• ঢাকা |

মুসলিম শিবিরে বিদ্রোহ ও বিভক্তি এবং ব্যর্থতা ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণে


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ২৬ জুলাই, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

ফিরোজ মাহবুব কামাল

মুসলিম শিবিরে বিদ্রোহ ও বিভক্তি

আল্লাহ তায়ালা তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানবকে শুধু জান্নাতের পথই দেখান না, এটিও বলে দেন কারা তাঁর কাছে অতি প্রিয়। এবং এটিও জানিয়ে দেন, সে প্রিয় বান্দাদের কোন কর্মটি তাঁর কাছে সবচেয়ে প্রিয়। সেরূপ একটি ঘোষণা এসেছে নিচের আয়াতে:
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِهِ صَفًّا كَأَنَّهُم بُنْيَانٌ مَّرْصُوص

অর্থ: “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদেরকে ভালবাসেন, যারা তাঁর পথে সারিবদ্ধভাবে লড়াই করে, যেন তারা সীসাগলানো প্রাচীর।” –(সুরা সাফ, আয়াত ৪)।

নবীজী (সা:)‘য়ের কাছে সাহাবাগণ জানতে চাইতেন, কারা মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে অতি পছন্দের এবং বান্দার কোন আমলটি তিনি সবচেয়ে বেশী পছন্দ করেন। উপরিউক্ত আয়াতে রয়েছে তার উত্তর। যারা মহান রব’য়ের অতি প্রিয় বান্দা হতে চান এবং তাঁর সবচেয়ে প্রিয় কাজটি করতে চান, উপরের আয়াতটি তাদের জন্য সুস্পষ্ট বার্তা দেয়। তাঁর পছন্দের বান্দাদের থাকে দু’টি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এক). তারা হলো সীসাঢালা দেয়ালের ন্যায় একতাবদ্ধ; দুই).তারা যুদ্ধ করে মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডাকে বিজয়ী করতে। উপরের আয়াতে আরেকটি অপ্রকাশিত সত্য রয়েছে। কাদেরকে তিনি সবচেয়ে অপছন্দ করেন, আয়াতটিতে রয়েছে তাদের পরিচিতিও। মহান রব’য়ের কাছে সবচেয়ে অপছন্দের মানুষগুলো হলো তারা, যারা বিভক্ত এবং যাদের জীবনে নাই জিহাদ। প্রশ্ন হলো, যারা তাঁর অপছন্দের, তাদেরকে কি তিনি জান্নাত দিয়ে পুরস্কৃত করবেন? যারা জান্নাত পেতে চায়, উপরের আয়াতটিতে তাদের জন্য রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। সে শিক্ষাটি হলো, জান্নাতের পথটি শুধুমাত্র কুর’আন তেলাওয়াত নামাজ রোজা, হজ্জ যাকাত ও দোয়া দরুদের পথ নয়; সে পথে অবশ্যই থাকতে হয় একতা ও জিহাদ। 

