিচ্ছে সেই মুসলমানেরাই একদিন মুষল ধরবে।

 

— অমিয় চক্রবর্তীতে লেখা চিঠি, ১৫/১১/১৯৩৪, চিথিপত্র: ১১

১০। 

❝ যদি মুসলমান সমাজ মারে আর আমরা পড়ে পড়ে মার খাই, তবে জানব, এ সম্ভব হয়েছে শুধু আমাদের দুর্বলতা।

— রবীন্দ্র রচনাবলী, জ.শ.স., ১৩ খণ্ড, পৃ: ৩১৭, কালান্তর।

১১। 

❝ চল্লিশ লাখ হিন্দু একলাখ মুসলমানদের ভয়ে মারাত্নকভাবে অভিভূত।

— আনন্দবাজার পত্রিকার সাথে সাক্ষাৎকার ৫/৯/১৯২৩

১২। 

❝ একদা ঐ তর্করত্নের প্রপৌত্রীমন্ডলীকে মুসলমানেরা যখন জোর করে কলেমা পড়াবে তখন পরিতাপ করার সময় থাকবে না।

— হেমন্তবালা দেবীকে লেখা চিঠি। ১৬/১০/১৯৩৩ চিঠিপত্র:৯

১৩। 

❝ কোন বিশেষ প্রয়োজন না থাকলেও হিন্দু নিজেই মারে, আর প্রয়োজন থাকলেও হিন্দু অন্যকে মারতে পারে না। আর মুসলমানেরা বিশেষ প্রয়োজন না ঘটলেও নিজেকে দৃঢ়ভাবে রক্ষা করে, আর প্রয়োজন হলে অন্যকে বেদম মার দিতে পারে। ❞ 

— রবীন্দ্র রচনাবলী, জ.শ.স., ১৩ খণ্ড, পৃ: ৩১৭, কালান্তর

১৪। 

বৌ ঠাকুরানীর হাট’ উপন্যাসে প্রতাব চরিত্রের মুখ দিয়ে ম্লেচ্ছদের (অপবিত্র মুসলমানদের) দূর করে আর্য ধর্মকে রাহুর গ্রাস থেকে মুক্ত করার সংকল্প করে।

১৫। 

সমস্যাপূরণ’ গল্পে মুসলমান চরিত্রকে জারজ ও খুনি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

১৬। 

দুরাশা’ গল্পে দেখানো হয়েছে, মুসলিম পরিবারের মধ্যে কোন ধর্ম চর্চা নেই। একজন মুসলিম নারীর এক ব্রাহ্মণের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ এবং ব্রাহ্মণ হবার প্রাণান্তকর চেষ্টা ।

১৭। 

রবী ঠাকুরের জমিদারির কাছারি বাড়িতে হিন্দু প্রজাদের বসবার জন্য পাটি পেতে দেওয়া হতো আর মুসলিম প্রজাদের জন্য ছিল পাটি ছাড়া মাটিতে বসার ব্যবস্থা।

— যতীন সরকার, পাকিস্তানের জন্মমৃত্যু দর্শন, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী, ৯৯

১৮। 

হর হর হর 

শুধু তব নাম আজি পিতৃলোক হতে এল নামি,

করিল আহ্বান--

মুহূর্তে হৃদয়াসনে তোমারেই বরিল, হে স্বামী,

বাঙালির প্রাণ।

এক ধর্মরাজ্য হবে এ ভারতে’ এ মহাবচন

করিব সম্বল।।

মারাঠির সাথে আজি, হে বাঙালি, এক কণ্ঠে বলো

‘জয়তু শিবাজী’।

— শিবাজি উৎসব, কবিতা

১৯। 

পৃথ্বীরাজ পরাজয় গ্রন্থে মুসলিম শাসকদের, বিশেষত মোহাম্মদ ঘোরীর প্রতি মিথ্যা অপবাদ আরোপ করে খুবই নোংরা ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। 

২০। 

‘রুদ্রচণ্ড’-এ মুসলিম আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে হিন্দু প্রতিরোধের গল্প রয়েছে। 

২১। 

সরোজিনী বা চিতোর আক্রমণ’: রবীন্দ্রনাথের ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথের নাটক ‘সরোজিনী বা চিতোর আক্রমণ’-এর সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। এই নাটকে মুসলিম শাসকদের, মুসলিম বীরদেরকে ‘অস্পৃশ্য যবন’ বলা গালাগালি করা হয়েছে।

সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে অনেক সময়েই কোনো জাতি বা গোষ্ঠীকে ঘৃণার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার প্রাথমিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সমাজবিজ্ঞানের পরিভাষায় এই প্রক্রিয়াই ‘Othering’ বা ‘অপরীকরণ’—যেখানে একটি গোষ্ঠীকে ধীরে ধীরে ‘অপর’, ‘অবমানব’ বা ‘হুমকি’ হিসেবে নির্মাণ করা হয়। বাঙলা সাহিত্যে এই প্রবণতার স্পষ্ট। বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথেরা মুসলমান চরিত্রগুলোকে নেতিবাচক, ডাকাত, জারজ, দখলকারী, ভিনদেশী, পশ্চাৎপদ বা ‘উন-মানুষ’ রূপে উপস্থাপন করেছে।

উপন্যাসের আড়ালে যে বয়ান নির্মিত হয়েছিল—যেখানে মুসলমান এবং মুসলমান শাসনকে ‘অন্ধকার যুগ’ এবং জাত-পাত, সতীদাহ করা পালন করা অতীত সময়কে ‘স্বর্ণযুগ’ হিসেবে চিত্রিত করা হয়—এটা নিছক সাহিত্যিক কল্পনা ছিল না; বরং একটি সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ। এই বয়ানের ভাষা, রূপক, চরিত্রায়ণ—সবই সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে উসকে দিয়েছে এবং।আরএসএসের উগ্র জাতীয়তাবাদের মতাদর্শিক ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

আজকের পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির উত্থানকে এই সাহিত্যিক ঐতিহ্য থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না। বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথের লেখায় যে জাতীয়তাবাদের বীজ রোপিত হয়েছিল, সেটাই রাজনৈতিক হিন্দুবাদের জন্য উর্বর মাটি তৈরি করেছে। আধুনিক উগ্রবাদী রাজনীতির শিকড় নিহিত রয়েছে সেই সাহিত্যচর্চার মধ্যেই, যা ‘অপরীকরণ’-এর সাংস্কৃতিক কাঠামোকে স্বাভাবিক করে তুলেছিল।

সেদিক দিয়ে এটা বলা যায়, আজকে পশ্চিম বাংলা বা ভারতে উগ্রবাদী বিজেপির জয়-জয়কার বঙ্কিম, রবীন্দ্রের সাহিত্যচর্চার বাই-প্রোডাক্ট।