• ঢাকা |

গোলামী না আজাদী: সাতচল্লিশ থেকে চব্বিশের মহাজাগরণ


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ১১ মে, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

লায়ন উমার রাযী: বাংলার ইতিহাসের বাঁকগুলো অদ্ভুত এক চক্রে আবর্তিত। ১৭৫৭ সালের সেই পলাশীর আম্রকাননে যে ট্র্যাজেডির শুরু, তার রেশ যেন আজও কাটেনি। আমরা বারবার শৃঙ্খল ভেঙেছি, কিন্তু প্রতিবারই নব্য শৃঙ্খল আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। ১৯৪৭, ১৯৭১ কিংবা ২০২৪-প্রতিটি সালই আমাদের কাছে মুক্তির একেকটি বার্তা নিয়ে এসেছিল, কিন্তু বারবারই 'জগত শেঠ' আর 'মীর জাফর'দের প্রেতাত্মারা আমাদের সেই আজাদী নস্যাৎ করার চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছে।

ঔপনিবেশিক দুঃশাসন ও বঞ্চনার ইতিহাস-

প্রায় ১৯০ বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়েছি আমরা। সাদা বানিয়া আর স্বার্থান্বেষী জমিদার শ্রেণি মিলে এই জনপদের মানুষের রক্ত শুষে নিয়েছে। নীল চাষের নিষ্ঠুরতা থেকে শুরু করে ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কে বিপ্লবীদের ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলানো সবই ছিল এক পরিকল্পিত নিধনযজ্ঞ। আমাদের পূর্বপুরুষদের শ্রমের ঘামে গড়ে উঠেছে কলকাতার শান-শওকত, অথচ আমাদের কপালে জুটেছে অবজ্ঞা। তিতুমীর আর হাজী শরীয়তুল্লাহর মতো বীরদের কপালে তকমা দেওয়া হয়েছে 'সন্ত্রাসী' কিংবা 'মৌলবাদী'র। সেই দুঃসহ শৃঙ্খল থেকে আমরা প্রথম মুক্তির স্বাদ পেয়েছিলাম সাতচল্লিশে। কিন্তু তা কি প্রকৃত আজাদী ছিল?

পাকিস্তান আমল: শোষণের নতুন রূপ-

সাতচল্লিশে ব্রিটিশদের বিদায় হলেও মীর জাফরদের হাত থেকে আমাদের নিস্তার মেলেনি। পূর্ব বাংলার গণমানুষের ভোটে পাকিস্তান কায়েম হলেও ক্ষমতা কুক্ষিগত করে আইয়ুব শাহীর আমলারা। কলকাতার কিছু সুবিধাবাদী শ্রেণি পাকিস্তানে এসে ক্ষমতার অংশীদার হয়ে শুরু করে নতুন বন্দোবস্ত। আইয়ুব খানের মদদপুষ্ট বুদ্ধিজীবীরা আমাদের হাজার বছরের সংস্কৃতিকে অবজ্ঞা করেছে, আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাস আর অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। একাত্তরে যখন বাঙ্গালী মুসলমান তার ন্যায্য অধিকার চাইল, তখন ভুট্টো-ইয়াহিয়ারা বেছে নিল রক্তের পথ। তাদের ধারণা ছিল লাখ খানেক মানুষ মারলেই পূর্ব পাকিস্তান শান্ত হয়ে যাবে। কিন্তু এই জনপদের মানুষ লড়তে জানে। খোদার ওপর ভরসা করে তারা মরণপণ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এবং চূড়ান্ত বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল।

একাত্তর পরবর্তী ট্র্যাজেডি ও বর্তমান ফ্যাসিবাদ-

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, একাত্তরের বিজয়ের পরও আমরা জগত শেঠদের ছায়া থেকে বের হতে পারিনি। শোষণের মলাট বদলেছে মাত্র। বিগত কয়েক দশকে আমরা দেখেছি কীভাবে ফ্যাসিবাদের শিকড় গেঁড়েছে এই মাটিতে। চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক জুলাই গণবিপ্লব আমাদের প্রতিবারই রাজপথে রক্ত দিতে হয়েছে। ২০০৬-এর আটাশে অক্টোবর, ২০১৩-এর ৫ই মে, ২০১৮-এর কোটা সংস্কার আন্দোলন কিংবা নিরাপদ সড়ক আন্দোলন প্রতিটি বাঁকই ছিল শোষণের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামের স্বাক্ষর। ২০২৪-এর জুলাই গণবিপ্লব ছিল বিচারিক হত্যাকাণ্ড, গুম আর লুটপাটের বিরুদ্ধে এক চূড়ান্ত ‘লাল কার্ড’। কিন্তু বিপ্লব পরবর্তী সময়েও ষড়যন্ত্র থেমে নেই। দিল্লির মন্ত্রণাদাতারা আজও ছক কষছে। সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায় কেনা বন্দুকের নল আজও ক্ষমতার লোভে জনগণের দিকেই তাক করা থাকে।

শেষ কথা: আজাদী না গোলামি?

চব্বিশের এই মহাজাগরণ আমাদের সেই আজাদী এনে দেবে কি না, যা আমরা সাতচল্লিশ বা একাত্তরে চেয়েও পূর্ণাঙ্গরূপে পাইনি তা সময়ই বলে দেবে। তবে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এই দ্বীপের মানুষ লড়াকু। তিন দিকে শত্রু আর একদিকে বঙ্গোপসাগরবেষ্টিত এই ভূখণ্ডের খোদাভীরু মানুষ কোনোদিন গোলামি মেনে নেয়নি, নেবেও না। বদর ও উহুদের চেতনায় উজ্জীবিত এই জনপদ যতদিন জগত শেঠ আর মীর জাফরদের আস্ফালন দেখবে, ততদিন গর্জে উঠবে। আমাদের সামনে এখন একটাই অমীমাংসিত প্রশ্ন: আমরা কি আবারও গোলামির জিঞ্জিরে ফিরব, নাকি আজাদী রক্ষা করব? উত্তর একটাই- আজাদী! আজাদী!