অথচ আজকের মুসলিমগণ মহান আল্লাহ তায়ালার পছন্দের পথটিতে নাই। তারা ধরেছে তাঁর অতি অপছন্দের পথ । সেটি বিভক্তির এবং জিহাদ থেকে দূরে থাকার। একতা পথ তারা পরিহার করেছে বহু আগেই; মুসলিম উম্মাহকে তারা ৫০টির বেশী টুকরোয় বিভক্ত করেছে। তাদের নেশা জাতি, ভাষা, বর্ণ, গোত্র ও মতবাদী রাজনীতির নামে যুদ্ধ করা। মুসলিম উম্মাহর এ বিভক্তি দৃশ্যমান করে মহান রব’য়ের বিরুদ্ধে তাদের বিদ্রোহ ও বেঈমানী। বুঝতে হবে একতার বিকল্প একমাত্র একতা। মুসলিম দেশগুলির সামরিক শক্তি যত আধুনিক ও বিশালই হোক -সেগুলি কখনোই একতার বিকল্প নয়। তাই ইসলামে ফরজ শুধু নামাজ রোজা ও হজ্জ যাকাতের ন্যাং ইবাদত নয়, বরং একতা প্রতিষ্ঠা করা এবং সেটিকে ধরে রাখা। বুঝতে হবে, ইসলামের  মিশন শুধু্ জনগণকে কুর’আনী বাণী শোনানো বা কিছু লোককে মুসলিম বানানো নয়, বরং সেটি হলো সমগ্র সমাজ এবং পুরা রাষ্ট্রকেও ইসলামের ধারক, বাহক ও দুর্গে পরিণত করা। এ জন্যই লক্ষ্য শুধু ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণ নয়, বরং ইসলামী সংস্কৃতি ও সভ্যতার নির্মাণও। তাই নবীজী (সা:) শুধু নামাজ রোজা ও হ্জ্জ যাকাত প্রতিষ্ঠা দেননি; তিনি ইসলামী রাষ্ট্রও প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন। সে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা দিতে ও বাঁচিয়ে রাখতে ৮৩টি যুদ্ধ করেছেন। তিনি ১০টি বছর সে রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন। এসবই নবীজী (সা:)‘য়ের অতি গুরুত্বপূর্ণ সূন্নত।
মুসলিম হতে হলে অনুসরণ করতে হয় নবীজী (সা:)‘য়ের সূন্নতকে। পরিতাপের বিষয় হলো, যারা নিজেদের নবীজী (সা:)‘য়ের উম্মত এবয় আশেকে রাসূল (সা:) রূপে দাবী করে -তারা সে সূন্নত নিয়ে বাঁচে না। তারা বাঁচে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না দিয়ে। নবীজী (সা:)‘য়ের সূন্নতের সাথে এর চেয়ে বড় গাদ্দারী আর কি হতে পারে? পবিত্র কুর’আনের বাণী হলো:“ যারা অনুসরণ করে রাসূলকে, তারাই অনুসরণ করে আল্লাহকে।” -(সুরা নিসা, আয়াত ৮০)। প্রশ্ন হলো,  ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজটি না হলে নবীজী (সা:)‘য়ের অনুসরণের কাজটি কি কখনো হয়? তাতে বরং প্রচণ্ড ফাঁকিবাজী থেকে যায়। পরিতাপের বিষয় হলো, নামাজ রোজা ও হজ্জ যাকাত পালন করলেও আজকের মুসলিমগণ বাস করছে ইসলাম পালনের ক্ষেত্রে ফাঁকিবাজী নিয়ে। সে ফাঁকিবাজীর কারণে মুসলিম বিশ্বের কোথাও ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পায়নি। কোথাও পালিত হচ্ছ না তাঁর সার্বভৌমত্ব ও শরিয়া। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা দিতে মুসলিমদের মাঝে একতা চাই এবং চাই একতাবদ্ধ জিহাদ। আজকের মুসলিমদের মাঝে এ দুটির কোনটিই বেঁচে নাই। যারা বিভক্তি নিয়ে ও জিহাদ পরিহার করে বাঁচে, তারা কি কখনো ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা দিতে পারে? মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে তারা কি সত্যিকার ঈমানদার গণ্য হয়? নবীজী (সা:)‘য়ের যুগে উম্মাহর মাঝে বিভক্তিকে বেঈমানী এবং জিহাদে যোগ না দেয়াকে মুনাফিকি বলা হতো। ওহুদের জিহাদে যোগ না দেয়াতে আব্দুল্লাহ বিন উবাইয়ের মত মুনাফিকগণ নবীজী (সা:)‘য়ের পিছনের নামাজ পড়ে এবং রোজা-যাকাত পালন করেও মুসলিম হতে পারিনি। প্রশ্ন হলো, সে ইতিহাস থেকে কতটুকু শিক্ষা নেয় আজকের মুসলিম?   
একাকী একটি রাষ্ট্র গড়া দূরে থাক, একটি ঘর গড়াও অসম্ভব। এজন্যই একতা অপরিহার্য। এ জন্য প্রতিটি ঈমানদারের ঈমানী দায় হলো, ইসলামী বিধানকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে যারা আগ্রহী তাদেরকে খুঁজে বের করা এবং তাদের সাথে একতা গড়া। এজন্যই মুসলিমের কাজ শুধু মহান আল্লাহ তায়ালার দ্বীনকে জানা নয়, বরং সেসব বান্দাদেরও জানা -যারা তাঁর উপর বিশ্বাস করে এবং তাঁর দ্বীনের প্রতিষ্ঠা চায়। বুঝতে হবে, মহান আল্লাহ তায়ালা শুধু নামাজ পড়া ফরজ করেননি, বরং ফরজ করেছেন নামাজ কায়েমকে। নামাজ তো নিজ গৃহে একাকীও পড়া যায়। কিন্তু তাতে সমাজ ও রাষ্ট্রের বুকে নামাজ কায়েমের কাজটি হয় না। নামাজ কায়েমের জন্য সমাজের অন্য নামাজীদের খুঁজতে হয়। তাদেরকে সাথে নিয়ে মসজিদ ও মুসলিম কম্যুনিটি গড়তে হয়। প্রতিদিন, প্রতি ওয়াক্ত নিয়মিত আযানের সাথে সেখানে নামাজের জামায়াতের আয়োজন করতে হয়। নামাজের জামায়াতে নানা গোত্র, নানা বর্ণ, নানা এলাকা ও নানা ভাষার মানুষকে কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে একত্রে দাঁড়াতে হয়; মাঝে কোন স্থান ফাঁকা রাখা যায় না। প্রতি দিনের ৫ ওয়াক্ত জামায়াতবদ্ধ নামাজ এভাবেই একতার সংস্কৃতি নির্মাণ করে। মুসলিমের দায় হলো, একতার সে সংস্কৃতি হৃদয়ে ধারণ করে ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের জিহাদে নামতে হয়। কে কোন দলের, কে কোন ভাষার, কে কোন অঞ্চলের বা বর্ণের -সে বিচার যেমন জায়নামাজে চলে না, তেমনি সে বাছবিচার ইসলামী রাষ্ট্র গড়া ও সে রাষ্ট্র পরিচালনার জিহাদে চলে না। এমন বিভক্তি ইসলামে হারাম। এমন বাছ-বিচার উম্মাহর মাঝে বিভেদ ও অনৈক্য বাড়ায়। সেটি শক্তিহীনতা, পরাজয় ও পরাধীনতার পথ।
খেলাফতে রাশেদার আমলে আরব, ইরানী, তুর্কি, কুর্দি, মুর, হাবশি একত্রে এক রাষ্ট্রে বসবাস করেছে। ভাষা ও বর্ণের নামে তখন ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্র গড়া হয়নি। আজও সে প্যান ইসলামী ধারাই মুসলিম উম্মাহর জন্য অনুকরণীয়। কিন্তু এক্ষেত্রে আজকের মুসলিমদের ব্যর্থতা অতি বিশাল। নামাজের জামায়াতে নানা গোত্র, নানা বর্ণ, নানা এলাকা ও নানা ভাষার মানুষ কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে মিলিয়ে একত্রে নামাজ পড়লেও একতার সে সূন্নতকে তারা রাষ্ট্রনির্মাণ ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে দেখাতে পারিনি। এক্ষেত্রে তারা ভাষা, বর্ণ ও অঞ্চলভিত্তিক পরিচয়কে প্রাধান্য দিয়েছে এবং সেগুলির ভিত্তিতে বিভক্তি গড়েছে। তারা বহু ভাষী ও বহু বর্ণীয় রাষ্ট্র উসমানীয়া খেলাফত ও পাকিস্তান ভেঙেছে। সে বিভক্তির কারণে মুসলিমদের আজ ৫০টির বেশী জাতীয়, উপজাতীয় ও ট্রাইবাল রাষ্ট্র। এ ভাবে রাষ্ট্রের সংখ্যা বাড়লেও মুসলিমদের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ইজ্জত বাড়েনি। ইসলামের মূল শিক্ষার বিরুদ্ধে এটি হলো বিদ্রোহ ও বেঈমানীর পথ। পরিতাপের বিষয় হলো, সে বিদ্রোহ ও বেঈমানী নিয়েই আজকের মুসলিমদের রাজনীতি ও সংস্কৃতি। প্যান-ইসলামী মুসলিম ভাতৃত্ব তাদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে না।
 

