মো: মুখলেছুর রহমান: বাংলাদেশের সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানে একটি অলিখিত সংস্কৃতি বহু বছর ধরে চলে আসছে। নতুন কোনো কর্মকর্তা যোগদান করলে, কোনো পদস্থ ব্যক্তি পরিদর্শনে এলে, পদোন্নতি পেলে কিংবা বিদায় নিলে ফুলের তোড়া, দীর্ঘ শুভেচ্ছা পর্ব, ফটোসেশন, ব্যানার, স্মারক প্রদান এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের এক প্রতিযোগিতা শুরু হয়। সৌজন্য প্রকাশের এই রীতি ধীরে ধীরে এমন এক আনুষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের মূল কাজকে ব্যাহত করছে।
সৌজন্য ও সম্মান প্রদর্শন অবশ্যই একটি সভ্য কর্মপরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু যখন আনুষ্ঠানিকতা কর্মদক্ষতার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়, তখন তা পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। একজন কর্মকর্তার প্রকৃত মর্যাদা তাঁর পদ নয়, তাঁর কর্ম, সততা, নেতৃত্ব, দক্ষতা ও জনসেবার মানসিকতায় নিহিত। ফুলের তোড়া সেই মূল্যায়নের বিকল্প হতে পারে না।
এই আনুষ্ঠানিকতার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় কর্মঘণ্টার অপচয়ের মাধ্যমে। একটি সাধারণ ফুলেল শুভেচ্ছা অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য ফুল সংগ্রহ, অতিথি সমন্বয়, কর্মচারীদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো, আলোকচিত্র ও ভিডিও ধারণ, বক্তব্য, আপ্যায়ন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের কাজে বহু কর্মকর্তা-কর্মচারী দীর্ঘ সময় ব্যয় করেন। অনেক প্রতিষ্ঠানে পুরো অফিসের স্বাভাবিক কার্যক্রম এক থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। যদি দেশের শত শত সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন এ ধরনের অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে বছরে লাখ লাখ কর্মঘণ্টা শুধু আনুষ্ঠানিকতার পেছনেই ব্যয় হয়।
এই কর্মঘণ্টার অর্থনৈতিক মূল্যও কম নয়। সরকারি কর্মচারীদের বেতন জনগণের করের অর্থ থেকে আসে। ফলে যে সময় জনগণের সেবা, ফাইল নিষ্পত্তি, প্রকল্প বাস্তবায়ন বা নীতি প্রণয়নের কাজে ব্যয় হওয়ার কথা, সেই সময় যদি ফুলের তোড়া গ্রহণ, ছবি তোলা ও আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছা বিনিময়ে ব্যয় হয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ নাগরিকই। ফাইল জমে থাকে, সেবাপ্রার্থী অপেক্ষা করেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ বিলম্বিত হয় এবং প্রশাসনের দক্ষতা কমে যায়।
আরও একটি অস্বস্তিকর দিক হলো, অনেক ক্ষেত্রে এসব অনুষ্ঠান স্বতঃস্ফূর্ত সৌজন্যের সীমা অতিক্রম করে তোষামোদ ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করে। অধস্তন কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা অনেক সময় বাধ্যবাধকতার অনুভূতি থেকে কিংবা ঊর্ধ্বতনকে সন্তুষ্ট করার প্রত্যাশায় ব্যয়বহুল ফুলের তোড়া, স্মারক ও নানা আয়োজন করেন। এতে প্রতিষ্ঠানে মেধা, কর্মদক্ষতা ও জবাবদিহিতার পরিবর্তে ব্যক্তিনির্ভর সংস্কৃতি শক্তিশালী হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
শুধু যোগদান নয়, বিদায় সংবর্ধনা, জন্মদিন উদ্যাপন, দীর্ঘ শুভেচ্ছা সভা, অপ্রয়োজনীয় ব্যানার-ফেস্টুন, অসংখ্য গ্রুপ ছবি, ভিডিও ধারণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের প্রতিযোগিতাও একই ধরনের প্রবণতার অংশ। অনেক সময় একটি সংক্ষিপ্ত প্রশাসনিক সভার তুলনায় ছবি তোলার পর্বই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘ হয়। কোথাও কোথাও একটি পরিদর্শন কর্মসূচির বড় অংশই ব্যয় হয় আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা ও বিদায় আয়োজনে, অথচ মূল কাজের জন্য সময় কমে যায়।
বিশ্বের উন্নত প্রশাসনিক ব্যবস্থায় কর্মকর্তাদের স্বাগত জানানো হয় সংক্ষিপ্ত পরিচিতি, করমর্দন বা ছোট একটি আনুষ্ঠানিক সভার মাধ্যমে। সেখানে গুরুত্ব দেওয়া হয় কর্মপরিকল্পনা, লক্ষ্য নির্ধারণ এবং দ্রুত কাজে ফিরে যাওয়ার ওপর। কারণ আধুনিক প্রশাসনের মূল দর্শন হলো—সময়ই সম্পদ, আর কর্মঘণ্টাই উৎপাদনশীলতার ভিত্তি।
বাংলাদেশেও এখন দক্ষতা, সুশাসন ও ব্যয়সংকোচনের কথা গুরুত্বের সঙ্গে বলা হচ্ছে। ডিজিটাল সেবা, স্মার্ট প্রশাসন, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ফলাফলভিত্তিক ব্যবস্থাপনার যুগে পুরোনো আনুষ্ঠানিকতার সংস্কৃতি নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা, যাতে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে অপ্রয়োজনীয় ফুলেল সংবর্ধনা, দীর্ঘ আনুষ্ঠানিকতা এবং কর্মঘণ্টা নষ্ট করে এমন আয়োজন নিরুৎসাহিত করা হয়।
এর অর্থ এই নয় যে সম্মান প্রদর্শন বন্ধ করতে হবে। বরং সম্মান প্রকাশ হোক আন্তরিক শুভেচ্ছা, পেশাদার আচরণ, সময়ানুবর্তিতা, দায়িত্বশীল কর্মসম্পাদন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্যের মাধ্যমে। চাইলে একটি বই, একটি গাছের চারা কিংবা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব স্মারকও সৌজন্যের প্রতীক হতে পারে—যার ব্যবহারিক ও দীর্ঘমেয়াদি মূল্য রয়েছে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি রাষ্ট্রের অগ্রগতি শুধু বড় বড় প্রকল্পের ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে প্রতিটি কর্মঘণ্টার যথাযথ ব্যবহারের ওপরও। যে প্রশাসন সময়কে সম্মান করে, সেই প্রশাসনই জনগণের আস্থা অর্জন করে। তাই ফুলের তোড়ার জাঁকজমক নয়, কর্মদক্ষতা, জবাবদিহিতা, মিতব্যয়িতা এবং জনসেবাকেই প্রশাসনিক সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসার সময় এখনই। কর্মঘণ্টা বাঁচুক, জনসেবা বাড়ুক—এটাই হোক নতুন কর্মসংস্কৃতির অঙ্গীকার।
মো: মুখলেছুর রহমান।
অর্থনীতিবিদ, রাষ্ট্রচিন্তক ও মানবাধিকার কর্মী