সংকট ঈমানে ও নিয়তে

একতার প্রতিষ্ঠা কোন রকেট সায়েন্স নয়; সে পথটি অতি সহজ। নিরক্ষর মানুষেরাও ইস্পাতসম একতা গড়তে পারে -যেমনটি দেখা গেছে মুসলিমদের গৌরব যুগে। এর জন্য চাই স্রেফ খালেছ নিয়েত। চাই, মহান রব’কে খুশি করার তাড়না। চাই, তাঁর এজেন্ডার সাথে একাত্ম হওয়ার প্রবল আকাঙ্খা। সে খালেছ নিয়েত, তাড়না ও আকাঙ্খা থাকলে একতার সে পথটি মহান রব সহজ করে দেন। সেরূপ নিয়েত ও তাড়না ছিল বলেই মহান আল্লাহতয়ালা মুসলিমদের গৌরব যুগে আরব, তুর্কি, কুর্দি, হাবশি, ইরানি ইত্যাদি নানা ভাষার মুসলিমদের মাঝে একতা গড়ে দিয়েছিলেন। সেটি ছিল মহান রব’য়ে বিশাল নিয়ামত। তিনি সে নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন নিচের আয়াতে:

وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُم بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا وَكُنتُمْ عَلَىٰ شَفَا حُفْرَةٍ مِّنَ النَّارِ فَأَنقَذَكُم مِّنْهَا ۗ كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ آيَاتِهِ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ

অর্থ: “আর তোমরা সে নেয়ামতের কথা স্মরণ কর, যা আল্লাহ তোমাদিগকে দান করেছেন। তোমরা পরস্পরে বিভক্ত ও শত্রু ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তোমাদের মনে সম্প্রীতি দান করেন। ফলে, তোমরা তাঁর অনুগ্রহের কারণে পরস্পরের ভাই’য়ে পরিণত  হয়েছো। তোমরা এক অগ্নিকুণ্ডের কেনারায় অবস্থান করছিলে। অতঃপর তা থেকে তিনি তোমাদেরকে মুক্তি দিয়েছেন। এভাবেই আল্লাহ তাঁর নিজের নিদর্শনসমুহ প্রকাশ করেন, যাতে তোমরা হেদায়েত প্রাপ্ত হতে পার।”–(সুরা আল ইমরান, আয়াত ১০৩)।

ঔপনিবেশিক ব্রিটিশের শাসনামলে উপমহাদেশের মুসলিমগণ ভাষা, মজহাব, ফেরকা ও অঞ্চল ভিত্তিক পরিচয়ের উর্দ্ধে উঠে একতাবদ্ধ হওয়ার খালেছ নিয়েত করেছিল। এবং করুণাময় মহান রব তাদের সে নিয়েতকে সফল করেছিলেন। ফলে ১৯৪৭’য়ে তৎকালীন বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান তাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে তারা আর একতার পথে থাকেনি। তারা বেছে নেয় ভাষা ও এলাকা ভিত্তিক বিভক্তির পথ। ফলে মহান রব কেড়ে নেন সে বিশাল নিয়ামত তথা পাকিস্তান। শাস্তি স্বরূপ বাঙালি মুসলিমগণ পরিণত হয় বাংলাদেশ এক নামক ভারতীয় আশ্রিত রাষ্ট্রের প্রজায়। হারায় গণতন্ত্র, আন্তর্জাতিক অঙ্গণে পরিণত হয় তলাহীন ভিক্ষার ঝুলিতে। 

বিভক্ত মুসলিমদের বর্তমান সমস্যাটি তাদের নিয়তে। একতার নিয়ত করতে হলে ঈমানের বল লাগে। এজন্যই বেঈমান কখনোই একতার লক্ষ্যে নিয়ত করতে পারে না। একতা নিয়ে নয়, বরং বিভক্তি নিয়ে বাঁচাটিই তাদের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। তাদের বেঈমানী দৃশ্যমান হয় শুধু মহান রব’য়ের শরিয়া আইন ও তাঁর সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়াতে নয়, বরং জাতীয়তাবাদ, গোত্রবাদ, ফেরকাবাদ, আঞ্চলিকতাবাদী পরিচয় নিয়ে বাঁচার মধ্যে। এরা বিভক্তির সূত্র খোঁজে। কুয়োর ব্যাঙ যেমন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গর্ত খোঁজে, এসব বেঈমানরাও তেমনি ভাষা, বর্ণ ও অঞ্চল ভিত্তিক ক্ষুদ্রতর পরিচয়ের সূত্র খোঁজে। ইসলামী চেতনাশূণ্য এ বেঈমানদের বহুভাষা, বহুবর্ণ ও বহু অঞ্চল নিয়ে গড়া বিশাল ভূখণ্ডের খেলাফত যেমন ভাল লাগেনি, তেমনি ভাল লাগেনি বহু অঞ্চল ও বহু প্রদেশের বহু ভাষী মানুষের বিশাল পাকিস্তান।     

 

 

কিরূপে সম্ভব একতার প্রতিষ্ঠা

একতা প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত এ নয়, সবাইকে সর্ব বিষয়ে একমতের হতে হবে। সকল মানুষের চেহারা যেমন এক নয়, তেমনি এক নয় জ্ঞান, বোধশক্তি এবং চিন্তা-ভাবনা। নবীজী (সা:)’য়ের সাহাবীদের মাঝেও নানা বিষয়ে মতভেদ ছিল। কিন্তু সে ভিন্নতার মাঝেও তাদের মাঝে প্রবল একতা ছিল। একতার ভিত্তি কখনোই জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বিবেচনা শক্তি বা চিন্তা-ভাবনার সমতা ও অভিন্নতা নয়, বরং সেটি হলো মহান আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রাসূলের উপর সবার একই রূপ ঈমান এবং তাঁর দ্বীনের প্রতিষ্ঠা নিয়ে সবারই একই রূপ অটুট অঙ্গীকার। তাদের মাঝে সেদিন একই রূপ ছিল সবার বাঁচার ও লড়াইয়ের লক্ষ্য। বাঁচার সে অভিন্ন লক্ষ্যটি হলো, মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে প্রিয়তর হওয়া, মাগফিরাত পাওয়া এবং পরকালে জান্নাত পাওয়া। সে অভিন্ন লক্ষ্যই তাদের সেদিন একতাবদ্ধ করেছিল। মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে মূলতঃ সে ঈমান ও অটল অঙ্গীকারেরই হিসাব হয়; কোন দলের সদস্যভূক্তি বা কোন নেতা ও পীরের আনুগত্য নয়। আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে সবার জন্যই দ্বার অবাধ উম্মুক্ত।

একই ট্রেনে কত বর্ণ, কত ভাষা ও কত ধর্মের মানুষ একত্রে ভ্রমণ করে। সেখানে কোন বিরোধ দেখা দেয় না। এর কারণ, সে ট্রেনের যাত্রীরা একই গন্তব্যে পৌঁছতে চায়। গন্তব্যস্থল ভিন্ন ভিন্ন হলে সেটি আদৌ সম্ভব হতো না, মানুষ সে ট্রেন থেকে নেমে যেত। তেমনি যাদের ভাবনা জান্নাতে পৌঁছা, তারা কেন বিভেদ গড়বে? তাদের উচিত একত্রে থাকা। তারা কি জানে না বিভেদ মহান আল্লাহ তায়ালার আযাবকে অনিবার্য করে -যার প্রতিশ্রুতি শোনানো হয়েছে সুরা আল ইমরানের ১০৫ নম্বর আয়াতে? তারা কি জানে না ভাষা, বর্ণ ও গোত্র ভিত্তিক চেতনা নিয়ে কখনো ঈমানদার হওয়া যায় না? সেটি নিরেট জাহিলিয়াতর পথ। ইসলামের বিরুদ্ধে এসব জাহেলদের নাশকতাটি বিশাল। গোত্র ভিত্তিক চেতনার ধারকগণই নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাদের বিপুল অর্থ, শ্রম ও রক্তের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রকে ধ্বংস করে উমাইয়া গোত্রের নৃশংস রাজতন্ত্রে পরিণত করেছে। সে স্বৈরশাসিত রাষ্ট্রে ইমাম হাসান (রা:) ও ইমাম হোসেন (রা:)‘য়ের ন্যায় নবীজী (সা:)য়ের নাতী ও জান্নাতের যুব সর্দারদের বেঁচে থাকা অসম্ভব করা হয়েছে।     

একত্রে রেল ভ্রমনের ক্ষেত্রে যেটি সম্ভব, সেটি কেন ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সম্ভব নয়? কেউই চায় না যাত্রা পথে যাত্রীদের মাঝে কোন বিভেদ সৃষ্টি হোক। তাই মহান আল্লাহ তায়ালার সান্নিধ্যে যারা তাঁর অনুগত মোসলেহ বান্দাহ রূপে পৌঁছতে চায় তাদের মাঝে বিরোধের অবকাশ কোথায়? বিরোধ হতে পারে সে লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথ নিয়ে। পবিত্র কুর’আনে মহান রাব্বুল আ’লামিন নিজেই যখন সিরাতাল মুস্তাকীমের সে সঠিক পথটি বাতলিয়ে দিয়েছেন এবং রাসূলে পাক (সা:) সেটির প্রয়োগ করে দেখিয়ে গেছেন, ফলে চলার সে পথটি নিয়ে বিরোধের অবকাশ কোথায়?

ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হলে অনৈক্যের কারণগুলো জানাও জরুরি। রোগের কারণ জানা না থাকলে কি তার চিকিৎস্যা সম্ভব? অনৈক্যের কারণগুলো জানার পর ঈমানদারদের দায় হলো, সেগুলির অপসারণে উদ্যোগী হতে হয়। নতুন দলগড়া বা পুরাতন দলে যোগ দেওয়া -এ সমস্যার সমাধান নয়। এমন দলীয় চেতনায় জড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষ সমস্যাকে আরো জটিলতর করে তোলে। অতি মোখলেছ ব্যক্তিও তখন ঐসব দলীয় ট্রেনে গিয়ে উঠে অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তখন একতা গড়া আরো অসম্ভব হয়ে পড়ে। এসব তথাকথিত ইসলামী দলগুলি বিগত প্রায় শত বছরেও ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণে সফল হতে পারেনি। মুসলিম উম্মাহর মাঝে একতা গড়ার ক্ষেত্রেও তারা কোন ভূমিকা রাখতে পারেননি। একতার নামে তারা বহু দল গড়েছেন; কিন্তু তাতে একতা বাড়িনি, বরং বিভক্তি বেড়েছে। বিরোধ তো তখনই শুরু হয়, যখন কুর’আনী রোডম্যাপের বদলে লোক নিজ পরিবার, নিজ দল, নিজ ভাষা, নিজ গোত্র, নিজ মজহাব ও নিজ ফেরকা ভিত্তিক এজেন্ডাকে বিজয়ী করার জন্য রাস্তা গড়া শুরু করে। মুসলিমদের মাঝে আজকের সকল অনৈক্য, সকল বিভক্তি ও সকল বিপর্যের মূল কারণটি হলো, ব্যক্তি, দল, দেশ, ভাষা বা ফেরকাগত চেতনা নিয়ে বিভক্তি।

 

 

বিভক্তি কিরূপে অনিবার্য হয়?

যেখানে সত্য, সুবিচার ও সুনীতি আছে -একমাত্র সেখানে নানা ভাষা, নানা বর্ণ ও নানা অঞ্চলের মানুষ শান্তিতে একত্রে বসবাস করতে পারে। একতাবদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ বসবাসটি সভ্য, ভদ্র ও ঈমানদার মানুষের সংস্কৃতি। অপর দিকে অসভ্য, অভদ্র ও দুর্বৃত্ত বেঈমানগণ বাঁচে বিভক্তি ও কলহ-বিবাদ নিয়ে। এমন কি সহোদর ভাইয়েরাও অবিচার ও দুর্বৃত্তির মাঝে একত্রে বসবাস করতে পারে না; তখন একই ভিটায় বিভক্তির দেয়াল গড়ে বা পৈত্রিক ভিটা ছেড়ে অন্যত্র ঘর বাঁধে। তাই মহান আল্লাহ তায়ালা শুধু নামাজ রোজা ও হ্জ্জ-যাকাত ফরজ করেননি, ফরজ করেছেন মিথ্যা, অবিচার ও দুর্বৃত্তির নির্মূলও এবং সুবিচারের প্রতিষ্ঠা। নইলে অসম্ভব হয় সভ্য ও ভদ্র সমাজ নির্মাণের কাজ। তখন অসম্ভব হয় কলহ-বিবাদ থেকে সমাজকে বাঁচানো। মহান আল্লাহ তায়ালা মুসলিমদের সর্বশ্রেষ্ঠ জাতির মর্যাদা দিয়েছেন। সে বিশাল মর্যাদাটি এজন্য নয় যে, তারা বেশি বেশি নামাজ রোজা ও হ্জ্জ-যাকাত পালন করে। বরং এজন্য যে তারা সমাজের বুক থেকে মিথ্যা, অবিচার ও দুর্বৃত্তির নির্মূল করে এবং সত্য, সুবিচার ও সৎকর্মের প্রতিষ্ঠা দেয়। এমন সমাজে স্বভাবতই একতা গড়ে উঠে।

একতার আরেক বড় শত্রু হলো অজ্ঞতা। একতা তো তখনই সম্ভব যখন মহৎ কর্ম সাধনে মানুষের মাঝে গড়ে উঠে পারস্পারিক সহযোগিতার তাড়না ও দায়িত্ববোধ। কিন্তু সে তাড়না ও দায়িত্ববোধ জ্ঞানশূণ্য ও বোধশূণ্যদের মাঝে কখনোই সৃষ্টি হয়না। জ্ঞানশূণ্য মানুষেরা পশুর ন্যায় দায়িত্বশূণ্য হয়, শুধু নিজেকে নিয় ভাবে। পশু যেমন নিজের পানাহার ও প্রজনন নিয়ে ভাবে এবং রাষ্ট্র গড়ে না, এরাও তেমনি রাষ্ট্র গড়া নিয়ে ভাবে না। তাই নবীজী (সা:)’য়ের আগে জাহিল আরবদের হাতে বিশাল আরব ভূমিতে কোন রাষ্ট্র নির্মিত হয়নি। কোন সভ্যতাও নির্মিত হয়নি। তারা বেঁচেছে বিভক্ত গোত্রীয় পরিচয় নিয়ে, সে পরিচয়ের চেয়ে উচ্চতর কোন পরিচয় নিয়ে উপরে উঠার কোন তাড়না ছিল না। মহান রব তো এদেরকে পশুর চেয়েও অধম বলেছেন। তাদের নিয়ে মহান রব’য়ের বয়ান হলো: “উলায়িকা কা আল আনয়াম, বালহুম আদাল।” অর্থ: “তারাই হলো পশুর ন্যায়; বরং পশুর চেয়ে নিকৃষ্ট।”

এজ্ন্যই প্রতিটি মানবের জন্য জ্ঞানবান ও প্রজ্ঞাবান হওয়াটি জরুরি। মানব জীবনে এটিই শ্রেষ্ঠতম কর্ম। এজন্যই মহান আল্লাহ তায়ালা সর্বপ্রথম জ্ঞানার্জনকে ফরজ করেছেন; নামাজ রোজা ও হজ্জ যাকাত ফরজ করেছেন বহু বছর পর। জ্ঞান ও প্রজ্ঞার কারণে মানুষের মাঝে আসে বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ এবং সৃষ্টি হয় অভিন্ন রাজনৈতিক লক্ষ্যে গভীর অঙ্গীকার, দায়িত্ববোধ ও একতা। মুসলিমদের ক্ষেত্রে সে অঙ্গীকারটি হলো: মিথ্যা, দুর্বৃত্তি ও অবিচারের নির্মূল এবং সত্য, সুবিচার ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা। সর্বোপরি মহান আল্লাহ তায়ালার দ্বীনের বিজয়। মহান নবীজী (সা:) এ লক্ষ্যকে সামনে রেখেই নানা গোত্র, নানা ভাষা ও নানা বর্ণের মানুষের মাঝে ঐক্য গড়েছেন। সে ঐক্য ছিল এজেন্ডা ভিত্তিক। এবং সে একতা নির্মিত হয়েছিল অভিন্ন দর্শন ও উপলব্ধির ভিত্তিতে। বন্ধনটি ছিল ঈমান, তাকওয়া ও দায়িত্ববোধের, দলীয় সদস্যপদের নয়। একতার ধারণাটি ছিল ঈমানী চেতনা ভিত্তিক উম্মাহ’র, কোন দলীয় বা ফেরকা ভিত্তিক চেতনা নয়। অথচ যেখানেই ঈমান ও তাকওয়ার বদলে গুরুত্ব পায় দলীয় সদস্যপদ, সেখানে অসংখ্য দল গড়ে উঠে। তাতে একতা গড়ে উঠে না।

 

 

মুসলিমগণ কেন ব্যর্থ হচ্ছে উম্মাহ বেড়ে উঠতে?

একতা গড়ার কাজে মানুষের মাঝে সিমেন্ট লাগানোর কাজটি করে মহান রব’য়ের উপর অটল ঈমান এবং তাঁর কাছে জবাবদেহীতার ভয় তথা তাকওয়া। সে সিমেন্ট যখন কাজ করে একমাত্র তখনই মুসলিমগণ এক একতাবদ্ধ উম্মাহতে পরিণত হয় -যেমনটি দেখা গেছে নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবায়ে কেরামের আমলে। পরিতাপের বিষয় হলো সে ঈমানী সিমেন্টের অভাবে মুসলিমগণ ব্যর্থ হচ্ছে উম্মাহ রূপে বেড়ে উঠতে। তারা বেড়ে উঠছে ভাষা, গোত্র, বর্ণ ও অঞ্চল ভিত্তিক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠির পরিচয় নিয়ে -যেমনটি ইসলাম-পূর্ব আরব মুশরিকদের মধ্যে দেখা গেছে। আর এরূপ ক্ষুদ্রতা নিয়ে বেড়ে উঠাই হলো বেঈমানীর পথ। এ পথ শয়তানের এজেন্ডাকে বিজয়ী করা এবং ইসলামকে পরাজিত রাখার পথ। অখণ্ড পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ সৃষ্টিতে শয়তানের ভারতীয় পৌত্তলিক খলিফাগণ এজন্যই এতো খুশি। একই কারণে ইসলামের তাবত শত্রুরা খুশি হয়েছে আরবভূমি ভেঙে ২২টি রাষ্ট্র নির্মাণে। বিশ্বের মুসলিমগণ এভাবে শয়তান ও তার অনুসারীদের খুশি করার পথ বেছে নিয়েছে। মহান আল্লাহকে খুশি করার পথ বেছে নিলে তো একতার পথে বেছে নিত। বেঈমানী তো এভাবে প্রকাশ পায়। পরিতাপের বিষয় হলো, এ বিশাল সত্যটি বাংলাদেশের অধিকাংশ আলেম ও ইসলামপন্থীও বুঝতে পারছে না। ফলে তারাও বিভক্তি নিয়ে উৎসব করে -যেটি দেখা যায় প্রতি বছর ২৬ মার্চ এবং ১৬ ডিসেম্বর এলে।     

মুসলিম উম্মাহ গড়ার এজেন্ডা নিয়ে অগ্রসর হয়েছিলেন জামাল উদ্দিন আফগানী। ভাষা, বর্ণ, ভূগোল ভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন দেশের বড় বড় আলেম, বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা তার সাথে একতাবদ্ধভাবে কাজ করেছেন। সেটি সম্ভব হয়েছে তাদের মাঝে গড়ে উঠা এক অভিন্ন তাড়না ও অঙ্গীকারের কারণে। জামাল উদ্দীন আফগানীর কাজের ভূবনটি ছিল বিশাল; সেটি ছিল প্রায় সমগ্র মুসলিম বিশ্বজুড়ে। ভারত, আফগানিস্তান, ইরান, তুরস্ক, মধ্য-এশিয়া, মিশর, সূদানসহ নানা দেশে তিনি ঐক্যের বাণী নিয়ে ঘুরেছেন। তখন কোন বিমান যোগাযোগ ছিল না; এরপরও তিনি হাজার হাজার মাইল অতিক্রম করেছেন একতার বাণী নিয়ে। প্রতিটি দেশকে তিনি আপন করে নিয়েছেন। বিস্ময়ের বিষয়, কোথাও তাঁকে বিদেশী মনে হয়নি। স্থানীয়দের কাছেও তিনি স্বজন গণ্য হয়েছেন। এর কারণ, তিনি সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে একান্ত আপন করে নিতে পেরেছিলেন। শিয়া-সূন্নী, আরব-অনারব,ভারতীয়-অভারতীয় -কাউকেই তিনি পর ভাবেননি। এটিই হলো তাঁর প্যান-ইসলামীজম। নিজের ভালবাসা অন্যের মনেও গভীর ভালবাসার জন্ম দেয়। এবং ঘৃণা দেয় ঘৃণার জন্ম।  জামাল উদ্দীন আফগানী অন্য মুসলিম ভাইদের দুঃখকে নিজের দুঃখ মনে করতেন। অন্যের আনন্দকে নিজের আনন্দ মনে করতেন। নিজ মনের গভীর ভালবাসা দিয়ে অন্য মুসলিমের ভালবাসা অর্জন করেছিলেন। ফলে তাদের কাছেও তিনি একান্ত আপন রূপে গণ্য হয়েছেন। এটিই তো মুসলিম উম্মাহর একতার ভিত্তি। এটিই তো নবীজী (সা:)’য়ের পথ। জামাল উদ্দীন আফগানীর প্যান ইসলামী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে খেলাফত আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক মাওলানা আবুল কালাম আজাদ তাঁর আল হিলাল পত্রিকায় লিখেছিলেন, “বলকানের রণাঙ্গণে কোন তুর্কি সৈনিকের পা যদি গুলিবিদ্ধ হয়, তুমি যদি তার ব্যাথা হৃদয়ে অনুভব না করো -তবে খোদার কসম তুমি মুসলিম নও।”    

কিন্তু আজ মুসলিমদের মাঝে সে ভাতৃত্ববোধ ও সহমর্মিতা আজ বেঁচে নাই। বরং জন্ম নিয়েছে বাঙালি অবাঙালি, আরব অনারব, তুর্কি অতুর্কির পরিচয়ে তীব্র ঘৃণা, নৃশংসতা ও গণহত্যা। বাংলার বুকে গণহত্যার সে নৃশংসতা দেখা গেছে ১৯৭১’য়ে। বিলুপ্ত হয়েছে উম্মাহ রূপে বেড়ে উঠার তাড়না। এ জীবনে বাঁচার যখন উচ্চতর এজেন্ডা থাকে না, তখন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রীয় বা গোত্রীয় পরিচয়ে বেঁচে থাকাটাই রাজনীতির এজেন্ডা হয়ে দাঁড়ায় এবং সে পরিচয় বাঁচাতে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করে  -যেমনটি ছিল ইসলাম-পূর্ব আরব জাহেলদের জীবনে দেখা গেছে। সে জাহিলিয়াত আবার ফিরে এসেছে মুসলিম জীবনে। বাঙালি মুসলিম জীবনে সে জাহিলিয়াতেরই প্রবল জোয়ার। বাঙালি জাতীয়তাবাদের সে জোয়ারে বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবন থেকে ভেসে গেছে মুসলিম পরিচিতি। ইসলাম থেকে দূরে সরলে এমনটিই অনিবার্য হয়।

নবীজী (সা:)’য়ের যুগে ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণ এবং সে রাষ্ট্রীয় ভূমিতে আল্লাহ তায়ালার ভূ-রাজনৈতিক, ধর্মীয়, শিক্ষা সাংস্কৃতিক ও সামাজিক এজেন্ডাকে বিজয়ী করার যে বিশাল এজেন্ডা ছিল এবং তার পিছনে যেরূপ ঈমানী তাড়না ছিল -তা আজ আর বেঁচে নাই। মহৎ এজেন্ডা মানুষকে মহীয়ান বানায়। আর ক্ষুদ্র বা সংকীর্ণ এজেন্ডা মানুষকে ক্ষুদ্র মাপের কীটে পরিণত করে। পরিতাপের বিষয় হলো, আজকের মুসলিমগণ সে উম্মাহর পরিচয় বিলুপ্ত করে ক্ষুদ্রতর পরিচয় নিয়ে বেঁচে থাকার পথ বেছে নিয়েছে। ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের জিহাদ এবং সে জিহাদে জান ও মালের কুরবানী তাদের কাছে অদ্ভুত শোনায়। এ পবিত্র জিহাদকে অনেক রাজনৈতিক নেতা ও বুদ্ধিজীবী সন্ত্রাস বলে। পিপীলিকা যুগ যুগ বেঁচে আছে, বিলুপ্ত হয়নি। আজকের মুসলিমগণও তেমনি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিভক্ত পরিচয় নিয়ে বেঁচে থাকবে। কিন্তু তাতে কি স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ইজ্জত মিলবে? আখেরাতে কি জান্নাত মিলবে?